বাংলা ডট এসই (Bangla.se) দেশের বাইরে ইন্টারনেটে পঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ ও মিডিয়া মাধ্যম। আপনার খবর, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া সংযোগে আমাদেরকে ইমেইল করুন।   
ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়াঃ যেখানেই বাঙালী, সেখানেই আমরা আপনার পাশে আপনার খবর নিয়ে।   
বাংলা ডট এসই (Bangla.se) দেশের বাইরে ইন্টারনেটে পঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ ও মিডিয়া মাধ্যম। আপনার খবর, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া সংযোগে আমাদেরকে ইমেইল করুন।   
ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়াঃ যেখানেই বাঙালী, সেখানেই আমরা আপনার পাশে আপনার খবর নিয়ে।   
বাংলা ডট এসই (Bangla.se) দেশের বাইরে ইন্টারনেটে পঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ ও মিডিয়া মাধ্যম। আপনার খবর, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া সংযোগে আমাদেরকে ইমেইল করুন।   
ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়াঃ যেখানেই বাঙালী, সেখানেই আমরা আপনার পাশে আপনার খবর নিয়ে।   
বাংলা ডট এসই (Bangla.se) দেশের বাইরে ইন্টারনেটে পঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ ও মিডিয়া মাধ্যম। আপনার খবর, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া সংযোগে আমাদেরকে ইমেইল করুন।   
ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়াঃ যেখানেই বাঙালী, সেখানেই আমরা আপনার পাশে আপনার খবর নিয়ে।   
বাংলা ডট এসই (Bangla.se) দেশের বাইরে ইন্টারনেটে পঠিত সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ ও মিডিয়া মাধ্যম। আপনার খবর, বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া সংযোগে আমাদেরকে ইমেইল করুন।   
ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়াঃ যেখানেই বাঙালী, সেখানেই আমরা আপনার পাশে আপনার খবর নিয়ে।   
বুধবার, ১৮ অক্টোবর 2017/Bangla.se is the First & most popular Online News & Entertainment from EU. আমাদের সাথে থাকুন এবং সারা বিশ্বে আপনার খবর সবার কাছে উপস্থাপন করুন। Share your News with us. Email: news@bangla.se

শিরোনামঃ
বৃত্ত ঘুরে বৃন্তে- নওরীন ইয়াসমীন PDF Print E-mail

অকৈতব্য

বৃত্ত ঘুরে বৃন্তে


-নওরীন ইয়াসমীন

বৃত্ত ঘুরে বৃন্তে

 

-নওরীন ইয়াসমীন

 

গ্রোসারী থেকে বেরোতেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যাগের মধ্যে দুধ, রুটি গুছিয়ে তুলতে গিয়ে আমার আরেকটা ব্যাগ ভূল করে ক্যাশ কাউÏটারে ফেলে এসেছি। আবার এখন ছোট! কাজ থেকে ফিরে এসব ঝক্কি ভাল লাগে? নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে আবার গিয়ে গ্রোসারীতে ঢুকি। আমাকে ঢুকতে দেখেই ক্যাশ কাউÏটারের মেয়েটি আমার দৃষ্টি আকর্ষন করতে হাতে করে আমার ব্যাগটা উঁচু করে তুলে দেখাল। আমি ব্যাগটা নিয়ে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। আর বেরোতেই দূর থেকে নিপুন ভাবীকে দেখতে পেলাম। উফ্‌! এখন আমি ওনার সামনে কিছুতেই পরতে চাইনা। উনি মানুষ ভাল, কিন্তু এত কথা বলেন যে এখন ওনার পাল্লায় পরলে নির্ঘাত ঘÏটা খানেকের আগে আমি কিছুতেই ছাড়া পাব না। আজ এমনিতেই আমি ভীষন ক্লান্ত। রাতে মোটেও ঘুম হয়নি। তবুও সেই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে ছুটতে হয়েছিল। এই তো এতক্ষনে ফিরছি। ফিরে, গ্রোসারী হয়ে বাসায় যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। আমি অনেক কায়দা করে নিপুন ভাবীর চোখ বাঁচিয়ে শপিংমল থেকে বের হয়ে আসি।

 

বাসার লিফ্‌টের সামনে পৌঁছুতেই দেখি লিফ্‌ট নীচে নেই। কে জানে দশতলায় উঠে বসে আছে কিনা! বাটন প্রেস্‌ করে অপেক্ষায় থাক এখন! আজ আমার সাথে এসব হচ্ছেটা কি? একে তো একলা মানুষ, একা হাতেই সব করতে হয়। তার উপরে চাকরী করলে প্রায় সারাক্ষন কাজের প্রেসারের মধ্যেই থাকতে হয় সেটা নিশ্চয়ই বুঝি আমি। কিন্তু যেসব দিনগুলোতে শরীর আর চলে না, বিশ্রাম চায়, সেদিন চলতে গিয়ে বারবার বাধা পেলে সত্যি আমার ভীষন বিরক্ত লাগে! তাও যদি বাসায় ফিরে রেষ্ট নেবার কোন উপায় থাকত! ক্লান্ত, ক্ষুধার্থ্য অবস্থায় রাঁধোরে, সব ক্লিন করোরে, তারপরেই না শাওয়ার নিয়ে খাওয়া। আর তারপরে রেষ্ট।

 

এতক্ষনে আমার পালকী এল। পালকী আর কি! লিফ্‌টকেই আমি মজা করে পালকী বলি। কি সুন্দর বেহারা নেই, হেইও রব নেই, অথচ পালকীর মত ছোট্ট এই ঘরখানি আমাকে আমার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়! আবার ঘর থেকে বেরোবার সময়ও আমাকে কত যত্নে অত উঁচু থেকে নামিয়ে আনে! হঠাৎ কখনও পালকীর মত একটু দুলেও ওঠে। তবে দুলে উঠলে তখন আর আমার কোন ফ্যাÏটাসি থাকে না। তখন আমি ভয় পাই। আতংকিত হয়ে পরি হঠাৎ যদি মাঝপথে থেমে যায়। আর আমি জানালা দরজাবিহীন ছোট্ট এই ঘরে আটকে পরি! এমন অভিজ্ঞতা একবার তো হয়েছিলই আমার। তবে আমার বিলডিং এর এই লিফ্‌টে না। ঘটনাটা ঘটেছিল সেÏট্রালের সাবওয়ে ষ্টেশনের লিফ্‌টে। আমি যে কি ভীষন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! মূহুর্তে মনে হয়েছিল বুঝি হার্ট এ্যাটাক হয়ে মরেই যাব। কিন্তু রেসকিউ বাটনে প্রেস করতে না করতেই আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মত কোথা থেকে একজন সিকিউরিটির লোক চলে এল। কাঁচের ওপার থেকেই আমাকে ইশারায় বলল, -‘ভয় পেয়ো না, ঠিক করা হচ্ছে।’ আর সত্যি মাত্র দু’মিনিটের মধ্যেই আমি লিফ্‌ট থেকে বেরিয়ে এলাম! সেই থেকে এই ব্যাপারটায় আমার ভয়ানক ভয়। একলা লিফ্‌টে উঠতে হলেই আমি দোয়া দরূদ পড়তে থাকি। আজ আমাকে একাই উঠতে হবে, ভাবতে ভাবতে লিফ্‌টে ঢুকলাম। কিন্তু দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার আগেই দশতলার সেই সদাহাস্যময়ী মহিলাটি মেইন গেট দিয়ে ঢুকেই ছুটে এসে লিফ্‌টের ডোরটা ধরে ফেললেন। ভেতরে ঢুকে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন,

 

-সরি! আমি তোমাকে বিরক্ত করলাম না তো?

 

-একটুও না। তুমি তো লিফ্‌টের ডোর বন্ধ হবার আগেই এসে পরেছ, আমার তো কিছু ঝামেলা হয়নি। তোমারই বরং তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কষ্ট হল। কেমন হাঁপাচ্ছ দেখ?

 

-‘সো কাইন্ড অফ ইউ!’ মহিলা কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলেন। তারপরেই হাতের ফুলগুলো দেখিয়ে বললেন, -‘এই ফুলগুলো কিনতে গিয়েই দেরী হয়ে গেল।’

 

-ফুলগুলো খুব সুন্দর! তুমি প্রায়ই ফুল কেনো বোধহয়, তাইনা?

 

এদেশিয় অন্য মহিলাদের মত নন ইনি। বেশ মিশুক বোঝাই যায়। আমার কথায় এবার উনি একটু লাজুক হেসে বললেন, -‘ঘরে সবসময় কিছু ফ্রেশ ফুল না থাকলে ভাল লাগে না আমার। তাই দু/চারদিন পরপরই আমি নতুন ফুল কিনে পুরোনগুলো পালটে দেই। তাছাড়া সামার মানেই তো ফুল, তাইনা?’

 

-‘সত্যিই ফ্রেশ কিছু ফুল ঘরের পরিবেশই পালটে দেয়।’ আমি ওনার কথায় সায় দেই।

 

কথায় কথায় আমি আমার সাততলায় পৌঁছে যাওয়াতে ওনাকে ‘হ্যাভ এ নাইস ডে’ বলে নেমে পরি। বৈদ্যুতিক পালকী ওনাকে নিয়ে দশতলায় উঠে যায়। আমি আমার এপার্টমেÏেটর দরজায় দাঁড়িয়ে ব্যাগ হাতরে চাবি বের করি। এভাবে রোজ যখন ঘরে ফিরে নিজেকেই দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকতে হয় তখন মনটা সত্যি খুব খারাপ হয়ে যায় আমার। নিজেকে ভীষন নিঃসঙ্গ মনে হয়। মনে হয় আমি এমনই এক হতভাগ্য মানুষ যার জন্য ঘরে কেউ অপেক্ষায় নেই যে কিনা আমি ফিরলেই হাসিমুখে দরজা খুলে দেবে। আমি ঘরে ফিরেছি বলে খুশি হয়ে উঠবে। সারাদিন আমার কেমন কেটেছে জানতে চাইবে। নাহ্‌, এসব ভেবে কোন লাভ নেই! আমি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকি। ভেতরে ঢুকতেই শুনতে পেলাম ল্যান্ডফোনটা বাজছে। কিন্তু জুতো খুলে যেতে যেতেই লাইনটা কেটে গেল। কোথা থেকে করা হয়েছিল ডিসপ্লেতে নাম্বারটা দেখার আগেই ফোনটা আবারও বেজে উঠল। দেশের কল। আজ আবার কে ফোন করল!! ভাবতে ভাবতেই রিসিভারটা তুলে নেই-

 

-হ্যালো!

 

-‘কি রে আজ তোর ফিরতে এত দেরী হলো কেন?’ ওপ্রান্েত মা’র ক¥।

 

মা ফোন করেছে! আমি খুবই অবাক হই, কিছুটা আতংকিতও। কারও কিছু হলো না তো?

 

-কি ব্যাপার মা তুমি আজ ফোন করলে কেন? আমি না কালকেই তোমার সাথে কথা বললাম। কিছু হয়েছে?

 

-‘না, না, কিছুই হয়নি। কাল তো তোর সাথে কথা বলতে বলতেই লাইনটা কেটে গেল, কথা ঠিকমত শেষ করতেই পারিনি। পরে তুইও আর ফোন করলি না। ভাবলাম তোর কিছু হলো না তো! ভাল লাগছিল না, তাই আমিই আজ করলাম।’ মা এক নিঃস্বাসে কথাগুলো বলে।

 

-ওহ! মা, তোমাকে না আমি লাইন কেটে যাওয়ার আগেই বলে নিয়েছিলাম কার্ডের টাইম শেষ, যে কোন সময় লাইন কেটে যাবে?

 

-‘বলেছিলি তো, কিন্তু তবুুও আমার তোর জন্য ভাবনা হচ্ছিল।’ মা নরম গলায় বলেন। তারপরেই আবার বলেন, -‘আজ তোর দেরী হলো কেন রে? আমি সেই আধা ঘÏটা ধরে ফোন করেই যাচ্ছি। বুঝতে পারছিলাম তুই বাসায় নেই। আরও চিন্তা হচ্ছিল।’

 

-‘তুমি অযথা এত ভাব কেন বলো তো মা? আমি কি এখনও নাবালিকা আছি? নাকি আমি জঙ্গলে বাস করছি যে সারাক্ষনই তুমি আমাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করবে?’ আমি এবার কিছুটা রাগত স্বরেই বলি।

 

-‘তুই সেকথা বুঝলে তো হতই! শুধু নাবালিকা হলেই তাকে নিয়ে ভাবনা হয় বাবা-মায়ের? তোর মত বয়সি একটা মেয়ের এভাবে একা থাকাটা যে তার বাবা-মায়ের জন্য কতটা ভাবনার সেটা যদি বুঝতি তুই!’ মায়ের দীর্ঘ্যশ্বাস পরে।

 

-‘এই তো আবারও শুরু হল!’ মায়ের কথা শুনে আমার যেমন বিরক্ত লাগে, তেমনি আবার মায়ের জন্য মায়াও লাগে। আমি কথা ঘোরাই, -‘আচ্ছা মা, চিতল মাছের কোপ্তায় মাছটা কি ব্লেন্ড করে নিতে হয়, নাকি শুধু কাঁটা বেছে হাত দিয়ে মেখে নিলেই হয়? ক’দিন ধরে খুব খেতে ইচ্ছে করছে। ভাবছি এরমধ্যে একদিন রাঁধব।’

 

-‘না, না, হাত দিয়ে কোনরকমে শুধু মাখালেই হবে নাকি! চিতল মাছের কোপ্তা করার অনেক নিয়ম কানুন আছে’ মা আমার জন্য সব টেনশন ভূলে চিতল মাছের কোপ্তার রেসিপি খুব সুন্দর করে আমাকে বুঝিয়ে দিতে শুরু করেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি!

 

মা’র সাথে কথা শেষ করে কি খাওয়া যায় ভাবি! আজ কাজে আমার খুব ষ্ট্রেসফুল একটা দিন গেছে। ভীষন ক্লান্ত লাগছে। ঝামেলার কিছু রাঁধার প্ল্যান নেই আজ। ফ্রিজে গ্রীল চিকেন ব্রেষ্ট আছে। পাস্তা সিদ্ধ করে গ্রীল চিকেন, শশা, টমেটো, ব্ল্যাক অলিভ আর চিজ্‌ কিউব দিয়ে আমি ঝটপট পাস্তা সালাদ করে ফেলি। তারপর হাতের টুকটাক কাজ সেরে শাওয়ার নিয়ে খাবারসহ কম্পিউটার টেবিলে এসে বসি। স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ইÏটাের্নটের কল্যানে মানুষ এখন প্রবাসে বসেও দেশের সব ধরনের টিভি প্রোগ্রামই দেখতে পারে। আমি একলা মানুষ, চাকরীর জন্য সারাদিন বাইরেই কেটে যায়। তাই স্যাটেলাইট চ্যানেলে আমার কোনই প্রয়োজন নেই। দিন শেষে ঘরে ফিরে ইÏটাের্নটই আমার জন্য যথেষ্ট। সারাদিনের কাজের শেষে এটুকুই আমার যা রিক্রিয়েশন।

 

 

খুব সকাল সকাল উঠতে হয় আমাকে। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে আমার কাজে যেতে প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মত সময় লাগে। তাই পথের এক ঘÏটা সময় হাতে রেখেই প্রাত্যহিক কাজের জন্য আরও এক ঘÏটা আগে বিছানা ছাড়তে হয় আমাকে। শনি-রবি ছাড়া রোজই এই একই সময়ই উঠি আমি। কিন্তু তবুও এলার্ম ছাড়া আজও নিজে নিজে ওঠার অভ্যেসটা হলো না আমার। তবে আজ কোন এলার্ম নেই, আজ শনিবার। তবুও সাতটা পঞ্চান্নতে ঘুম ভেঙ্গে যেতে মেজাজটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল! আজ তো আমার সারাদিন ঘুমালেও কোন সমস্যা ছিল না, আর আজই কিনা সাত সকালে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল! কোন মানে হয়? বিরক্ত আমি শুয়ে শুয়েই খানিক আলসেমি করি। আমার এক রুমের ছোট্ট এই এপার্টমেÏটটার যতটুকু এই বিছানা থেকে দেখা যায়, শুয়ে থেকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আমি। দিনের প্রথম আলোতে কেমন যেন অচেনা লাগে সবকিছু। কিছুই নিজের বলে মনে হয়না। বিষয়টা ভাবতেই একটু অবাক লাগে আমার! এতগুলো বছর ধরে দেশের বাইরে আমি, এখানেই তো প্রায় সারে পাঁচ বছর হয়ে গেল, অথচ এখনও এখানকার কোনকিছুকেই নিজের বলে মনে হয়না আমার। কিন্তু কেন? এই যে এই ছোট্ট ফç্যাটের যা কিছু সবই তো আমি নিজের রোজগারের টাকায় কিনেছি। তবুও নিজের মনে হয়না কেন!! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি আমি, আবার নিজেই নিজেকে সে প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করি। আমার ধারণা নিজেস্যতার অনুভূতি আরও গভীরে সৃষ্টি হয়। আরও সুক্ষ্য। আসলে নিজে এখানে থাকলেও মনটা তো প্রায় সারাক্ষন দেশেই পরে থাকে, তাই হয়ত এখানকার কোনকিছুকে আপন মনে হয়না। তাছাড়া যে ভূখন্ডে আমি আছি সেই ভূখন্ডই আমার না, যখনই এটা মনে হয় তখনই এখানকার আর কোনকিছুকেই নিজের বলে মনে হয়না, সে যতই নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা হোকনা কেন। যার উপরে দাঁড়িয়ে সেই জায়গাটাই যদি পরের হয়, তবে নিজের বলে তখন আর কিছুকে ভাবা যায় কি? হঠাৎ আবদুল আলীমের ‘‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’’ গানটা মনে পরে যায় আমার। এই পর পর অনুভূতি নিয়ে কোথাও বাস করা যে কতখানি কষ্টের সেটা প্রবাসী ছাড়া আর বোধহয় কেউ এভাবে বুঝবে না। কি জানি আমার মত করে সব প্রবাসীর একই রকম অনুভূতি হয় কিনা! হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠতেই ভাবনার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এলাম আমি। এত সকালে কার আবার আমাকে প্রয়োজন পরলো! ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে চোখ পরে আমার। আরে এগারোটা বাজে প্রায়, কখন এত বেজে গেল! আলসেমি কাটিয়ে ফোন রিসিভ করার জন্য উষ- বিছানা থেকে নেমে পরি আমি।

 

-হ্যালো!

 

-‘গুড মরণিং সুইটি! হোপ্‌ আমি তোমার ঘুম ভাঙ্গাইনি।’ ওপ্রান্ত থেকে লিলিয়ানা খল্‌বল্‌ করে ওঠে।

 

লিলিয়ানা, আমার ক্রোয়েশিয়ান বান্ধবী। এদেশে আসার পরপর লিলিয়ানা আর আমি একই সাথে ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে পড়েছি। ভীষন মিশুক একটা মেয়ে। আমার মতই বয়স হবে। কিন্তু ওর অনর্গল কথা বলা আর অস্থিরতা দেখলে মনে হবে ও বুঝি এখনও টিন এজ্‌ই পেরোয়নি। এখনও মাঝেমাঝেই আমাদের যোগাযোগ হয়। শেষবার লিলিয়ানাই ফোন করেছিল আমাকে। আমার আর করা হয়নি। আজ হঠাৎ কি মনে করে শনিবার সকালেই ফোন করল ভাবতে ভাবতেই লিলিয়ানার কথার জবাব দেই-

 

-তোমার মত ফ্রাইডে নাইট বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ডিস্‌কোতে কাটাইনা আমি যে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পরে পরে ঘুমোব।

 

-‘ও হানি, সত্যি তুমি যে কি একটা লাইফ কাটাচ্ছ! মানুষ ভেজেটেরিয়ান হয় আর তুমি নিজেই একটা ভেজিটেবল্‌।’ লিলিয়ানার বলার ঢঙ্গে মনে হয় সত্যি সে আমাকে নিয়ে ভীষন হোপলেস্‌।

 

-ওকে! এবার বল তোমার মত একজন আমিষের শনিবারের মত এমন এক স্ফুর্তির দিনের সকালেই আমার মত একজন ভেজেটেবল্‌কে মনে পরল কেন? তোমার তো এখন পরে পরে ঘুমোবার কথা!

 

আমার কথায় লিলিয়ানা খিলখিল করে হেসে ওঠে। -‘ওহ্‌ গড্‌! হানি তুমি এমন মজা করে কথা বল!’

 

-‘মজা করে শুধু কথাটাই বলতে পারি, তোমাদের মত মজা তো আর করতে পারিনা। নইলে তুমি কি আমাকে এই শনিবার সকালে ভেজেটেবল্‌ বল!’ আমি ছদ্মগাম্ভীর্য্যে বলি।

 

লিলিয়ানা ভেবেছে আমি বুঝি সত্যি সত্যি তার কথায় মন খারাপ করেছি। সে বলে ওঠে, -‘ডারলিং ডোÏট বি সিলি! ইউ নো ভেরী ওয়েল দ্যাট হাউ মাচ আই লাইক ইউ। ডোÏট ইউ?’

 

-‘সত্যি তোমার বয়ফ্রেন্ডগুলো তোমার ব্রেইন একদম নষ্ট করে দিয়েছে, নইলে তুমি ফানও বোঝনা?’ আমি এবার হেসে উঠি। পরমূহুর্তেই বলি, -‘এখন বল তো কি মনে করে আমাকে ফোন করেছ? তুমি তো এত সকালে কখনও ফোন কর না! এনি প্রবলেম্‌?’

 

-‘ঝামেলায় না পরলে কি আর এই সময়ে নিজে না ঘুমিয়ে তোমাকে কল করি।’ লিলিয়ানার ক¥ এবার একটু ক্লান্ত শোনায়। কিন্তু সে মূহুর্তকাল মাত্র। আবারও সে স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় বলে ওঠে, -‘দেখনা, আমি এখন যে কোর্সটা করছি সেখানে এশিয়ার কোন দেশের উপরে আমাদের এ্যাসাইনমেÏট দিয়েছে। আমি কি এশিয়ার এতকিছু জানি? বিষয়টা জানার পর থেকেই কেবল তোমার কথাই মনে হচ্ছে আমার। তুমি আমার জন্য তোমার নিজের দেশ নিয়ে এই এ্যাসাইনমেÏটটা করে দাও হানি, প্লিজ্‌!’

 

-তুমি এশিয়ান নও বলেই যে এশিয়া বা এশিয়ার কোন দেশ নিয়ে একটা এ্যাসাইনমেÏট লিখতে পারবে না তেমনটা ভাবছ কেন? গুগল্‌ এ সার্চ করলেই তো তুমি যে কোন দেশের যাবতীয় ইনফর্মেশন পেয়ে যাবে।

 

-‘সুইটি, সেটা আমিও জানি। কিন্তু এই মূহুর্তে গুগল্‌ সার্চ করে ইনফর্মেশন কালেক্ট করে করে এ্যাসাইনমেÏট করার মত অত সময় আমার কোথায়?’ লিলিয়ানা খুব ব্যস্ত মানুষের মত করে কথাগুলো বলে। তারপরেই যেন গোপন কোন কথা বলছে এভাবে গলাটাকে নীচু করে প্রায় হুইস্পারিং এর মত করে বলে, -‘গতকাল নাইট ক্লাবে একজনের সাথে আলাপ হয়েছে, সে আমাকে আজ রাতে ডিনারে ইনভাইট্‌ করেছে। আমি এখন বাটারফçাই মুডে আছি হানি, এর মধ্যে আমার দ্বারা গুগল্‌ সার্চ করে এ্যাসাইনমেÏট লেখা হবে না।’

 

লিলিয়ানার কথায় আমি এবার একটু তিরস্কার করে বলি, -‘দু’দিন পর পরই বয়ফ্রেন্ড চেঞ্জ করে তুমি এমন বাটারফçাই মুডে থাক, তোমার দ্বারা কখনই কি সিরিয়াস কিছু হবে? আর কতদিন বাটারফçাই লাইফ কাটাবে, এবার একটু সেটল্‌ করার কথা ভাব।’

 

-সেটল্‌ করার কথা ভাবলেই কি আর এত সহজে সেটল্‌ করা যায় হানি, নিজেকে দিয়ে দেখছ না? এই যে তুমি আমার মত লাইফ কাটাচ্ছ না তাতেই কি তুমি হ্যাপি? তার চেয়ে এই যে মাঝেমাঝে হলেও আমার বাটারফçাই মুডে সময় কাটছে সেটাই বা কম কি? ডিয়ার, জীবনে কিছু সুখের স্মৃতি থাকা খুব জরুরী। নইলে বার্ধক্যের একাকিত্ত্ব কাটাবে কি নিয়ে?’ লিলিয়ানার মত অস্থিরমতি মেয়ের মুখে হঠাৎ এই কথাগুলো খুব ভারী শোনায়।

 

লিলিয়ানার শেষ কথাটায় আমি একটু থম্‌কে যাই। বার্ধক্যের একাকিত্ত্বের জন্য সত্যি কি কিছু সুখের স্মৃতি থাকা জরুরী? কি জানি! আমার কাছে তো সব স্মৃতিই কষ্টের মনে হয়। দুঃখের সময়ের স্মৃতি যখনই ভাবা হোক না কেন তাতে দুঃখই হয়। সুখের স্মৃতি নিয়ে ভাবলেও আমার কষ্ট লাগে, সেই সময়গুলো আমার জীবনে আর নেই এটা ভেবে। তাছাড়া বার্ধক্য যে একাকিত্ত্বেই কাটবে তেমনটাই বা ভাবব কেন? লিলিয়ানা বা এদের মত কালচারে বিষয়টা খুব স্বাভাবিক হলেও আমাদের কালচারে বার্ধক্য তেমন একটা একাকিত্ত্বে কাটে না। ছেলে-ছেলের বৌ, মেয়ে-মেয়ে জামাই, নাতি-নাতনী নিয়ে ভরপুর জীবন তো বার্ধক্যেই। যদিও আমাদের কালচারেও এখন আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে। এখন অনেক পরিবারই আর আগের মত ভরপুর থাকে না, মানষিক ভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তবুও নেই নেই করেও এখনও আমাদের যতটুকু আছে সেটা লিলিয়ানাদের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এটাও হয়ত সত্যি, বার্ধক্যে মানুষ অনেকের মধ্যে থেকেও মানষিক ভাবে বোধহয় ভীষন একাই হয়, যদি না তার কোন সঙ্গি থাকে।

 

-হ্যালো! হানি তুমি কি ওপাশে আছো? কখন থেকে চুপ করে আছো, এত কি ভাবছ?

 

লিলিয়ানার কথায় আমার সংবিৎ ফেরে। আমি কিছুক্ষনের জন্য নিজের ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম। একটু লজ্জিত হয়েই তাড়াতাড়ি বলি, -‘সরি! তোমার কথাগুলোই একটু ভেবে দেখলাম।’

 

-‘রিয়েলি? ভাব ভাব, এটা কোন জীবন হল নাকি? লাইফ একটাই হানি, এখানে অবহেলায় নষ্ট করার মত এত অফুরন্ত সময় নেই। এই এক জীবনে যতটা সম্ভব আনন্দ করার নামই বেঁচে থাকা।’ সুযোগ পেয়ে লিলিয়ানা আমাকে জ্ঞান দিয়ে দেয়।

 

-হয়েছে, আর লেকচার দিতে হবে না। এখন বল, তোমার এ্যাসাইনমেÏটটা কি সত্যি আমাকে করে দিতে হবে?

 

-‘ইয়েস হানি, তোমাকেই করে দিতে হবে এবং কালকের মধ্যেই। মান্‌ডে ওটার প্রেজেÏেটশন। আমি জানি তোমার একটু ঝামেলাই হবে। কিন্তু হানি তুমি ছাড়া আমাকে এখন উদ্ধার করার মত কেউ তো নেই। প্লিজ্‌ সুইটি হেল্প মি!’ লিলিয়ানার গলা সত্যি সত্যি ভীষন কাতর শোনায়।

 

-থাক আমাকে আর এত ‘হানি, সুইটি’ বলতে হবে না। ওই মিষ্টি সম্মধোনগুলো তুমি তোমার বয়ফ্রেন্ডদের জন্যই রেখে দাও।

 

-আর বলোনা হানি, ওদের ডাকতে ডাকতেই তো আমার এখন এই অবস্থা, ঐ ওয়ার্ডগুলো ছাড়া কারও সাথে কথাই বলতে পারিনা।

 

লিলিয়ানার এই সহজ স্বীকারোক্তিতে আমার ভীষন হাসি পায়। আমি ওকে এ্যাসাইনমেÏটটা লিখে দেব বলে আশ্বস্ত করে ফোনটা রাখি। সত্যি লিলিয়ানাদের মত করে যদি জীবনটাকে নিয়ে ভাবতে পারতাম! নাহ্‌ শত চেষ্টাতেও ওদের মত করে জীবনকে নিয়ে ভাবা বাঙ্গালী মেয়েদের পক্ষে কখনোই বোধহয় সম্ভব না। বাঙ্গালী মেয়েদের অতটা সাহসই নেই। বাঙ্গালী মেয়েদের সাহস বানরের সেই তৈলাক্ত পিচ্ছিল বাঁশে ওঠার মত, একটু উঠলেই আবার অনেকখানি নেমে যায়।

 

 

শীতের দেশে ছুটীর দিনগুলোতেও দুপুরে কেউ ঘুমায় না। আমার তো দুপুরে ঘুমোবার অভ্যেস দেশে থাকতেই ছিল না। কোন কাজ থাকলে দুপুরবেলাতেও আমি সেটা নিয়েই কাটিয়ে দেই। আমি একলা মানুষ হলেও ছুটীর দিনগুলোতে আমার কাজের কোন অন্ত থাকে না। ঘর-দোর ক্লিনিং, সারা সপ্তাহের ময়লা কাপড় ধোয়া, রান্না, শাওয়ার, খাওয়া, দেশে ফোন করা ইত্যাদী করতে করতেই উইকেন্ডের দুটো দিন যে কখন ফুরিয়ে যায়! আজও তার ব্যতিক্রম নয়, যথারীতি অনেক কাজ রয়েছে। কিন্তু এবারের উইকেন্ডের কাজগুলোকে সংক্ষিপ্ত করতে হবে। নইলে লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏটটা লেখার সময় পাব না। ভাবছি নিজের যেটুকু কাজ না করলেই নয় সেটুকু আজকের মধ্যেই সেরে ফেলে কালকের দিনটা এ্যাসাইনমেÏেটর জন্য রাখব। খুব প্রয়োজনীয় কিছু কাজ আর রান্না খাওয়া সেরে বিকেলবেলার দিকে এক মগ গরম কফি হাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই আমি। দু’চোখ ভরে সামনের উন্মুক্ত প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য পান করতে করতে গরম কফির মগে চুমুক দিতে বেশ লাগে আমার।

 

সেÌেটম্বরের প্রথম সপ্তাহ। এখন গাছে গাছে পাতায় পাতায় নানান রঙ্গের খেলা। ক্ষণজন্মা ফুলেরা সব এবছরের মত বিদায় নিয়েছে। পাতারাও সব বিদায় নেবার আয়োজনে ব্যস্ত। তাদের সবুজ বর্ণ শরীরে এখন হলদে রঙ্গের মাখামাখি। হালকা হলুদ থেকে গা• হলুদ, তারপরে কমলা ভাব, একদম শেষে হালকা খয়েরী থেকে গা• খয়েরী, এভাবেই রং বদলাতে বদলাতে গাছ থেকে ঝরে পরবে ওরা। আর বাতাসের দাপটের সাথে যুদ্ধ করেও যে কয়েকটা পাতা গাছেই থেকে যাবে তারা ঐ খয়েরী রং থেকেই এক সময় শুকিয়ে তারাও ঝরে পরবে। এরপর ডিসেম্বর থেকে সেই মার্চ পর্যন্ত পরে থাকবে কেবল গাছগুলোর পাতাবিহীন কংকাল শরীর, আসছে সামারে আবারও পল্লবিত হবার আকাংখা নিয়ে। এপ্রসঙ্গে একজনের কথা মনে পরে গেল। ঘটনাটা মনে পরলেই আমার এখনও ভীষন হাসি পায়। আমি তখন প্রথম এসেছি এদেশে। আসার পরপরই একজন দেশি ছেলের সাথে ঘটনাচক্রে পরিচয় হয়েছিল। সেই ছেলে এদেশে তার প্রথম আসার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়েই বলেছিল, সে যখন প্রথম এদেশে আসে তখন ছিল জানুয়ারী মাস। তখন তো কোন গাছে পাতা থাকে না, শুধু মরা ডালপালা নিয়ে গাছের শরীরগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। এরকম একটা দৃশ্য দেখে ছেলেটি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল, ‘‘এ কোন পাগলের দেশে এসে পরলাম, সবখানে শুধু মরা গাছ! এরা এত মরা গাছ রেখে দিয়েছে কেন? গাছগুলোকে কেঁটে ফেলে না কেন এরা?’’ পরে এপ্রিলের শুরু থেকে সেই মরা গাছগুলোকেই পাতায় পাতায় ছেঁয়ে গিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখে সে যারপর নাই বিষ্মিত হয়েছিল।

 

সত্যি এদেশের প্রকৃতি খুব বেশি জীবন্ত। সামারে একটু উষ-তার আভাসেই চোখের পলকে এমনভাবে প্রকৃতিতে প্রাণের ছোঁয়া লাগে যে বিষ্মিত না হয়ে সত্যি পারা যায় না। এপ্রিলের শুরুতেই শীত ভাল মত যেতে না যেতেই গাছে গাছে নতুন কুঁড়িতে ছেয়ে যায়। যে পথ দিয়ে আগেরদিন সন্ধ্যেতেও যাবার সময় কোন ফুল দেখা যায়নি, পরদিন সকালেই সেপথের পাশে ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। বড় অদ্ভূত লাগে আমার! ফুলগুলো যেন ফুটবার জন্য মাটির নীচে অপেক্ষাতেই থাকে। আর সামান্য একটু উষ-তা পেলেই মাটী ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। অথচ আমাদের দেশে ফুলকে ফোটাবার জন্য কত সাধ্য সাধনাই না করতে হয়! সামারে এদেশের প্রকৃতি এতবেশি জীবন্ত বলেই বোধহয় উইÏটারে তার ঘুমন্ত রূপ এতবেশি নিরবতা, এতবেশি নিস্তব্ধতা এনে দেয়। এদেশে শীতের প্রকৃতি যেন জুলিয়েটের মত গভীর ঘুমে মৃতপ্রায় হয়ে গ্রীষ্মের উষ-তার অপেক্ষায় থাকে, যেমনটা রোমিওর জন্য ছিল জুলিয়েট।

 

আমি প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের মাঝে ডুবে গিয়ে গরম কফিতে চুমুক দেই। থেকে থেকে হিমেল হাওয়া এসে শীতের আগমনী বার্তা জানিয়ে যায়। আবারও শীত আসছে। আমার জন্য আবারও প্রায় গৃহবন্দি কয়েকটি মাস। শুধু বাসা থেকে কাজে, আবার কাজ থেকে বাসায় ফেরা। যেন হিম হিম শুভ্র তুষারের কাফনে ঢাকা মৃত কয়েকটি মাস। তবে এরই মধ্যে লিলিয়ানার মত যারা তারা ঠিকই জীবনের রূপ, রস উপভোগ করে। আমার জন্য এই মাসগুলো মৃত হতে পারে, কিন্তু তাদের জন্য বছরের কোন সময়ই জীবন থেমে থাকে না। শীত, গ্রীষ্ম, কিম্বা হিম তুষার, যে কোন সময়েই তারা জীবনের জন্য উষ-তা খুঁজে নেয়।

 

শুধু লিলিয়ানারাই না, শীত আসছে বলে সারাটা সামার জুরে কলরব করে বেড়ানো গাংচিলেরাও উষ-তার খোঁজে দক্ষিনের কোন উষ- দেশে দলবেধে চলে গেছে। এখন আর কোথাও তাদের কোন চিহ¡ও নেই। ভাবতে অবাক লাগে, সামান্য পাখী তারাও কি সুন্দর বুঝে যায় জীবনের জন্য উষ-তার কি ভীষন প্রয়োজন। কি অবলিলায় তারা তাদের জন্য সেই প্রয়োজনীয় উষ-তা খুঁজে নেয়। অথচ সৃষ্টির স্রেষ্ঠ জীব মানুষ হয়েও আমি আমার জন্য প্রয়োজনীয় উষ-তাটুকু খুঁজে নিতে পারি না। যদিও আমাকে ওদের মত উন্মুক্ত প্রকৃতিতে থাকতে হয় না। আমার জন্য রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উষ- আবাস। কিন্তু এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উষ- আবাস-ও যে স্বজনহীন একাকিত্ত্বে হিম শীতল হয়ে যায়, আর সেই শীতলতা আমার প্রাণরসকে জমাট বরফে পরিনত করে-আমি জীবনমৃত হয়ে ঐ শীতবৃক্ষের মতই বেঁচে থাকি, একা, সঙ্গিবিহীন। কিন্তু কেন, কিসের দায়ে আমি এমন জীবনমৃত হয়ে থাকব? আমি জীবনের সব রূপ, রস, গন্ধ থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখে রোজ কাজে যাচ্ছি, অর্থ উপার্জন করছি, সেই অর্থে খেয়ে পরে একটা একটা করে দিন পার করছি-এটাই কি জীবন? এভাবে বাঁচব বলেই কি আমি আমার সব ছেড়ে এতদূরে একলা হয়ে হিমাগারের কফিনে শুয়ে আছি? কেন আমি ঐ গাংচিলের মত উষ-তার জন্য উষ- দেশে চলে যেতে পারছিনা? আমার তো কোন পিছুটান নেই! তবে?

 

নাহ্‌ আমার বয়স বাড়ছে। আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। নইলে বুড়োদের মত আজকাল আমি এত ভাবি কেন? একটু অবসর পেলেই হল, অমনি সাতপাঁচ ভাবনা এসে আমাকে স্থবির করে দেয়। আমি নিজেকে তিরস্কার করি। বাস্তবতা ভূলে শুধু ভাবলেই তো আর চলবে না আমার। সারা সপ্তাহের ময়লা কাপড় ধোবার জন্য এখন একবার বেজমেÏেট যেতে হবে আমাকে। আমি শুণ্য কফির মগটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকি।

 

সমস্ত ময়লা কাপড় গুছিয়ে লিফ্‌টের সামনে অপেক্ষা করতে করতে আমার আবারও মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন সঙ্গির সত্যি ভীষন প্রয়োজন। এই যে এখন আমাকে একা একা বেজমেÏেট যেতে হবে ভাবতেই আমার শরীর ভয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে। এখন একজন সঙ্গি থাকলে কত ভাল হত! লিফ্‌ট এসে গেছে। আমি মনে মনে ‘‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে’’ গুনগুন করতে করতে লিফ্‌টে উঠি। কিন্তু এই গানেও আজ নিজেকে সাহসী বা ইন্‌স্পায়ার্ড মনে হয়না আমার। কবি গুরু তুমি কি করে বুঝবে তোমার জন্য এই কথাটা বলা যতটা সহজ ছিল, কথাটাকে বাস্তবায়িত করা ততটা সহজ মোটেও নয়। নিজ জমিদারীতে পরিবার, পরিজন, প্রনোয়িনী, ভক্ত, অনুরাগীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকে অভ্যস্ত তোমাকে তো কখনও কাউকে ডাক দিতেই হয়নি, ডাকার আগেই অনেককে পেয়ে গেছ তুমি। তুমি কি করে বুঝবে একলা চলা কতটা কঠিন, কতটা কষ্টের? তাও আবার নিজভূমি ছেড়ে এই প্রবাসে! রবি ঠাকুরকে অদৃশ্য প্রতিপক্ষ মনে করে মনে মনেই তার সাথে বিতর্ক করতে করতে নিজেকে আমি কিছুটা সাহসী ভাবার চেষ্টা করি।

 

 

রবিবার সকাল সকাল ব্রেকফাষ্ট সেরেই লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏেটর জন্য পিসি’র সামনে বসি। এসময়ে লিলিয়ানা হয়ত রাত্রিযাপনের ক্লান্িত দূর করতে গভীর ঘুমে। আর আমাকে কিনা তার জন্যই এই ছুটীর দিনেও সকাল সকাল বিছানা ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু কি আর করা, বন্ধুত্ত্বের দায় বিষম দায়! কিছুটা হলেও শুধতে তো হবেই। আমি আমার ভাবনাকে আর প্রশ্রয় না দিয়ে গুগলে হানা দেই। গুগল্‌ মূহুর্তের মধ্যেই আমার চোখের সামনে আমার বাংলাদেশ আর তার যাবতীয় তথ্যের ঝাঁপি মেলে ধরে। কত শত ইনফর্মেশন! কোথা থেকে শুরু করব, কিভাবে লিখব ভাবতেই মনে পরল লিলিয়ানা তো শুধু দেশ নিয়ে এ্যাসাইনমেÏট লেখার কথা বলেছে, কিন্তু তাতে কোন কোন বিষয় থাকবে সেটা তো বলেনি! একটা দেশের তো কত রকমের বিষয় থাকে, কতদিক থাকে, তার সবকিছু কি আর কয়েক পৃষ্ঠার এ্যাসাইনমেÏেট লেখা সম্ভব? আমি কি একবার ওকে ফোন করব? কথাটা ভাবতেই নিজেই আবার সাথে সাথে নাকচ করে দিলাম। ও তো এখন নির্ঘাৎ ঘুমোচ্ছে। তার চাইতে আমি নিজেই বরং নিজের মত করে লিখি। কিন্তু নিজের মত করেই বা কি লিখব? হঠাৎ মনে পরল আমার এই লেখাটা আগামীকাল লিলিয়ানা তার পুরো ক্লাসের সামনে পড়বে। আর এটা মনে পরতেই মূহুর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমি বাংলাদেশের প্রাপ্তি আর অর্জনকে হাই লাইট করেই লিখব। কারণ উন্নত বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মানেই হতাশা, দারিদ্র, দূর্নীতি আর বন্যায় নিমজ্জিত একটা দেশ। বাংলাদেশেরও যে অহংকার করার মত কিছু থাকতে পারে, বাংলাদেশেরও যে কোন অর্জন থাকতে পারে এটা যেন এরা কল্পনাই করতে পারে না। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাটা মনে পরে গেল। আমি এদেশে আসার কিছুদিন পরের কথা। জানুয়ারী মাস, ভীষন ঠান্ডা। চারিদিকে শুভ্র তুষারে ঢাকা। এরমধ্যেই একদিন ট্রেনে করে ফিরছিলাম। আমার মুখোমুখি একজন মধ্যবয়সি এদেশি ভদ্রলোক বসেছিলেন। ট্রেন চলতে শুরু করার কিছুক্ষন পরেই উনি আমার সাথে আলাপ করতে চাইলেন-

 

-এক্‌স্কিউজ মি! তুমি কি ইন্ডিয়ান?

 

-না আমি ইন্ডিয়ান নই, আমি বাংলাদেশী।

 

-‘ওহ্‌ সরি! আমি তোমাকে ইন্ডিয়ান মনে করেছিলাম। তোমাকে ওদের মতই দেখতে কিনা!’ ভদ্রলোক ভদ্রভাবেই নিজের ভূল স্বীকার করেন।

 

-‘না না সরি হবার কিছু নেই। আমাকে ওদের মত লাগতেই পারে তোমার কাছে। কারণ মাত্র কয়েকটা বছর আগেও আমরা একই দেশ ছিলাম।’ আমিও বিনয় করে বলি।

 

-আসলে আমি ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কেই কিছুটা জানি, বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিনা।

 

-সেটাই তো স্বাভাবিক! ইন্ডিয়া বয়সে এতটাই প্রৌ• যে তার সঠিক বয়সটাই প্রায় কেউই জানে না। আর সেখানে কিনা বাংলাদেশের বয়স সবে তিরিশের ঘরে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে মানুষ ইন্ডিয়ার চেয়ে কমই চিনবে।

 

-‘তোমাদের দেশে তো শুধুই পানি। বাংলাদেশ তো বন্যার পানিতে ডুবে থাকা একটা দেশ, তাইনা?’ ভদ্রলোক এবার বাংলাদেশ সম্পর্কে ওনার একমাত্র জ্ঞানের কথাটুকু বলেন।

 

কিন্তু এবার আমার খুব রাগ হয়! এই একটা কথা শুনতে শুনতে আমি মহাবিরক্ত। বহির্বিশ্বে প্রায় সবারই এটাই ধারণা বাংলাদেশ মানেই বন্যার পানি। বন্যা কি আর কোন দেশে হয় না? আমি নিজের বিরক্তিটুকু যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করে বলি, -‘তোমার বুঝি তাই ধারণা, সারা বছর বাংলাদেশে কেবল বন্যাই হয়, আর বাংলাদেশ সারাক্ষন বন্যার পানিতে ডুবে থাকে? কিন্তু তুমি কি জানো এই আমি আমার এত বছরের জীবনে কখনও বন্যা দেখিনি, বাংলাদেশে থেকেও?’

 

ভদ্রলোক এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, -‘তাই নাকি? আসলে দেখ, টিভিতে যা দেখায় আমরা তো সেটাই জানতে পারি। তার বাইরে তো আমাদের পক্ষে কিছু জানা সম্ভব হয়না, তাইনা?’

 

ভদ্রলোকের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারি। আমি জানি উনি ঠিকই বলেছেন। উন্নত দেশের টিভিতে আমাদের মত দেশগুলোর অন্ধকার দিক ছাড়া কখনও কোন আলোকিত দিক দেখানো হয়না। তবে আর এনার দোষ কোথায়? কিন্তু তবুও আমার রাগ যেন পরতেই চায় না। আমি হঠাৎ ছেলেমানুষের মত বলে ফেলি-

 

-এই যে তোমরা বাংলাদেশ মানেই বন্যার পানিতে নিমজ্জিত একটা দেশ বলে জান, একবারও ভেবে দেখেছ কি বাংলাদেশের এই বন্যার জন্য কোন বিষয় বা কি কারণ মূলত দায়ি?

 

আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে জবাবের অপেক্ষায় কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকি। কিন্তু পরে নিজেই আর তার জবাবের অপেক্ষা না করে বলি,

 

-‘তোমরা যারা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল মার্কেট ইকোনমি কাÏিট্র তারা নিজেদের উন্নত থেকে উন্নততর করতে গিয়ে পৃথীবির উষ-তা বাড়িয়ে দিয়ে নর্থ পুলের সমস্ত বরফ গলিয়ে সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছ। আর তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশই শুধু নয়, এর সাথে আরও অনেক দেশ জলচ্ছ্বাস আর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। তোমরা তোমাদের প্রযুক্তির সুফলটা ভোগ করছ, আর আমাদের বিনা অপরাধেই তার কুফলটা ভোগ করতে হচ্ছে। তোমরা নিজেদের আলোকিত করতে গিয়ে আমাদের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছ। আবার এই তোমরাই ‘বাংলাদেশ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত দেশ’ বলে বেড়াও!’

 

ভদ্রলোক আমার কথা শুনে এতটাই হতভম্ব হয়ে যান যে আর কোন কথাই বলতে পারে না। আর আমিও আমার ছেলেমানুষী আচরনে অস্বস্তিবোধ করতে থাকি। কথাগুলো বলার সময় বুঝিনি যে ছেলেমানুষী হচ্ছে। তখন আমার মধ্যে শুধু ক্ষোভটাই কাজ করছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কাজটা ছেলেমানুষী হয়ে গেছে। কারণ সত্যও তো আসলে সবসময় বলা যায় না। তবে কথাগুলো বলে একটু যে ভালও লাগছে না তা কিন্তু নয়।

 

রাতের মধ্যে লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏট লিখে এ্যাটাচ্‌ড করে ওকে মেইল করে দিলাম। এ্যাসাইনমেÏটটা লিখে নিজের কাছেই বেশ ভাল লাগছে আমার। কাল যখন লিলিয়ানা ওর ক্লাসে সবার সামনে বাংলাদেশ নিয়ে লেখা এই এ্যাসাইনমেÏট প্রেজেÏট করবে তখন সেখানকার সবাই বাংলাদেশ নিয়ে অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারবে। জানতে পারবে বিশ্বের দরবারে এই ছোট্ট দেশটার অর্জনও কিছু কম নয়। আরও জানবে বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলাদেশিদের অবিশ্বাস্য ইতিহাস!

 

 

 

 

পরদিন কাজ থেকে ফিরে সবে কফি নিয়ে বসেছি অমনি লিলিয়ানার ফোন এল।

 

-‘হানি থ্যাঙ্কস্‌ আ লট! তুমি নিজেও জান না তুমি আমাকে কত সুন্দর একটা এ্যাসাইনমেÏট করে দিয়েছ। আমি ক্লাসে যখন সবার সামনে পরে শোনাচ্ছিলাম তখন পুরো ক্লাস ছিল একদম পিন ড্রপ সাইলেÏট। পরা হয়ে গেলে আমার টিচার তো আমার এ্যাসাইনমেÏেটর ভীষন প্রশংসা করেছে। বলেছে আমি বাংলাদেশকে নতুন করে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। হানি আই এ্যাম রিয়েলী প্রাউড অফ ইউ এ্যান্ড আই এ্যাম প্রাউড অফ মাইসেলফ অলসো। বিকজ আই হ্যাভ আ ফ্রেন্ড লাইক ইউ।’ লিলিয়ানা বিশ্বজয়ের উত্তেজনা আর আনন্দ নিয়ে গড়গড়িয়ে কথাগুলো বলে যায়।

 

আমি আমার বাংলাদেশকে সবার সামনে নতুন ভাবে তুলে ধরতে পেরে একদিকে যেমন ভীষন আনন্দিত হই, অন্যদিকে তেমনি নিজের প্রশংসা শুনে কিছুটা অস্বস্তি হয়। তাড়াতাড়ি করে ওকে বলি, -‘অযথা এত বেশি বেশি বল না তো। আমার লেখায় তোমার হেল্প হয়েছে এটুকুতেই আমি খুশি। এখন বল শনিবার রাত তোমার কেমন কাটল?’

 

-‘না সুইটি খুব ভাল কিছু ছিলনা। আমরা সারারাত একসাথেই কাটিয়েছি ঠিকই তবে আমি এটাও বুঝেছিলাম আমি রং নাম্বারে ডায়াল করেছি।’ লিলিয়ানার বলার ঢঙ্গে কোন কষ্টবোধের ছিটেফোটাও নেই।

 

-‘ওহ্‌! সো স্যাড্‌!’ তবুও আমি কপট দুঃখ প্রকাশ করি।

 

-‘ডোÏট বি স্যাড্‌! এটা রং নাম্বার ছিল তো কি হয়েছে নেক্সট্‌ উইকে রাইট নাম্বার পেয়েও যেতে পারি।’ লিলিয়ানা দমবার পাত্রি যে নয় সেটা তার কথাতেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

 

লিলিয়ানার সাথে কথা শেষ হবার পরেও ওর কথা আমার মাথা থেকে যেতে চায় না। ওদের এই জীবনটাই কি সঠিক, ভাল? অন্তত আমাদের মত দুঃখবোধ যে ওদেরকে পিছিয়ে দেয়না এটা তো সত্যি। এই যে নিজ দেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়েছে, কিন্তু কই তার জন্য ওর মনে তো আমার মত এতটুকু কষ্টবোধ নেই! এদেশে ওরও কোন স্বজন থাকে না, তাতেও ওর কোন দুঃখ নেই। কয়েক বছর আগে এদেশি এক ছেলের সাথে ইÏটাের্নটে প্রেম হওয়াতে এদেশে চলে এসেছিল লিলিয়ানা। সেই প্রেমিকের সাথেই দু’বছরের মত ছিল ও। কিন্তু সেই প্রেমিকটিও তাকে ছেড়ে গেছে আজ অনেকদিন। লিলিয়ানা ইচ্ছে করলেই নিজ দেশে ফিরে যেতে পারত, কিন্তু সে আর ফিরে যায়নি। এখানে থাকতেই নাকি তার ভাল লাগে। সেই প্রেমিকটির সাথে বিচ্ছেদের পরে লিলিয়ানা আর কারও সাথে লিভ টুগেদার করেনি ঠিকই, কিন্তু এরকম ক্ষণস্থায়ি টুকরো প্রেম একটাদিনের জন্য সে থামিয়েও রাখেনি। আমি তার এই ক্ষণস্থায়ি প্রেমের সমালোচনা করলেই লিলিয়ানা প্রতিবাদে মুখোর হয়। বলে, -‘স্থায়িভাবে ভালোবাসার জন্য জীবনে কাউকে যতদিন না পাব ততদিন কি আমার জীবনে কোন প্রেম থাকবে না? ক্ষণস্থায়ি বা টুকরো প্রেম বলেই কি সেগুলো প্রেম নয়, সেই কাটানো সময়গুলো মধুর নয়?’ এরপরে আমি আর লিলিয়ানার সাথে তার কখনও মাসিক, কখনও সাপ্তাহিক, কখনও বা দৈনিক প্রেম নিয়ে তর্কে জড়াইনা। ওর কথা শুনলেই আমার কেবল কিশোর কুমারের গানটা মনে পরে, ‘‘পলভারকে মুঝে কই পেয়ার কারলে, ঝুঠা হি সাহি!’’ একটা পলের জন্য হলেও আমাকে কেউ ভালোবাসুক, সে ভালোবাসা মিথ্যে হলেও ক্ষতি নেই। মিথ্যে ভালোবাসাতে লিলিয়ানাদের সমস্যা না থাকলেও আমার অনেক সমস্যা আছে। আমার কাছে বরং মনে হয়, যদি মিথ্যেই হয় তবে সামান্য একটা পলের জন্যও ভালোবাসার কোন প্রয়োজন নেই। নাহ্‌ আমার পক্ষে কখনোই লিলিয়ানার মত হওয়া সম্ভব না। কিন্তু এতটা বৈপরীত্য নিয়েও আমার আর লিলিয়ানার মধ্যে বন্ধুত্ত্ব হতে কোন সমস্যাই হয়নি। আসলে বন্ধুত্ত্ব ব্যাপারটাই বোধহয় এমন। বন্ধুত্ত্ব হওয়ার কোন ফরমূলা নেই।

 

 

 

বুধবার কাজে থাকতেই মায়ের এস এম এস পেলাম। খুব নাকি জরুরী দরকার, বাসায় গিয়েই যেন ফোন করি। আমার খুব টেনশন হচ্ছে! কি হয়েছে হঠাৎ যে এমন জরুরী ফোন করতে বলা হয়েছে? আমি মাকে কতবার করে বলেছি আমাকে কখনও যেন এরকম কোন মেসেজ না পাঠায়। আর একান্ত যদি পাঠাতেই হয় তবে যেন অল্প করে হলেও কারণটা নিয়ে লেখা হয়। নইলে আমার ভীষন দুশ্চিন্তা হয়, নার্ভাস লাগে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মায়ের কোন চেঞ্জই নেই। আমার কাছে কোন কার্ড না থাকায় বাসায় যাওয়া পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। কার্ড থাকলে আমি কাজ থেকেই ফোন করতাম, এতক্ষন ধরে টেনশন নিয়ে থাকতাম না।

 

 

 

বাসায় ফিরে কোন রকমে হাতব্যাগটা নামিয়ে রেখেই দেশে ফোন করলাম। মা’ই ফোনটা রিসিভ করলেন।

 

-কি ব্যাপার মা, কি হয়েছে, এত জরুরী ভিত্তিতে ফোন করতে বলেছ যে?

 

-‘হ্যা! বিষয়টা খুব জরুরী। শোন তোর লাভলী খালার একটা ভাগ্নী ইটালীতে থাকে না? তার এক দূসম্পর্কের দেবরের সাথে তোর জন্য সে নিজেই প্রপোজাল দিয়েছে। ছেলে নিজেও ইটালীতেই থাকে। তোর সবকিছু শুনে সে নাকি তোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন তোর সাথে কথা বলতে চায়। মুন্নি মানে লাভলীর ভাগ্নীর সাথে আমার কাল রাতে ফোনে কথাও হয়েছে। মুন্নি তো তার দেবরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওখানে ছেলের নিজের ব্যবসা আছে, রোজগার অনেক ভাল। বয়সেও তোর সাথে মানানসই। সাইত্রিশ পুরে আটত্রিশ চলছে। মুন্নি বলেছে ছেলে দেখতে শুনতেও নাকি ভাল। আমি তোর মেইল এ্যাড্রেস, ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছি। মুন্নি তার দেবরের ছবি তোকে মেইল করে দেবে। আর ছেলেটা আজ, কালকের মধ্যেই তোকে ফোন করবে। তুই মা রাগারাগি না করে সুন্দর করে কথা বলিস।’ এতগুলো কথা একনাগারে বলে মা এতক্ষনে একটু থামে। কিন্তু সে মাত্র ক্ষণিকের জন্য। পরক্ষনেই আবার বলে, -‘ছেলের সবকিছু শুনে তোর বাবার পছন্দ হয়েছে। ফ্যামিলি ভাল। ঢাকাতে নিজেদের বাড়ী আছে। ছেলে একাউÏিটং এ মাষ্টার্স। ভাইবোনও বেশি না, মাত্র দুই ভাই, এই ছেলেই বড়। ফোন করলে তুই কিন্তু অবশ্যই সুন্দর করে কথা বলিস, এর আগের ঘটনার মত কিছু করবি না, বুঝলি?’

 

আমি এতক্ষন ধরে চুপচাপ শুনে গেলাম মায়ের সব কথা। শুনে মেজাজ যে আমার কতটা খারাপ হয়েছে সেটা মাকে বোঝানো সম্ভব না। আমি নিজের মেজাজকে যথাসম্ভব সংযত করে শুধু বললাম, -‘টেনশন কর না, আমাকে ফোন করলে আমি ভদ্রভাবেই তার সাথে কথা বলব। তোমার মেয়ে আর যাইহোক অভদ্র না। তবে মা, এভাবে তোমার মেয়ের এ্যাডভার্টাইজমেÏট করে না বেরালেও পারতে!’

 

-কি বললি তুই? আমি তোর এ্যাডভার্টাইজমেÏট করে বেরিয়েছি? আমি তোকে বললামই তো মুন্নি নিজেই তার দেবরের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে।

 

-মা তুমি যদি লাভলী খালার কাছে আমাকে নিয়ে নাকি কান্না না কাঁদতে তবে লাভলী খালাও তার ভাগ্নীকে বলত না, আর এই মুন্নিও তার দেবরের জন্য আমার কথা বলত না।

 

মা’ও এবার ভীষন রেগে যায়, -‘তুই কি চাস বল তো? তুই কি আর বিয়ে করবি না? আর তুই বিয়ে করতে যদি নাও চাস, আমরাই বা তোর কথা শুনব কেন? আমাদের কি তোকে বিয়ে দেয়া দায়িত্ত্ব না? আর ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিতে গেলে এরকম কথাবার্তা বলতেই হয়। যোগাযোগ ছাড়া, কোন কথাবার্তা ছাড়া এমনি এমনি কারও বিয়ে হয়ে যায় না। তুই কোন ছোট বাচ্চা না যে তোকে এত বোঝাতে হবে।’

 

আমি বুঝতে পারছি মা আমার কথায় শুধু রাগই করেনি, আহতও হয়েছে। তাই একটু নরম সুরে এবার বলি, -‘কিন্তু মা, আবারও সেই একই ভূল করে কি লাভ?’

 

-‘বিদেশে থাকলেই সব ছেলে নষ্ট হয়ে যায় না। তাছাড়া এই ছেলের আত্ত্বীয় স্বজন আছে ওখানে, সবার মধ্যে থেকে আর কতটা খারাপ হতে পারে কেউ!’ মা’র গলাও এবার কিছুটা নরম শোনায়।

 

আমি আর কথা না বাড়িয়ে সেই ইটালী প্রবাসীর সাথে সুন্দর করে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাকে শান্ত করে ফোন রাখি। কিন্তু আমার মনটা আর শান্ত হয়না। পেছনদিকের অনেক কিছুই মনে পরতে থাকে। যতই জীবনের একটা দিককে ভূলে থাকতে চাই আমি জীবনই যেন তাকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। হঠাৎ মায়ের উপরে খুব অভিমান হয় আমার। এই যে মা-বাবা আমার বিয়ের জন্য এত ভাবছে, প্রায়ই এর তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়, কথা বলতে বলে, ছবি পাঠায়। একবারও কি তাদের মনে হয়না তাদের মেয়ের জন্য একটা বিয়ে বা একজন স্বামীই শুধু না নিজের স্বজনকেও প্রয়োজন? বরং তাদের মেয়ের মত অবস্থায় ওনাদের তো মেয়েকে নিজের কাছে রেখেই তার বিয়ের কথা ভাবা উচিৎ ছিল। তাকে এভাবে একলা রেখে বিয়ে দেয়ার কথা ভাবাই হয়ত তাদের জন্য ভূল । এভাবে শুধু বিয়ের চেষ্টা না করে একবারও কি ওনারা আমাকে বলতে পারেন না ‘‘বিদেশ বিভূই এ আর এভাবে একা একা থাকতে হবে না, তুই আমাদের কাছে চলে আয়।’’ কিম্বা ‘‘তুই আগে আয় তো, পরে তোর বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। আমরা তো আছিই?’’ কিন্তু না, গত কয়েকটা বছরে এই কথাটা কেউ আমাকে একবারও বলেনি। এমনকি সারে তিনবছর আগে আমি যখন মাসখানেকের জন্য দেশে গিয়েছিলাম তখনও আমি এমন একটা কথা খুব আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম বাবা নাহয় মা, কেউ একজন অন্তত বলবেন ‘‘তোর আর ফিরে গিয়ে কাজ নেই, তুই আমাদের কাছেই থাক’’। কিন্তু কেউ বলেনি কথাটা। সবাই আমাকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করাটাকেই আমার প্রতি তাদের একমাত্র দায়িত্ত্ব মনে করে। কিন্তু দায়িত্ত্ব যে আরও গভীরের উপলব্ধি সেটা কেউই বোঝে না। আজ আমার মনটা আবারও ভীষন খারাপ হয়ে যায়। অনেকদিন পরে আমার চোখ দুটো জ্বালা করে ওঠে। রাত বাড়তে থাকে। আমি ঘরে আলো জ্বালি না। আজ আর আমার খাওয়াও হয় না। সব ভূলে কিম্বা সব মনে পরে আজ অনেকদিন পরে অন্ধকার ঘরে আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমার ভীষন একা লাগে। আমার এই জীবনে মা-বাবার অভাব, স্বজনের অভাব, নিজপরিবারের অভাব, নিজভূমির অভাব, নিজের মত বলতে পারার মত মানুষের অভাব মিলেমিশে বিশাল এক শুন্যতা হয়ে আমাকে যেন ঘিড়ে ধরে। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

 

 

 

 

অন্ধকার ঘরে ঘুমহীন আমি শুয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আজ আর ঘুম আসবে না সহজে। হঠাৎই মোবাইলটা বেজে ওঠে। আমি চম্‌কে উঠি। কারণ এত রাতে ফোন পেয়ে আমি অভ্যস্ত নই। আমাকে এত রাতে কখনোই কেউ ফোন করে না। অন্ধকারের মধ্যেই মোবাইলের আলোতে ক’টা বাজে দেখতে গিয়েই ভীষন অবাক হলাম! এখন রাত বারোটা বেজে সাইত্রিশ মিনিট অর্থাৎ প্রায় মাঝরাত। কোন নাম্বারও নেই, আইডি উইথেলড্‌। এতরাতে অজানা নাম্বার থেকে ফোনকল, আমার কি রিসিভ করা উচিৎ! বুঝতে পারছি না। ভাবতে ভাবতেই লাইনটা কেটে গেল। যাক্‌ বাঁচা গেছে! মোবাইলটা বালিশের পাশে রাখতে যাব, আবারও হাতের মুঠোর মধ্যে বেঁজে উঠল। এবার আর দেরী করিনা, রিসিভ করি। আমারও তো জানা উচিত এতরাতে কে আমাকে বারবার কল দিচ্ছে।

 

-হ্যালো!

 

-‘হ্যালো! কে? আমি অনেকক্ষন থেইকা ফোন করতাছি, কেউ ধরতাছে না বইলা নম্বর ভূল মনে কইরা ফোন রাইখা দিমু মনে করছিলাম, আর অমনেই আপনে ধরলেন।’ ওপ্রান্ত থেকে অপরিচিত কন্ঠ।

 

আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা। এটা কে? এরকম ভাষায় কথা বলে এমন কারও সাথে তো আমার কোন পরিচয় নেই, অন্তত আমার মোবাইল নাম্বার জানার মত খুব কাছের কোন মানুষ এমনভাবে কথা বলে না। তাও আবার এতরাতে কল দেয়ার মত! নিজেকে আমার কেমন বোকা বোকা লাগে। তবুও বলি, -‘সরি! আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছিনা। আপনি কি আমাকেই চাইছেন, নাকি ভূল করে আমার নাম্বারে কল হয়ে গেছে?’

 

-‘ভূল হইব ক্যালা? আপনারেই চাইতাছি। আপনের মায়ের কাছে থেইকাই তো নম্বরখান আইজই লইছি। ফোন ধরছেনও আপনেই, তাইলে আর ভূল হওনের সুযোগ কোনহানে? আপনের মায় নিশ্চয়ই আমার কথা আপনের কাছে কইছে।’ লোকটি খুব গর্বিত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে।

 

এবার আমার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। এই তাহলে লাভলী খালার ভাগ্নীর দুসম্পর্কের দেবর, যার সাথে তার পরিবার তার বিয়ের কথা ভাবছে বলে তার ফোন নাম্বার তাকে না জানিয়েই দিয়ে দিয়েছে! এই লোকের সাথে তার বাবা-মা তার বিয়ের কথা ভাবছে? যে কিনা ঠিক মত কথা বলতেই জানে না, একজন ভদ্রমহিলাকে কখন ফোন করতে হয় সেটা জানে না, সে কিনা হবে আমার লাইফ পার্টনার? আমার বাবা-মায়ের উপরেই প্রচন্ড রাগ হয়! পরক্ষনেই এটাও মনে হয় বাবা-মা কি করে জানবে এই লোক কেমন, তারা তো আর এনার সাথে সরাসরি কথা বলেননি। কিন্তু এই লোক আমাকে যখন ফোন করেই ফেলেছে তখন তো ভদ্রতা করে হলেও কথা বলতে হয়।

 

-‘জ্বি! বলুন, এতরাতে কি মনে করে আমাকে ফোন করেছেন?’ আমি নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করি।

 

-অ অনেক রাইত হইছে? আপনে কি ঘুমায়া পরছিলেন? আমার কাছে তো এইডা কোন রাইতই না, তাই ভাবছিলাম আপনের লগে কথা সাইরা ফালাই।

 

এবার আর আমার নিজেকে সংযত করা কঠিন হয়ে পরে। আমি একটু গম্ভীর ভাবেই বলি, -‘রাত প্রায় একটা, এটা ফোন করার জন্য অবশ্যই অনেক রাত। তাছাড়া আমাকে অনেক সকালে উঠে কাজে যেতে হয়, তাই এতরাতে আমি কখনও জেগে থাকিনা।’ একবার মনে হল বলি, আপনি বরং কাল দিনে ফোন করবেন। কিন্তু এই লোকের সাথে আমার আর দ্বিতীয়বার কথা বলার কোনই ইচ্ছে নেই, তাই সেটা আর না বলে আমি চুপ করে থাকি।

 

-‘ও আইচ্ছা! তাইলে আপনের লগে কথা কয়টা কইয়াই ফালাই। আপনে নিশ্চয়ই শুনছেন আমার লগে আপনের বিয়ের কথা চলতাছে। ভাবীর কাছে আপনের ফটুক দেখছি আমি, খারাপ লাগে নাই। অহন আমার কয়টা বিষয় জানোনের আছে। আপনি কি ভাবতেছেন, বিয়ে অইলে আপনে এখানে আইয়া পরবেন, নাকি আমারেই আপনের ওখানে যাওন লাগব?’ আমি যে বিরক্ত হয়েছি সেদিকে লোকটির কোন ভ্রুক্ষেপই নেই, সে নির্বিকার ভাবে নিজের কথাগুলো বলে যায়।

 

কি আশ্চর্য্য! এ কেমন মানুষের পাল্লায় পরলাম আমি! কথা বলার কোন নিয়ম মানে না, কোন কথাটা কিভাবে বলতে হবে কিছুই জানে না। আমি ধৈর্য্যের শেষসীমায় পৌঁছে গেছি এবার। এবার আর কোন ভদ্রতা না করেই সরাসরি বলি, -‘আপনি সম্ভবতঃ ভূল শুনেছেন, আমার বিয়ে করারই কোন ইচ্ছে নেই। তাই আমার সাথে আপনার বিয়ের পরবর্তী জীবনের পরিকল্পনা করে কোনই লাভ নেই।’

 

আমার কথা শেষ না হতেই লোকটি কথা বলে ওঠে, -‘কিন্তু আপনের মায় যে কইছিল আপনে বিয়ে করতে রাজী আছেন? ভাবী তো সবকিছু জাইন্যা শুইন্যাই আমারে আপনের কথা কইছে!’

 

-আসলে আমার মা মনে করেছিলেন আমি এখন বিয়ে করব, তাই উনি আমাকে কিছু না জানিয়েই আপনার ভাবীর সাথে কথা বলেন। কিন্তু আমি আপাততঃ বিয়ের কথা ভাবছিনা। আপনি কাইন্ডলী কিছু মনে করবেন না।

 

মা-বাবা যখন বিষয়টা জানবেন তখনকার কথা ভেবে আমার সত্যিই কিছুটা খারাপ লাগে। কিন্তু আমারই বা কি করার আছে!

 

-‘অ তাইলে আর কি, আপনারে দেখতাছি আজাইর‌্যা ফোন করলাম।’ কথাটা বলেই লোকটি ফোন লাইন কেটে দিল। কোন বিদায় সম্ভাষন না, ভদ্রতা না। আমি যারপর নাই অবাক! এ কি! এ কেমন মানুষের সাথে আমার ফ্যামিলি আমার বিয়ের কথা ভাবছিল?

 

 

 

ঐ রাতের পরে সকালে উঠেই মাকে ফোনে বিস্তারিত জানিয়েছিলাম আমি। সব শুনে মা নিজেই বুঝেছিলেন ওখানে সম্বন্ধ করা সম্ভব না। পরে মা’ই লাভলী খালা আর তার ভাগ্নীকে সামলেছিলেন। ঐ ঘটনার পরে প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে আমাকে আর বিয়ে নিয়ে কিছুই বলেনি মা বা বাবা। আমিও আমার বৈচিত্রহীন জীবন কাটিয়ে যাচ্ছি। রোজ সকালে কাজে যাই, আবার বিকেলে কাজ থেকে ফিরে একার ঘরকন্যা করি। আর অবসরে ইÏটার্নেটে দেশের টিভি প্রোগ্রাম দেখি। আসলে এসব আমাকে করতে হয় বলেই করি আমি। এসব কোন কাজেই আমার কোন প্রাণ থাকে না। ইন্‌ফ্যাক্ট আমার এই জীবনটাকেই তো আমার নিজের বলে মনে হয় না। মনে হয় অন্যের জীবন যাপন করে যাচ্ছি যেন আমি। এ যেন আমার জন্য নির্বাসন।

 

সেদিন কাজের এত প্রেসার ছিল যে লাঞ্চের সময়টুকুতেও টান পরেছিল। কোনরকমে হালকা কিছু দিয়ে লাঞ্চ সারতে হয়েছিল আমাকে। ফলে বিকেল হতে না হতেই আমার প্রচন্ড ক্ষিধে পেয়ে যায়। অথচ আজ আমার ফ্রিজে তেমন কোন খাবারও নেই যে ঘরে ফিরেই আগে কিছু খেয়ে নিতে পারি। কিছু খেতে হলে আমাকে সেটা রেঁধেই খেতে হবে, আর এখন এটা ভাবতেও নিজের জন্য কষ্ট লাগছে আমার। এত ক্ষুধা নিয়ে রাঁধতে বসা যে কত কষ্ট সেটা শুধু সেই বুঝবে যার এই অভিজ্ঞতা আছে। শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক করলাম, আজ আমার বাসার কাছের শপিংমল থেকে কিছু একটা খেয়ে তবেই বাসায় যাব। যদিও একা একা কোন রেষ্টুরেÏেট খেতে আমার মোটেও ভাল লাগে না। তবে এটা ভাবাটাও আমার জন্য ন্যাকামি! আমি নির্ভেজাল একা মানুষ, দোকা পাব কোথায়? তাছাড়া এরকম ভয়ংকর ক্ষিধের মুখে অতশত ভাবারও কোন অবকাশ নেই। আমি আমার ষ্টেশনে নেমে সোজা গিয়ে ম্যাক্‌ডোনালড্‌সে ঢুকলাম। ম্যাক্‌ডোনালড্‌সের খাবার আমার বেশ ভালই লাগে খেতে। কিন্তু প্রচুর ফ্যাট বলে খুব একটা খেতে চাই না আমি। তবে ক্ষুধার তাড়নায় আজ আমি সব ভাবনা, সব সচেতনতার উর্ধ্বে। এখন আমার কাছে সেই খাবারটাই সবচাইতে বেশি গ্রহনযোগ্য যেটা সবচাইতে কম সময়ে আমি খাবার সুযোগ পাব। সেই হিসেবে ম্যাক্‌ডোনালড্‌স ইজ দা বেষ্ট প্লেস। তবে যদি ভীড় থাকে তো সেখানেও অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমার ভাগ্যটা ভালই দেখা যাচ্ছে, আজ তেমন একটা ভীড় নেই। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমার টার্ন চলে এল। আজ আর অল্পতে হবে না ভেবে বিগ্‌ম্যাক্‌ এর বড় একটা মেন্যু অর্ডার করলাম। সাথে এ্যাপেল পাই। আজ এটাই আমার ডিনার। ভাবতেই ভাল লাগছে, বাসায় ফিরে আজ আর আমাকে রান্নার ঝামেলায় যেতে হবে না। খাবার পরে যাবার আগে নাহয় একটা লার্জ কফি খেয়ে একদম রিফ্রেশ হয়েই ঘরে ফিরব। যেন ফিরে গিয়ে বাকী সময়টুকু আমি স্রেফ রিল্যাক্স করতে পারি। আহ্‌! কি শান্িত আজ আমাকে রাঁধতে হবে না! ভীষন দক্ষতা আর দ্রুততায় ম্যাক্‌ডোনালড্‌সের অর্ডার ডেলিভ্যারী দিতে ব্যস্ত টিন্‌ ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘আজ তোমরাই আমার জন্য রাঁধো, আমি আরাম করি।’

 

আমার খাবার এসে গেছে। খাবারের ট্রেটা হাতে নিয়ে বসার জন্য নিরিবিলি কোন জায়গা খুঁজতে খুঁজতে দোতলায় চলে এলাম। কারণ নীচের সবগুলো বসার জায়গাই প্রায় ভরা। আর অপরিচিত কারও সাথে টেবিল শেয়ার করতে ভাল লাগে না আমার। উপরে এসে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কয়েকটা টেবিলই নিরিবিলি পরে আছে। যেদিকে অপেক্ষাকৃত কম মানুষ বসেছে আমি সেদিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। আহ্‌! এখন এই নিরিবিলিতে বেশ অনেকটা সময় রিল্যাক্স করে বসা যাবে। আমি আর দেরী না করে খাবারের প্রতি মনোযোগ দিলাম। সত্যি আজ ভীষন ক্ষিধে পেয়েছে আমার। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে খেতে থাকি। হঠাৎ বাংলা কথা শুনে চম্‌কে উঠলাম আমি! বাঙ্গালী কেউ কি আমাকে কিছু বললো? আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম না। কাউকে বাঙ্গালীও মনে হল না। তাহলে বাংলায় কে কথা বলছে এখানে! কিন্তু আর কোন কথা শুনতে পেলাম না বলে আমার মনের ভূল মনে করে আবারও খাওয়াতে মনোযোগ দিতে যাব, অমনি আবারও বাংলা কথা শুনতে পেলাম। বিদেশে এই এক মুস্কিল! আশেপাশে একই ভাষাভাষি কেউ যত মৃদু স্বরেই কথা বলুক না কেন ঠিকই স্পষ্টভাবে কানে চলে আসে। আমি এবার বুঝতে পারলাম কে কথা বলছে। আমার টেবিলের কোনাকুনি দ্বিতীয় টেবিলে একজন ভদ্রলোক মোবাইলে কথা বলছেন। আমার দিকে পিছন ফিরে বসে আছেন বলে ওনার চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছিনা, ফলে উনি যে বাঙ্গালী একজন সেটাও বুঝিনি আমি। যাইহোক অন্যের কথা আড়ি পেতে শোনা গর্হিত কাজ জেনেও এখন আমাকে বাধ্য হয়েই ওনার কথাগুলো শুনতে হচ্ছে। কারণ উনি আমার শ্রবনযোগ্য দূরত্ত্বে বসেছেন। তবে আমার কাজটা নিশ্চয়ই গর্হিত কোন কাজ হচ্ছেনা, কারণ আমি আড়ি না পেতেই ওনার কথা শুনছি এবং অনিচ্ছাতেই। অবশ্য ভদ্রলোকের কথার বিষয়বস্তু মোটেও আপত্তিজনক কিছু না, যা অন্যে শুনে ফেললে খারাপ কোন ব্যাপার হবে। উনি ওনার মায়ের সাথে কথা বলছেন। আমার বরং ভালই লাগছে ওনার ফোনালাপ শুনতে। একা একা খাচ্ছিলাম, এখন বরং ভদ্রলোকের মায়ের সাথে গল্প ইন্ডাইরেক্টলী আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে। আমি আমার খাবার এবং ভদ্রলোকের কথা, দুটোতেই একসাথে মনোযোগী হই।

 

-‘তোমার ছেলে আজ কতদিন ভাত খায়নি, তোমার রান্না খাবার খায়নি, তারপরেও তুমি তাকে ভাল থাকতে বলছ মা?’

 

ভদ্রলোকের কন্ঠে একটু যেন অভিমান। আহারে আহçাদি ছেলে, এই বয়সেও মায়ের কাছে তার কি ভীষন অভিমান! কি জন্য? না, তিনি বিদেশে এসে কয়েকদিন মায়ের হাতের রান্না আর ভাত খাননি বলে! আমার হাসি পেয়ে যায়। পরতো আমার অবস্থায় তবে বুঝত এত আহçাদিপনা কোথায় দেখাত!

 

-‘আরে, আমি কি আর বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজতে বাকী রেখেছি! অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু এর আগের ক’টাদিন নর্থের যে এলাকায় ছিলাম, ওখানে এরকম কোন রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে পাইনি। একে তাকে জিগ্যেস করেও কারও কাছে থেকেই বাংলাদেশি কোন রেষ্ট্রুরেÏেটর হদিস পাইনি আমি। আর এখানে তো গতপরশু এসেই কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পরলাম যে এখনও দেশি রেষ্ট্রুরেÏট খোঁজার সুযোগই পেলাম না। কালকেও খুব ব্যস্ত থাকব। কিন্তু পরশুদিন আমাকে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে বের করতেই হবে, নইলে আমি মরেই যাব। ভাত না খেয়ে আমি আর সত্যি থাকতে পারছি না মা।’

 

 

ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি মনে মনে বলি, -‘তুমি বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজতেই থাক বাবাজীবন, কিন্তু কখনোই তোমাকে এই দেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজে পেতে হচ্ছে না। তুমি তো আর জানোনা বাংলাদেশিদের আত্মবিশ্বাস কতটা দূর্বল! ইউরোপ, আমেরিকায় বাংলাদেশিরা চুটিয়ে রেষ্ট্রুরেন্ট ব্যবসা করছে। কিন্তু ঐ আত্মবিশ্বাসের অভাবে তারা কেউই নিজেদের সেই রেষ্ট্রুরেÏেটর নামকরন বাংলাদেশি কোন নামে বা বাংলা কোন শব্দ দিয়ে করে না। তারা বাংলাদেশি হয়েও তাদের রেষ্ট্রুরেÏেটর ইন্ডিয়ান নাম রাখে। তারা মনে করে ইন্ডিয়া মানচিত্রের বিশাল জায়গা দখল করে থাকা অতি প্রাচীন একটা দেশ, যাকে সবাই চেনে। তাই ইন্ডিয়ান নাম হলে তাদের রেষ্ট্রুরেÏট চলবে ভাল। আর বাংলাদেশ যেহেতু মানচিত্রের মাইক্রোস্কোপিক জায়গা নিয়ে থাকা বয়সে অনেক নবীন একটা দেশ, সেহেতু তাকে কেউ চেনেও না, বাংলাদেশের নামে রেষ্ট্রুরেÏট হলে সেই রেষ্ট্রুরেÏট চলবেও না। এসব দেশের ইন্ডিয়ান রেষ্ট্রুরেÏট নামে প্রচলিত ম্যাক্সিমাম রেষ্ট্রুরেন্টই আসলে বাংলাদেশি। কিন্তু বাবাজীবন তুমি যদি সেটা না জানো তবে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া তোমার ভাগ্যে তো আর কিছুই জুটবে না।’ আমি খেতে খেতে হালকা মুডে মনে মনে ভাবি। আবারও কানে কিছু কথা এসে যায়-

 

-‘কি আর খাব! সেই ‘‘ফাষ্টফুড’’ নামে খ্যাত সারাবিশ্বের মাথা কিনে নেয়া তুলতুলে দুটো ময়দার গোলাকার কুশনের মধ্যে জুতার শুকতলির মত শুকনো এক টুকরো মাংশখন্ড আর কিছু সালাড দেয়া বার্গার! সাথে আলু ভাজা, যার এদেশীয় পোশাকী নাম ‘‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’’! ক’দিন ধরে এই তো খাচ্ছি। খাচ্ছি আর সেই সাথে ম্যাক সাহেবেরও মুন্ডু চিবাচ্ছি!’ ভদ্রলোক মহাবিরক্তি নিয়ে বলে।

 

আমি এবার হেসেই ফেললাম বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে ভদ্রলোকের স্বরচিত বর্ণনা শুনে! বেশ মজার মানুষ তো! এখন আমার ওনার চেহারাটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। একজন ভেতোবাংগালী, তার উপরে আবার মায়ের আহçাদী ছেলে, সর্বোপরি ফাষ্টফুড নিয়ে যার এমন অভিনব বর্ণনা তাকে দেখার এমন নির্দোষ কৌতুহল আমার তো হতেই পারে। আমি ভাবতে না ভাবতেই দেখি ভদ্রলোক তার মাকে ‘বাই’ বলে তার উচ্ছিষ্ট খাবারের ট্রে নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। এখন ওনাকে বেরিয়ে যেতে হলে আমার পাশে দিয়েই যেতে হবে। আমি তখন তাকে দেখতে পাব। বাহ্‌! আমার সব ইচ্ছেই যদি এমনি করে ভাবতে না ভাবতেই বাস্তবায়িত হয়ে যেত! কিন্তু হায়, তা তো আর হয় না! ভদ্রলোক এদিকেই আসছেন দেখে আমি সুবোধ চেহাড়া করে আমার খাবারের দিকে পৃথিবীর সব মনোযোগ ঢেলে দেই। তারপর উনি ঠিক আমার কাছাকাছি আসতেই যেন হঠাৎই মুখ তুলে তাকিয়েছি এভাবে ওনার দিকে একবার তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। আমি মূহুর্তেই চোখ নামিয়ে নিলাম। মায়ের আহçাদী ছেলে দেখতে ভালই। বয়সে আমার চেয়ে খুব বেশি বড় হবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু একি উনি দাঁড়িয়ে পরলেন কেন! আমি না তাকিয়েই বুঝলাম ভদ্রলোক আমার টেবিলের পাশেই দাঁড়িয়েছেন।

 

-‘একস্কিউজ মি! আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’ ভদ্রলোক আমাকেই প্রশ্নটা করলেন।

 

-‘জ্বি! আপনার ধারণা ঠিক, আমি বাংলাদেশি।’ আমি এবার সরাসরি ওনার দিকে তাকিয়ে জবাব দেই।

 

-আপনি কি এখানেই থাকেন? মানে আমি বলতে চাইছি আপনিও কি আমার মত মাত্র ক’দিনের জন্য এখানে এসেছেন, নাকি এখানেই থাকেন?

 

-আমি এখানে বেশ কয়েক বছর ধরেই আছি যখন তখন আপাততঃ এখানেই থাকি বলা যায়।

 

-‘ওহ গড! ফাইন্যালী!’ ভদ্রলোকের বলার ঢঙ্গে মনে হল তিনি প্রায় বিশ্ব জয় করে ফেলেছেন।

 

আমি চোখে প্রশ্ন নিয়ে ওনার দিকে তাকাতেই উনি নিজেই বললেন, -‘আসলে হয়েছে কি, আমি কয়েকদিন ধরে এদেশে আছি।’ এটুকু বলেই ভদ্রলোক হঠাৎই যেন মনে পরেছে এমন ভাবে বলে ওঠেন, -‘আচ্ছা আমি কি আপনার এখানে বসে কথা বলতে পারি? অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে!’

 

আমি ব্যস্ত হয়েই বলি, -‘সরি আমারই হয়ত আপনাকে আগেই বসতে বলা উচিত ছিল। প্লিজ্‌!’

 

ভদ্রলোক হাতের ট্রেটা পাশের একটা খালি টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলেন, -‘না না, সরি হবার কিছু নেই। ইউরোপে থাকুন আর দেশেই থাকুন, বাঙ্গালী মেয়েরা তো বাঙ্গালীই থাকে। তারা চট্‌ করে কোন অচেনা পুরুষকে তার সাথে বসতে বলতে পারে না।’ তারপরেই বলেন, -‘হ্যা! যা বলছিলাম। বাই দা ওয়ে, আগে আমার পরিচয়টা দিয়ে নেই। আমি আজওয়াদ আরীজ!’ বলতে বলতে ভদ্রলোক আবারও উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশ্যাক করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। আমি একটু অস্বস্তিতে পরি। দেশের বাইরে আসার পরে হ্যান্ডশ্যাক তো হরহামেশাই করতে হয় আমাকে, কিন্তু তারপরেও কোন দেশি মানুষের সাথে এটা করতে আমার যেন কেমন লাগে। তার উপরে এখন আবার আমার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া হাত! আমি চট্‌ করেই একটু হেসে ওনাকে বলি, -‘একটু আগে আপনি নিজেই বললেন পৃথিবীর যেকোন দেশেই যাক না কেন, বাঙ্গালী মেয়ে বাঙ্গালীই থাকে। আর এখন কিনা আপনি নিজেই সেই বাঙ্গালী মেয়ের সাথে ইউরোপীয় কায়দায় পরিচিত হতে চাইছেন?’ ভদ্রলোক একটু যেন থম্‌কে যান। তারপরেই হা হা করে হেসে উঠে বলেন, -‘আপনি সুযোগের বেশ সদ্ব্যাবহার করতে পারেন দেখছি!’

 

-‘আজকাল জীবন যা হয়েছে আমাদের, কোন রকমের সুযোগ কি আর মেলে চট্‌ করে যে তাকে পেলে হেলায় হারাব? আজকাল তো সুযোগ পেতেও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হয়।’ আমিও হালকা মেজাজে বলি।

 

-‘বাহ্‌! বেশ বললেন তো!’

 

ভদ্রলোক আবারও বসেছেন। এবার উনি ওনার কথাগুলো গুছিয়ে বলতে চাইলেন, -‘আমি আজওয়াদ আরীজ। দেশে একটা মালটিন্যাশনাল কোম্পানীতে আছি। অফিসের থ্রুতেই আমার এই ইউরোপে আসা। আপনার এই দেশে আর আশেপাশের আরও কয়েকটা দেশ মিলে প্রায় দু’মাসের প্রোগ্রাম। আমাকে ছুটোছুটির উপরেই এই কয়েকটাদিন থাকতে হচ্ছে, হবে। কিন্তু তাতে কোনই সমস্যা নেই আমার। আমি ষ্ট্র্রেস্‌ নিতে পারি। কিন্তু আমি যা পারিনা তা হলো, এক নাগারে অনেকগুলোদিন ভাত না খেয়ে থাকা। আমি জানি আপনার কাছে বিষয়টা খুব ফানি মনে হচ্ছে। কিন্তু সত্যি বলছি আক্ষরিক অর্থেই আমি একজন ভেতোবাঙ্গালী। গত তেরোটাদিন আমি ভাত খাওয়া তো দূরের কথা, ভাত চোখেও দেখিনি। বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজে বের করতে প্রাণান্ত করেছি! ইন্টার্নেটেও সার্চ করেছি, কিন্তু একটাও পাইনি। আপনি কাইন্ডলী আমাকে একটা বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্টের এ্যাড্রেস বলে দিন।’

 

ভদ্রলোক এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আমার মুখের দিকে এমন করে তাকিয়ে রইলেন যেন এখন ওনার একমাত্র আশা ভরষা সব আমার উপরে নির্ভর করছে। যেন আমি এখন কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর হদিস দিয়ে ওনাকে প্রাণে বাঁচাব, নইলে উনি বেঘোরে মারা যাবেন। আমার ভীষন হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু এখন হাসলে সেটা অশোভন দেখাবে। ভদ্রলোক মনে করবেন ওনার ভাত খেতে না পারার কষ্টটা আমি উপলব্ধিই করতে পারিনি, বরং পরিহাস করছি। আর ব্যাপারটা ওনাকে আহত করবে। আমি নিশ্চয়ই সেটা করতে পারিনা। আমার রোজ ভাত না খেলেও চলে বলে সবারই চলতে হবে এমন ভাবাটা নিশ্চয়ই আমার ঠিক না। আমি নিজেকে যথাসম্ভব গম্ভীর রেখেই বলি-

 

-‘আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। ইনফ্যাক্ট আপনি যখন আপনার মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলছিলেন তখনই আমি বুঝেছি আপনি ভাতের জন্য কতটা অস্থির হয়েছেন।’ ভদ্রলোক আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাতেই আমি একরাশ অস্বস্তি নিয়ে অপরাধী স্বরে বললাম, -‘ইয়ে, মানে আপনার কথাগুলো আমার এখান থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ইচ্ছে না থাকলেও শুনতে হয়েছে আমাকে।’

 

ভদ্রলোক এবার হা হা করে হেসে ওঠেন।

 

-‘আরে আপনি এভাবে বলছেন কেন? এমন করে বলছেন যেন আমার কথা শুনে ফেলে আপনি কোন ক্রাইম করে ফেলেছেন। আপনি শোনাতে বরং ভালই হয়েছে আমার। আপনাকে আমার আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না যে আমি ভাতের জন্য সত্যি কতটা কাঙ্গাল হয়েছি।’ ভদ্রলোক অসহায় মুখ করে বলেন।

 

আমি এবার ওনার কাছে এখানকার বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর নামগত রহস্য উন্মোচন করে বলি, -‘কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর নামই যেহেতু বাংলা বা বাংলাদেশি নয় তাই ইÏটার্নেটে হাজারও সার্চ করেও আপনি কোন দেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে পাবেন না। আর এদেশিরা নিজেরাও তো বাংলাদেশিদের ভিতরের কথা জানে না, তাই তারা ঐ রেষ্ট্রুরেÏটগুলোকে ইন্ডিয়ানই মনে করে। আর সেকারনেই আপনি যখনই ওদের কাছে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খোঁজ জানতে চাইবেন তখন ওরা একটা কথাই বলবে ‘এখানে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট নেই।’

 

ভদ্রলোক যারপর নাই অবাক হয়ে বললেন, -‘কিন্তু কেন? কেন বাংলাদেশিরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করে পক্ষান্তরে ইন্ডিয়ার পাবলিসিটি করছে? ঠিক আছে শুরুতে এরা বাংলাদেশের সাথে পরিচিত ছিলনা বিধায় বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেট নয় একটু কমই যেত। কিন্তু কিছুদিন পরে তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর সাথে পরিচিত হয়ে যেত এবং বাংলাদেশিরা এভাবে হলেও কিছুটা তো অন্তত নিজেদের দেশকেও বিশ্বের দরবারে পরিচিত করতে পারত। আমার মাথায় সত্যি ঢুকছে না কেন আমাদের দেশের মানুষের আত্মবিশ্বাসের এত অভাব!’

 

আমার কাছেও এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। আমিও ঠিক এভাবেই অবাক হয়েছিলাম যখন প্রথম দেশ থেকে আসি। আসলে বাংলাদেশি ব্যবসায়িরা তাদের ব্যক্তিগত লাভটাকেই বড় করে দেখতে চান, দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবাটা ওনাদের কাছে হয়ত অপ্রয়োজনীয়। আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়াই না। ওনাকে সেÏট্রালের খুব প্রমিনেÏট একটা লোকেশনের বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্টে যাবার সহজ ওয়ে বুঝিয়ে দেই।

 

ভদ্রলোক কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, -‘আজ আপনি একজন প্রকৃত বন্ধুর মত আমার উপকার করলেন। থ্যাঙ্কস্‌ আ লট!’

 

-এত সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য এমন ঝাঁপি ভরা ধন্যবাদ দেবেন না প্লিজ্‌। আমি না হয়ে অন্য যে কোন বাংলাদেশিকে জিগ্যেস করলে তারাও আপনাকে এই সাহায্যটুকু করত।

 

-হয়ত করত। তবে আপনার মত করে এতদিন আমার বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে না পাবার কারণ বুঝিয়ে বলত না। সেক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে না পাবার সমস্যায় বারবার পরতাম। কিন্তু আপনার কল্যানে এখন তো আমার আর সেই ভয় রইল না। আমি এখন ইÏটার্নেটে ‘‘ইন্ডিয়ান রেষ্ট্রুরেÏট’’ সার্চ করলেই এক ডজন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট পেয়ে যাব, তাইনা?

 

-তা ঠিক!

 

-‘আচ্ছা দেখুন আমি কতটা অভদ্র, শুরু থেকে শুধু নিজের সমস্যা নিয়েই কথা বলে যাচ্ছি, আপনার সম্পর্কে কিছুই শোনা হল না!’ ভদ্রলোক অপরাধী ভঙ্গিতে বলেন।

 

-এটা খুব স্বাভাবিক! আমরা তো প্ল্যান করে গল্প করতে বসিনি যে একে অন্যের পরিচয় জেনে তবেই কথা বলব। আপনি একটা সমস্যায় পরেই না আমাকে দেশি মানুষ পেয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। আপনার কাছে তখন আমার বাংলাদেশি পরিচয়টাই একমাত্র জরুরী ছিল, আর আপনি সেটা শুরুতেই জেনে নিয়েছেন। কাজেই আমার সম্পর্কে আপনি একেবারে যে কিছুই জানেন না তা তো নয়! বরং আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়টাই আপনি জানেন, জানেন আমি একজন বাংলাদেশি! এর বাইরে ব্যক্তি আমি এমন বিশাল কিছু নই যা না শুনলেই নয়।

 

-‘আপনি এমন গুছিয়ে কথা বলেন যে তার কোন ফাঁক থাকে না, যেখান দিয়ে ঢুকে পরা যায়।’ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলেন। পরক্ষনেই আবার বলেন, -‘অন্তত নামটা তো জানাই উচিত, নয় কি?’

 

-‘হ্যা! সেটা আপনি এখনও জানতে পারেন। আমি অপরাজিতা। এই দেশে পাঁচ বছরেরও বেশি হল আছি। একটা ছোটখাট চাকরী করি। এই তো আমার সম্পর্কে বলার মত এটুকুই আছে আমার! কথাগুলো বলে আমি এবার আমার খাবারের ট্রে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমার খাওয়া শেষ। এবার উঠতে হবে। কফি খাব ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন আর খেতে ইচ্ছে করছে না। ঘরে ফিরেই খাব।

 

ভদ্রলোক বোধহয় বুঝতে পারলেন আমি এবার যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনিও উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, -‘আমি বোধহয় আপনার অনেক দেরী করিয়ে দিয়েছি। এনিওয়ে আপনার সময় এবং সাহায্যের জন্য আবারও অনেক ধন্যবাদ।’ কথাগুলো বলে ভদ্রলোক একটু থামেন কিছু যেন বলতে চান, কিন্তু বলবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। তারপর একটু যেন ইতস্ততঃ করে বলেন, -‘আপনার কÏটাক্ট নাম্বার চাওয়াটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা! আসলে এখনও তো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে, আবার কখনও কোন প্রয়োজনে আপনার পরামর্শ নেয়া যেত।’ ভদ্রলোক আবারও খানিক থামেন। কিন্তু মূহুর্তকাল মাত্র। আবারও বলেন, -‘না থাক! একটু আলাপেই কোন মহিলার কÏটাক্ট নাম্বার চাওয়া মোটেও শোভন কাজ নয়। আর আপনার জন্যও সদ্যচেনা কাউকে কÏটাক্ট নাম্বার দিয়ে দেয়াটাও বিবেচকের কাজ হবে না নিশ্চয়ই। আপনি বরং আমার নাম্বারটা রাখুন। ইচ্ছে হলে কল করবেন, ইচ্ছে না হলে করবেন না। তবে করলে খুশি হব। আর আপনার আজকের উপকারটুকু মনে থাকবে আমার।’

 

আমি তখনও বসেই ছিলাম। নিজের সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ওনার কথাগুলো শুনছিলাম। উনি যা বলেছেন খুব সত্যি কথা। তবে এতকিছুর পরেও মানুষ কখনও কখনও মানুষকে ক্ষণিক দেখেও খানিকটা হলেও বোঝে। অন্তত এই লোক যে কোন খারাপ মানুষ নয় সেটুকু বলা যায়। তাছাড়া কাউকে নিজের মোবাইল নাম্বার দিলে আমি অকুল পাথারে পরে যাব, এমনটাও ভাবিনা আমি। মোবাইল নাম্বার নিজের জন্মপরিচয় তো নয় যে চাইলেও পালটে ফেলা যাবে না। আমি আমার ব্যাগ থেকে কাগজ, কলম বের করতে গিয়ে নাম্বারটা লিখে দেয়ার মত কোন কাগজ খুঁজে পাইনা বলে একটা টিস্যু পেপারেই আমার মোবাইল নাম্বারটা লিখে ওনার দিকে বারিয়ে দেই। ওনাকে বেশ আনন্দিত দেখায়।

 

-‘বাহ্‌! দিয়ে দিলেন? ভয় হল না? বাঙ্গালী মেয়েদের তো নিজের কÏটাক্ট নাম্বার দিতে নার্ভাস লাগে বলে শুনেছি।’ ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন।

 

-‘আপনাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে আমার। আর ভদ্রলোকের সাথে মানুষ ভদ্রতাই করে। আমিও করলাম।’ আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলি।

 

-আপনার ভদ্রতার জয় হোক!

 

শপিংমল থেকে বেরিয়ে এসে আমি আমার বাসার পথ ধরার আগে বললাম, -‘আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। ভাল থাকবেন।’

 

-আপনি বুঝি কাছেই থাকেন? আমিও এখানে একটা রেষ্টহাউসে উঠেছি। কখনও হয়ত আবারও এখানে দেখা হয়ে যেতে পারে আমাদের। তবে দেখা হোক বা না হোক যাবার আগে একবার হলেও ফোনে নিশ্চয়ই কথা হবে। আপনিও ভাল থাকবেন।

 

আমরা যে যার পথ ধরি।

 

 

 

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে বিকেলে আবারও ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি যেন ঘোড়দৌড়ের মধ্যে থাকি। তাই এই সময়টুকুতে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার তেমন কোন অবকাশ হয়না আমার। তবে আজ যখন লাঞ্চব্রেকে লাঞ্চ নিয়ে বসেছিলাম। তখন হঠাৎ করেই ভদ্রলোকের কথা মনে পরে গেল। কি যেন নাম বলেছিলেন! খুব খটমট একটা নাম! আজির না কি যেন? নাহ্‌, কিছুতেই মনে এল না। আসলে এই সময়ে ওনার কথা মনে পরার একটাই কারণ, আমি ভাবছি, ভদ্রলোক কি আজকের লাঞ্চে ভাত খেতে পারছেন? ভাতের জন্য অনেক বাঙ্গালীই অস্থির হয় শুনেছি, কিন্তু নিজের চোখে এই প্রথম দেখলাম। আচ্ছা আমি কেন ভাতের জন্য এমন অস্থির হইনা? আমি কি তবে খাঁটী বাঙ্গালী নই? ধুর্‌, কি যে সব ভাবছি! শুধু ভাতের জন্য পাগল হলেই বুঝি বাঙ্গালী হওয়া হয়! তাহলে বাংলাদেশ ছাড়াও যে দেশগুলোতে ‘‘ভাত’’ ই প্রধান খাদ্য তারাও তাহলে বাঙ্গালী হয়ে যেত। আমি নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দেই।

 

 

 

 

কাজ শেষে আজ আর আমি শপিংমলে ঢুকিনা। আজ আমার কোন কেনাকাটা নেই। ষ্টেশন থেকে সোজা বাসায় চলে আসি। তারপর রান্না, খাওয়া সেরে সবে এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে বসেছি অমনি মোবাইল বেজে উঠল। হাতে নিয়ে অপরিচিত নাম্বার দেখে কে হতে পারে ভাবতে ভাবতেই রিসিভ করি।

 

-‘ওহ্‌! আপনি রিসিভ করলেন তাহলে?’ ওপ্রান্েত সেই ভদ্রলোক।

 

-‘আমি রিসিভ করব না এমনটা মনে হল কেন আপনার? রিসিভই যদি না করার প্ল্যানই থাকত আমার তবে আপনাকে আমি নিজের নাম্বারটা দিলাম কেন?’ ওনার কথায় আমি খানিক অবাক হই।

 

-আপনাকে ফোন করতে পারব কিনা জানতে চেয়ে প্রায় ঘÏটা খানেক আগে এস এম এস করেছিলাম আমি। কিন্তু এতটা সময় অপেক্ষা করেও আপনার কাছে থেকে কোন রিপ্লাই না পেয়ে ভয়ে ভয়ে এখন কল করেছিলাম। ভাবছিলাম আপনি রিসিভ করবেন কি করবেন না!

 

-আপনি এস এম এস করেছেন? সরি! আমি নোটিশ করিনি। আসলে কাজ থেকে ফিরে এসময়টুকু আমি খুব ব্যস্ত থাকি, তাই মোবাইলের দিকে আর মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়না। যাইহোক, কেমন আছেন?

 

-আরে সেটা বলতেই তো আপনাকে ফোন করা।

 

-‘মানে?’ আমি বেশ অবাক হই!

 

-বলছি, আজ সারাদিনের কাজ সেরে আমি ভাবলাম আপনার দেয়া ঠিকানা মিলিয়ে সেই রেষ্ট্রুরেÏেট গিয়ে মন ভরে ভাত খেয়ে আসি। গেলামও। কিন্তু গিয়ে যা খেলাম তাতে পেটটাই ভরল শুধু, মন একটুও ভরল না।

 

-কেন বলুন তো? খাবারের টেষ্ট বুঝি ভাল লাগেনি?

 

-না তা নয়। যা খেয়েছি সেগুলোর টেষ্ট বা গুনাগুন ব্যাখ্যায় যাব না আমি। আমি কেবল এটুকুই বলব, যা খেয়েছি তা মোটেও কোন বাঙ্গালী খাবার নয়। আর যে ভাত খেয়েছি সেটাও ভাত না।’

 

-‘মানে? ভাত না হলে সেটা কি?’ আমি ওনার কথার কিছুই বুঝিনা।

 

-‘সেটা রাইস।’ উনি বেশ গম্ভীর ভাবে বলেন।

 

ওনার কথায় আমার এমন ভাবে হাসি এসে গেল যে শত চেষ্টাতেও আমি সেটা গোপন করতে পারলাম না। আমি হাসতে হাসতেই বললাম, -‘রাইস আর ভাতে পার্থক্য কি?’ রাইস কি ভাত না?’

 

-‘পার্থক্য নেই মানে? কি বলছেন আপনি? রাইস শব্দের বাংলা করলে ভাত হয়, এটা সত্যি। কিন্তু আপনাদের এখানকার রাইসের সম্ভবত কোন বাংলা নেই। এখানে রাইস রাইসই থেকে গেছে, বাঙ্গালী ভাত হয়নি। রেষ্ট্রুরেÏেট যা খাওয়ানো হচ্ছে সেটা খেয়ে আমার কাছে মোটেও মনে হয়নি আমাদের ভাত খাচ্ছি। তাছাড়া ছুরি, চাকু দিয়ে খেলে সেটা ভাত হয় নাকি!’ ভদ্রলোক ভীষন সিরিয়াসলী বলেন।

 

আচ্ছা এক ভাতপাগলের পাল্লায় পরা গেছে যাহোক! কিন্তু কি আর করা, কিছু তো বলতেই হয়, কিন্তু কি বলব সেটাই ভাবছিলাম, এর মধ্যে উনিই আবার কথা বলে ওঠেন।

 

-তাছাড়া অন্যান্য যা খেলাম সেসবও ইউরোপীয় কায়দায় রান্না, যা খেয়ে আমার মত ভেতোবাঙ্গালীর মন ভরার প্রশ্নই ওঠে না।

 

-‘আসলে ব্যাপারটা কি জানেন, এখানে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏটগুলো ইউরোপীয়দের জন্যই, তাই তারা যেভাবে খেতে পছন্দ করবে সেটা মাথায় রেখেই সবকিছু রাধার ষ্টাইল নির্ধারিত হয়। আমরা যারা বাঙ্গালী তারা কে আর আমাদের দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট খেতে যাই বলুন? আমরা কখনও রেষ্ট্রুরেÏেট খেতে চাইলে মুখ বদলাতে অন্য দেশের খাবারই খেতে চাইব নিশ্চয়ই। যেমনটা ইউরোপীয়রা মুখ বদলাতেই এশিয়ান খাবার খায়।’ আমি ওনাকে বোঝাবার চেষ্টা করি।

 

-হ্যা! আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে আমার এত রিয়্যাক্ট না করে এভাবে ভেবে দেখা উচিত ছিল।

 

-‘আপনি আর কিভাবে ভেবে দেখবেন বলুন, আপনার তো ভাত খেতে গিয়ে রাইস খেয়ে মেজাজ সপ্তমে উঠে গেছে!’ আমি একটু ফান করি।

 

-এই তো আরেকটা সুযোগ পেয়ে সেটাও আর হাত ছাড়া করলেন না! আপনার সাথে দেখছি পলিটিশিয়ানদের মত করে কথা বলতে হবে।

 

-কেন? পলিটিশিয়ানদের মত কেন?

 

-ওনারা খুব হিসেব করে কথা বলেন কিনা, যেন বিপক্ষ তাদের কথার কোন ফাঁক গলে তাদেরকে কুপোকাত করতে না পারে।

 

কিন্তু এত হিসেব করেও কি কোন লাভ করতে পারেন তাঁরা? বিপক্ষ তো তারপরেও তাঁদের সারাক্ষনই ছাই হাতে ধরছে। আসলে ধরা যাদের স্বভাব তারা প্রতিপক্ষ সুযোগ দিলেও ধরবে, না দিলেও ধরবে।

 

-হুম্‌, ঠিকই বলেছেন! তবে আপনার আবার ওরকম স্বভাব নয় তো?

 

আমি হেসে ফেলি। বলি, -‘না, নির্ভয়ে থাকুন। সুযোগবিহীন ধরাতে কোন আনন্দ পাই না আমি। তাছাড়া পলিটিক্স এবং পলিটিশিয়ান, এ দুটো থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেই পছন্দ করি আমি।’

 

-জেনে আশ্বস্ত হলাম।

 

এরপরে দুজনেই কিছুক্ষন চুপ করে থাকি। আজ আসলে আমি বেশ ক্লান্ত বোধ করছি। কালরাতে একটু দেরী করেই ঘুম এসেছিল। আজ ভেবেছিলাম একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পরব। সেজন্য কাজ থেকে ফিরেই ঘরের কাজগুলোও দ্রুত সেরে ফেলেছি। কিন্তু এখন হঠাৎ করে ফোনটা রাখি কি করে বুঝে পাচ্ছিনা। এভাবে চুপ করে থাকাটাও দৃষ্টকটু। আমি কিছু একটা বলতে হয় বলেই বললাম,

 

-আপনি হঠাৎ এস এম এস করে ফোন করার পারমিশন নেবার কথা ভাবলেন কেন?

 

-আপনি জব নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, ঘরে ফিরেও হয়ত কাজ থাকে। তাই আমি চাইনি হঠাৎ করে ফোন দিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে। সেজন্যই এস এম এস করেছিলাম।

 

-কাজ তো সারাক্ষনই থাকে। এই যে আজকের মত এখন শেষ করেছি কিন্তু সকালে উঠেই আবার কাজ।

 

-সকালে আর কি এমন কাজ থাকে। কাজ তো আপনার সন্ধ্যার পরে।

 

আমি প্রথমটায় ওনার কথা বুঝিনা। কিন্তু সে মুহূর্তকাল মাত্র। ব্যাপারটা আমি বুঝে যাই। বুঝেই বলি, -‘আপনি আসলে বোঝেননি। কাজ বলতে আমি আমার জবের কথা বলেছি। আসলে এখানে সবাই যে যার জবকেই কাজ বলে। এখানে ‘কাজে যাচ্ছি’ বা ‘কাজ আছে’ বলে, আমাদের দেশের মত ‘অফিসে যাচ্ছি’ বা ‘অফিস আছে’ বলে না।

 

-তাই নাকি?

 

-হ্যা!

 

-আসলে উন্নত দেশে কোন কাজকেই ছোট করে দেখা হয়না বলেই হয়ত এভাবে এক কথায় ‘কাজ’ দিয়ে যেকোন জবকে বোঝানো হয়।

 

আমি বলি, -‘তাই হবে হয়ত!’

 

ভদ্রলোক এবার সহাস্যে বলেন, -‘আপনার তো সকালেই কাজে যেতে হবে!’

 

-‘হ্যা!’ আমিও হেসে বলি।

 

-তাহলে আর কি, ঘুমিয়ে পরুন। আমি আর বিরক্তের কারণ হইনা।

 

আমি হাসতে হাসতে বলি, -‘সকালে কিন্তু আপনারও কাজ আছে।’

 

-আরে তাইতো, আমারও তো কাজে যেতে হবে!

 

দুজনেই হেসে উঠি।

 

আমরা দুজন কাজের মানুষ আর বেশিক্ষন কথা বলি না। একে অন্যকে বিদায় জানাই।

 

 

 

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই কেন যেন বাবার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করল। কিন্তু আজ তো সবে বুধবার। আমি সাধারণত ছুটীর দু’দিন দেশে ফোন করি। আসলে আমার জন্য ওয়ার্কিং ডেগুলোতে দেশে ফোন করা বেশ কঠিন। আমার ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে কাজ থেকে ফিরে আসা অর্থাৎ বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত আমারই সুযোগ হয়না ফোন করার মত, এতই ব্যস্ত থাকি এই সময়টুকু। আর ওদিকে আমি যখন ফ্রী হই তখন দেশে অনেক রাত। কিন্তু আজ যে আমার বাবার সাথে ভীষন কথা বলতে ইচ্ছে করছে! কি করি? দেশে ফোন করার কার্ডটা সাথে নিয়ে নিলাম আমি, লাঞ্চব্রেকে খেতে খেতেই বাবার সাথে একটু কথা বলব।

 

আমার বাবা, ভীষন সিম্পল মাইন্ডেড একজন মানুষ। যিনি অকাতরে সবাইকে বিশ্বাস করেন, ভালবাসেন। যাঁর তেমন কোন বিষয়জ্ঞান নেই। জীবনকে খুব সাধারণভাবে দেখাটাই যাঁর অভ্যেস। আর সে কারণেই মা হয়ত একটু বেশিই হিসেবি, একটু বেশিই সচেতন আর সাবধানী। মোটকথা দু’জন সম্পূর্ণ দুই মেরুর বাসিন্দা যেন। কিন্তু তবুও ওনাদের মধ্যে কখনও কোন অশান্িত হতে দেখিনি আমরা। সেটা অবশ্য বাবার কারণেই। যে কোন ঝামেলা এড়িয়ে জীবন কাটানোই যেন বাবার জীবনের একমাত্র ব্রত। বাবার এই ধরনের মানষিকতার জন্যই ওনাকে আমি অসম্ভব ভালবাসি। মাকেও ভালবাসি, তবে বাবাকে মনে হয় একটু হলেও মায়ের চেয়ে বেশি ভালবাসি। মায়ের সবকিছু নিয়ে বেশি বেশি ভাবা আমাকে মাঝে মাঝে বিরক্তি দেয়। এই যেমন এখন আমার বিয়ে দেয়াটাই যেন ওনার একমাত্র ধ্যান জ্ঞ্যান হয়েছে, যা আমার একটুও ভাল লাগে না। এক জীবন নিয়ে আর কতবার জুয়া খেলা যায়!

 

আমি প্রায় রোজই লাঞ্চের জন্য খাবার নিয়ে আসি। যদিও আমাদের এখানে খাবার কিনে খাবার মত ব্যবস্থা আছে। এটা একটা বহুতল ভবন, যার বিভিন্ন ফেçার মিলিয়ে অনেকগুলো অফিস। আর সব অফিসের সমস্ত ষ্টাফের জন্য নীচতলার এই একমাত্র ক্যাফেটেরিয়া। নামে ক্যাফেটেরিয়া হলেও এখানে যেমন নানার রকমের ø্যাক্স, স্যান্ডুইচ, কেক, কোমল পানীয় থেকে শুরু করে নানাবিধ প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া যায়, তেমনই রেষ্ট্রুরেÏেটর মত লাঞ্চের ব্যবস্থাও আছে। এমনকি চাইলে বুফেও খাওয়া যায় লাঞ্চে। আমার এসব খাবারে কোন সমস্যা নেই। ভাল লাগা নিয়েই খেতে পারি। কিন্তু তবুও আমি সঙ্গে করে খাবার আনি। এর একটাই কারণ, আমি একটু হলেও আমার সময় বাঁচাতে চাই। লাঞ্চ টাইমে সবারই লাঞ্চ করার তাড়া থাকে, তাই ভীড়ও প্রচুর থাকে। খাবার অর্ডার করে সেটা ডেলিভেরী পেতে পেতে দশ থেকে পনেরো মিনিটও চলে যায় কখনও কখনও। বাকী যেটুকু সময় থাকে তাতে শুধু খাওয়াটাই হয়, রিল্যাক্স হয়না। তাই সাথে করে খাবার আনাটাই আমার কাছে বেষ্ট মনে হয়। লাঞ্চব্রেকে আমি আমার সাথে করে নিয়ে আসা খাবারটুকু ক্যাফেটেরিয়ার মাইক্রো ওভেনে গরম করে কফি মেশিন থেকে এক মগ কফি নিয়ে একদম নিরিবিলি একটা কর্নারে গিয়ে বসি। পাশের দেয়ালটা পুরোটাই কাঁচের। ওপাশে একটা পার্কের মত। মানুষজন যাচ্ছে, আসছে। চাইলে কেউ কেউ ঐ পার্কে বসে একটু জিড়িয়ে নিচ্ছে। আমি নানান দেশের, নানান জাতের, নানান বর্ণের সেইসব মানুষদের দেখতে দেখতে আরাম করে নিজের আনা খাবারটুকু খাই, তারপরে ততধিক আরাম করে গরম কফিতে চুমুক দেই। আমি আমার লাঞ্চব্রেকের সময়টুকুকে নিজের মত করে একা একা এন্‌জয় করি। আজ কফি নিয়ে এসে বসেই প্রথমে দেশে ফোন করলাম। ওদিকে রিং হতে হতে আমি খাবারের বক্স খুলে খাবার জন্য সব গুছিয়ে নেই। কি ব্যাপার কেউ রিসিভ করছে না কেন! বাসায় কি কেউ নেই নাকি? একসাথে সবাই গেল কোথায়? লাইনটা যখন প্রায় কেটে যাবে ঠিক তখন রিসিভড্‌ হল।

 

-হ্যালো! কে? মা?

 

-‘আপু? কি ব্যাপার তুমি আজ হঠাৎ এসময়ে? আজ তো শনি, রবিবার না!’ আমার ছোট ভাই রণ এক সাথে অনেকগূলো প্রশ্ন করে।

 

-‘কেনরে, শনি রবিবার ছাড়া আমার কি ফোন করা নিষেধ?’ আমি আমার ভীষন আদরের ভাইটার সাথে দুষ্টুমি করি।

 

-নিশ্চয়ই নিষেধ না। কিন্তু তুমি তো অন্যদিনগুলোতে নরমালী কর না, তাই একটু অবাক হয়েছি। ভাল আছ আপু?

 

-হ্যারে বাবা আমি ভাল আছি। বাবার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে বলে লাঞ্চব্রেকে ফোন দিলাম। শোন্‌, আমার পক্ষে তো এখন খুব বেশিক্ষন কথা বলা সম্ভব না, তোর সাথে শনিবারে আবার কথা বলব, ওকে ভাইয়া? তুই এখন তাড়াতাড়ি একটু বাবাকে দে।

 

ওপ্রান্েত ফোন হাতবদল হল। আমি এপ্রান্ত থেকে সেটা বুঝতে পেরে বললাম, -‘বাবা?’

 

-‘না বাবা না, আমি, মা।’ ওপ্রান্েত মায়ের গলা। -‘শোন তুই ফোন করে ভাল করেছিস, তোর সাথে জরুরী কথা আছে।’

 

মা তার জরুরী কথা শুরু করার আগেই আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, -‘মা এখন আমি কাজে। এখন তোমার জরুরী কথা কিভাবে শুনব আমি?’

 

-তাহলে এখন ফোন করেছিস কেন?

 

-বাবার সাথে সকাল থেকেই খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল বলে লাঞ্চব্রেকের সামান্য এই সময়টুকুর মধ্যেই খেতে খেতে ফোন করেছি।

 

-ওহ্‌! তাহলে আজ বাসায় গিয়ে আবার ফোন করিস।

 

-আজই করতে হবে?

 

-হ্যা! আজই করবি। বললাম না জরুরী কথা!

 

-ঠিক আছে এখন তুমি বাবাকে দাও।

 

মুহূর্তকালের বিরতি।

 

-‘কিরে অপু, তুই আজ এসময়ে যে? ভাল আছিস তো মা? শরীর ভাল তো?’ আমি অসময়ে ফোন করাতে বাবা যে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়েছেন সেটা ওনার কথাতেই বোঝা যায়।

 

-হ্যা বাবা আমি ভাল আছি। শরীরও ভাল। আজ ঘুম থেকে উঠেই তোমার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল, তাই লাঞ্চব্রেকে ফোন করলাম। তুমি ভাল আছ তো বাবা?

 

-‘আমি ভাল আছি। শোন্‌, আজ ক’দিন ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। সামনেই তো কোরবানি ঈদ, তুই এবার দেশে ঈদ কর না মা! খুব ইচ্ছে করছে এবারের ঈদটা তোকে নিয়ে করি। পারবি নারে মা আসতে?’ বাবার গলায় যেন øেহ, ভালোবাসা, আদর উপ্‌চে পরে!

 

বাবার কথার আদরের ছোঁয়ায় আমার দু’চোখ ভিজে ওঠে। আমি তাড়াতাড়ি চারপাশে একবার দেখি। আমাকে কেউ দেখলে নিশ্চয়ই সেটা খুব ফানি দেখাবে অন্যের চোখে। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ হই। বাবাকে বলি, -‘ঈদ তো সামনের মাসেই বাবা, এত অল্প সময়ে কি যাবার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে! টিকেট কত আগে থেকে বুকিং দিয়ে তবেই টিকিট পাই আমরা। কাজেও ছুটীর ব্যাপার আছে।’

 

-‘দেখ নারে মা চেষ্টা করে, পারিস কিনা আসতে। তাছাড়া একটা মোটে টিকেট তোর যে কোন সময়েই হয়ে যেতে পারে। তুই শুধু ছুটীর ব্যবস্থাটা কর।’ বাবা অবুঝ শিশুর মত করে বলেন।

 

আমার বাবার ইচ্ছে হয়েছে আমার সাথে এবারের ঈদটা করবেন, আমি এখন যদি বাবার এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে না পারি তবে আমারই যে বেশি কষ্ট হবে। কিন্তু এটাও জানি একটা টিকেটের ব্যবস্থা করা গেলেও এত অল্প সময়ে কোনভাবেই আমার পক্ষে ছুটী পাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু বাবাকে সেকথা কিভাবে বলি! আমি খুব চেষ্টা করব বলে  বাবাকে আপাতত শান্ত করি। এরপরে আমরা আরও কিছুক্ষন কথা বলি ঠিকই, কিন্তু আমার মাথার মধ্যে তখন কেবল বাবার একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘‘তুই এবার দেশে ঈদ কর না মা! খুব ইচ্ছে করছে এবারের ঈদটা তোকে নিয়ে করি। পারবি নারে মা আসতে?’’ বাবা হঠাৎ এভাবে কেন বললেন! আমার কেমন ভয় ভয় লাগে।

 

সারাদিন কাজের মধ্যে ঘুরেফিরেই বাবার কথাটা মনে হতে থাকে আমার। আজ আর সম্ভব না, দেখি আগামীকাল কাজে এসে সকালেই একবার নাহয় ছুটীর কথা বলে দেখব। জানি ফলাফল পজিটিভ হবার কোনই চানস্‌ নেই, তবুও ট্রাই করে দেখতে তো সমস্যা নেই।

 

 

 

 

কাজ থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়। প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। দিন এখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ঘরে ফিরে চেঞ্জ করা, ফ্রেশ হওয়া, একটু কিছু খাওয়া ইত্যাদি খুব জরুরী কাজটুকু সেরে বাড়ীতে ফোন করলাম। দেখি আমাকে বলার জন্য মায়ের কি এমন জরুরী কথা আছে! ফোনটা মা’ই রিসিভ করল।

 

-হ্যা! বলো, কি এমন জরুরী কথা তোমার।

 

-শোন, তোর জন্য তিতলির মা একটা সম্মন্ধ এনেছে।

 

-এই তিতলির মা’টা আবার কে?

 

-আরে তুই যেন চিনিস না! আমাদের পাশেরবাড়ীর উকিল সাহেবের স্ত্রী।

 

-‘মা, দশ বছর আগে আমাকে দেশ থেকে বিদায় করেছ, এসব তিতলির মা, বাবলির মাকে আমি কিভাবে চিনব?’ আমি বিরক্ত হয়ে বলি।

 

-আচ্ছা কাউকে তোর চিনতে হবে না, তুই আমার কথা শোন। তিতলির মা তার খালাতো বোনের ভাসুরের ছেলের সাথে তোর বিয়ের সম্মন্ধ নিয়ে এসেছে। ছেলেটা বি সি এস দিয়ে সরকারী চাকরী করছে। কিন্তু ছেলেটা জানিয়েছে তোর সাথে বিয়ে হলে সে তার চাকরী ছেড়ে দিয়ে তোর ওখানে চলে যাবে।

 

-‘মা, একটা ছেলে আমাকে বিয়ে করে ইউরোপে আসার জন্য তার সরকারী চাকরী পর্যন্ত ছেড়ে দেবার কথা ভাবতে পারে, আর তুমি ওরকম একটা লোভী ছেলের সাথে কিনা আমার বিয়ের কথা বলছ?’ আমার অসম্ভব মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।

 

-‘এর মধ্যে লোভের কি দেখলি তুই!’ মা অবাক হয়ে বলে।

 

-লোভ না তো কি? আমাদের দেশে বি সি এস দিয়ে একটা সরকারী চাকরী পাওয়াকে এখনও যে সম্মানের চোখে দেখা হয়, সৌভাগ্য মনে করা হয়, বিদেশে আসার জন্য সেই চাকরী ছেড়ে দিতেও যে লোকের একটুও দ্বিধা নেই সে লোভী নয় তো কি?

 

-কিসের সম্মান, কিসের সৌভাগ্য? আগের মত সরকারী চাকরী নিয়ে এখন আর মানুষের ঐ সেÏিটমেÏট নেই। সরকারী চাকরীর বেতনে সংসার চলে নাকি?

 

-তাহলে তো বোঝাই যাচ্ছে তোমার সেই সরকারী চাকুরে আমাকে বিয়ে করে ইউরোপে এসে বড়লোক হতে চায়। আর শুধুমাত্র এজন্যই সে আমাকে বিয়ে করতে চাইছে।

 

-তুই এত বেশি বুঝিস কেন? তাছাড়া সে যদি ইউরোপে যেতেই চায় তাতেই বা তার অপরাধ কোথায়? যে কেউই জীবনের নিরাপত্তা চায়। যেখানে জীবনের জন্য সুযোগ সুবিধা বেশি সেখানে মানুষ যেতে চাইবে না?

 

-ওহ! ঠিক আছে মা, তোমার মেয়ে তো তাহলে নিরাপদ দেশে ভীষন নিরাপত্তায় মহাসুরক্ষিতই আছে। তবে আর তার জন্য একটা বডিগার্ডের ব্যবস্থা করতে তুমি এত উঠে পরে লেগেছ কেন?

 

-অপু, এসব কি কথার ছিড়ি!

 

মায়ের কথা শুনে এবার সত্যি প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হয়ে যায় আমার। আমি আর নিজের বিরক্তিটাকে গোপন করতে পারিনা।

 

-আচ্ছা মা, আমার জন্য কি দেশে তুমি এমন একটা ছেলেকেও খুঁজে পাও না যে আমাকে বিয়ে করে আমার স্বামী হিসেবে আমার এখানে না এসে আমাকেই তার স্ত্রী হিসেবে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?

 

-তাহলে কি এমন তফাৎটা হত? তাহলেই কি সে তোর সত্যিকারের স্বামী হত, আর তোর ওখানে গেলে সে তোর স্বামী হবে না?

 

আমি ভীষন অবাক হই মায়ের কথা শুনে! মা এভাবে ভাবে? আমার হঠাৎ নিজের জন্য খুব কষ্ট হয়। আমি একটু ধরা গলাতেই বলি, -‘ওহ! আমার দেশে জীবন কাটানো আর দেশের বাইরে জীবন কাটানোর মধ্যে তোমার কাছে কোনই তফাৎ নেই?’

 

-দেখ্‌ অপু, তোকে তোর অবস্থাটা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে তুই আর অন্য দশটা অবিবাহিত মেয়ে এক না। আমরা যা বলি তোর ভালোর জন্যই বলি।

 

মায়ের কথায় আমার মনে কষ্টের বদলে আবারও রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি দানা বাঁধে।

 

আমি ফুঁসে উঠে বলি, -‘‘আমরা’’ বল না মা, বল ‘‘আমি’’। একমাত্র তুমিই আমাকে নিয়ে এভাবে ভাব। আমার মনে হয় না বাবা বা আমার ভাইবোন আমাকে নিয়ে তোমার মত করে ভাবে। আসলে কি জানো, তুমি আমাকে নিয়ে ভাব না বলেই এভাবে ভাব।

 

-অপু, তুমি কিন্তু দিনদিন বেয়াদবের মত কথা বলা শুরু করেছ!

 

-‘আদবের সাথে কথা বলে, তোমার বাধ্য মেয়ে হয়ে তোমার সব ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে চলে এতগুলো বছর তো অনেক দেখলাম মা, কি এমন প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে আমার জীবনে? আর কত? বয়স তো আমারও কম হল না মা! আমার এখন তেত্রিশ চলছে। আর কতকাল আমি বাধ্য মেয়ের মত যা আমার জন্য অসহনীয় তা মুখ বুজে সয়ে যাব?’ কথাগুলো বলতে বলতে আমার মনের মধ্যে রাগের বদলে আবারও কষ্টবোধ ফিরে আসে। আমার গলা ভারী হয়ে যায়। আমি রুদ্ধ গলাতেই আবার বলি, -‘আমি বাধ্য মেয়ে ছিলাম বলেই আজ দশটা বছর আমি এই কারাভোগ করছি। তোমার ইচ্ছেতেই আজ দশটা বছর ধরে একদম একা দেশের বাইরে আমি। ভেবে দেখো মা, বাবা কিন্তু আমার জন্য এই জীবন চায়নি। বাবা চায়নি তার আদরের মেয়েকে অজানায় ঠেলে দিতে। কিন্তু তুমি, তুমি তোমার জেদ দিয়ে তোমার মেয়ের জন্য এককভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে তখন। আর তখন আমি ছিলাম যেন কেবলই এক বলির পাঠা। একবারও কি ভেবে দেখেছ মা, আমার জীবনকে সো কলড্‌ নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তুমি তখন আমাকে বরং ভয়ংকর এক জীবনেই ঠেলে দিয়েছিলে? দেশে থাকলে, তোমাদের কাছে থাকলে আমি কি খুব খারাপ থাকতাম, অনিরাপদ থাকতাম?’

 

আমার পুরনো ক্ষতের উপরে আজ এতদিন পরে আবারও যেন লবনের ছিটা দেয়া হয়েছে। আমি যন্ত্রণায় কুঁকরে যেতে থাকি। আমার আর মায়ের সাথে কথা বলতে একটুও ইচ্ছে করে না। আমি মাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ‘‘আমি রাখছি’’ বলে ফোনটা রেখে দেই।

 

 

 

কাজ শেষে ট্রেনে করে ফিরছিলাম। হঠাৎ মারিয়া’র সাথে দেখা হয়ে গেল। ও নিজেও বাড়ী ফিরছে। সাথে শুধু ছোট ছেলেটা। মারিয়াকে বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে! আমিই ওকে আগে দেখলাম। আমার সামনের দিকে কিছুটা দূরেই বসেছে। কিন্তু আমাদের দুজনের সিট কোনাকুনি বলে ওকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই সময়ে ট্রেনে খুব ভীড় হয়, কাজ থেকে প্রায় সবারই ফেরার সময় বলে। কিন্তু এখনও ট্রেনটা সেভাবে ভরে ওঠেনি। কারণ এদিক থেকে খুব বেশি মানুষ ওঠেনা। সামনের ষ্টপেজগুলো থেকে প্রচুর উঠবে। তখন আর তিল ধারণেরও জায়গা থাকবে না। হঠাৎ মারিয়ার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। ও হাতের ইশারায় আমাকে ওর ওখানে যেতে বলছে। ওর সামনেই একটা সিট এখনও ফাঁকাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ট্রেনটা থামলেই আরও মানুষ উঠবে তখন আর ফাঁকা থাকবে না। আমি আর দেরী না করে ট্রেন থামার আগেই ওর সামনে পৌঁছে গেলাম।

 

-‘হাই! কি খবর তোমার বলতো, অনেকদিন তোমার দেখা নেই যে?’ আমি বসতে বসতে বলি। বসে ওর বাচ্চাটাকে আদর করি।

 

-‘দেখবে কি করে, আমি এখানে ছিলাম নাকি এতদিন!’ মারিয়া’র বলার ঢঙ্গে স্পষ্ট বিরক্তি।

 

-ছিলে না? কোথায় গিয়েছিলে? সামার ভ্যাকেশন তো সেই কবেই শেষ, এখন তো কোন ছুটী নেই?

 

মারিয়া রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলল, -‘আমি কি স্বাধ করে কোন ছুটী কাটাতে গিয়েছিলাম নাকি? বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল।’ মারিয়া একটু থেমে আবার বলে, -‘আর বোলনা, ছেলেদের নিয়ে কয়েক সপ্তাহ একটা কাউন্‌সিলিং সেÏটারে থেকে আসতে হল আমাকে।’

 

-‘তাই নাকি! কিন্তু কেন?’ আমি প্রচন্ড অবাক হই!

 

-‘তুমি তো জানো আমার চারটা ছেলের বাবা আলাদা, আলাদা কালচারের। ওরা যখন একদম ছোট ছিল, তখন কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন একটু বড় হয়ে আমার লাইফটাকে হেল্‌ বানিয়ে রেখেছে এরা। যত বড় হচ্ছে ততই ওদের মধ্যে ওদের নিজেদের বাবাদের স্বভাব, কালচার, প্রকট হচ্ছে। ফলে কারো সাথেই কারো মতের মিল হয়না বললেই চলে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। আমি তো প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজেই ব্যস্ত থাকি। ওদের খুব একটা সময় দিতে পারি না। ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরি তখন এদের কম্‌প্লেইন শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পরি। কতটুকু সময় এরা একসাথে থাকে বল? সেই সকালে উঠে স্কুলে চলে যায়, ফেরে তো সেই বিকেলে। আমি ফেরার আগে খুব বেশি হলে দুই/তিন ঘÏটা ওরা একসাথে থাকে। কিন্তু তাতেই এই অবস্থা! কিছুদিন আগে এরা চারজনে এমন অবস্থা করেছিল যে আমিও সেদিন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। আমিও ওদের সাথে চেঁচামেচি করে ফেলেছিলাম। আর এরই মধ্যে কখন যেন পাশের বাড়ীর বয়স্ক মহিলাটা পুলিশের কাছে ফোন করে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। পুলিশ তো সোজা আমার বাড়ীতে এসে হাজির। আমার তখনকার আবস্থাটা ভাবো একবার তুমি! আমি পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বাচ্চারা চিৎকার চেঁচামেচি করে খেলছিল শুধু, কোন সমস্যা হয়নি আমাদের মধ্যে। পুলিশ বলল, ‘‘না তোমার বাড়ীতে এরকম নাকি প্রায় রোজই হয়। তুমি আসলে বাচ্চাদের টেক্‌ কেয়ার করতে পার না।’’ আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তুমি তো জানো আমাদের সিষ্টেম, ব্যাপারটা তখন আর আমার হাতেই ছিল না। পুলিশ আমাদের বিষয়টা সোশালকে জানাল। সোশাল আমাদের সোজা কাউন্‌সিলিং সেÏটারে পাঠিয়ে দিল।’ মারিয়া এক নিঃশ্বাসে সমস্ত ঘটনাটা বলে।

 

আমি রুদ্ধশ্বাসে মারিয়ার কথাগুলো শুনি। খানিক্ষন চুপ করে থাকি। আসলে বুঝতে পারছিনা আমার এখন কি বলা উচিত। কারণ মারিয়া নিজেই নিজের জীবনের যে প্যাটার্ন দিয়েছে আমি সেটাকে সমর্থন করিনা। তাই তার এখনকার এই পরিস্থিতির জন্য আমি তাকেই দায়ী ভাবি। আমার কাছে মারিয়ার জীবন আর তার জীবনের এইসব ঘটনাগুলো অসম্ভব বলে মনে হয়! কিভাবে একটা মেয়ে চারজন পুরুষের সাথে সন্তান জন্ম দেয়? বাচ্চারা বড় হলে এরকম সমস্যা যে হতে পারে সেটাতো সহজেই অনুমেয়। ভদ্রতা করে কিছু একটা বলতে হয় বলেই এবার বলি আমি, -‘ওখানে গিয়ে কি তোমাদের কোন উপকার হয়েছে? এখন কি বাচ্চাদের মধ্যে সদ্ভাব এসেছে?’

 

-হুম্‌, ওখানে যাওয়াটা কিছুটা হেল্পফুল হয়েছে বলেই তো মনে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ওদের মধ্যে আগের মত এ্যাগ্রেসিভ ভাবটা দেখিনি। তাছাড়া প্রতিবেশীর কম্‌প্লেইন করে দেয়া, বাসায় পুলিশ আসা, এসবের ভয়ও তো ওদের মধ্যে ঢুকেছে এখন।

 

-যাক্‌, ওদের মধ্যে চেঞ্জ আসলে তো খুবই ভাল। তবে তোমাকেও খুব সাবধান হতে হবে। ওদেরকে আরেকটু বেশি সময় দিয়ে ওদের মধ্যে একটা ভাতৃত্ত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। ওরা যে আপন ভাই, পর নয়, এটা বোঝাতে হবে ওদের।

 

-‘আমি তো চেষ্টা করছি। তবে আমারও তো পারসোনাল একটা লাইফ আছে তাইনা? আমারও তো নিজের জন্য আলাদা করে একটু সময় প্রয়োজন।’ মারিয়া নিজের স্বপক্ষে বলে।

 

হঠাৎ আমার ষ্টপেজের নাম এ্যানাউনস্‌ড হতেই আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি। কথায় কথায় কখন যে আজ এতটা পথ চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। আমি মারিয়াকে উইস করে ওর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে নেমে পরি।

 

মারিয়া খাস এদেশি মেয়ে। ওর সাথে আমার এই ট্রেনেই আলাপ। মারিয়া আমার ঠিক দুটো ষ্টপেজ পরে থাকে। ওর আর আমার কাজের টাইম টেবল্‌ প্রায় এক। তাই প্রায় সময়ই কাজে যেতে বা আসতে ট্রেনেই আমাদের দেখা হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ত্বের মত সম্পর্ক হয়ে যাওয়াতে আমাদের দেখা হলে একসাথে বসেই সারাটা পথ গল্প করতে করতে আসি-যাই। তাই লাষ্ট দুই মাস মারিয়াকে না দেখতে পেয়ে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। আজ মারিয়ার বিধ্বস্ত চেহাড়া দেখে ওর জন্য আমার মায়াই লাগছিল। কিন্তু এটাও তো সত্যি এই ইউরোপ, আমেরিকার কালচারে এতো ‘খুললাম খুল্লা’ জীবন কাটানোর জন্যই অনেকের জীবনেই এরকম দূর্গতি নেমে আসে, যা পরে সামাল দিতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। অথচ পঞ্চাশ, ষাট বছর আগেও এই ইউরোপীয়ানরাও অনেকটাই রক্ষনশীল ছিল। দিনে দিনে এখন এই অবস্থা হয়েছে। যদিও এই কালচারের মধ্যেই যারা বুদ্ধিমান তারা জীবনের একটা সময় পর্যন্ত জীবনকে উপভোগ করলেও একটা পর্যায়ে এসে তারা সংযত এবং হিসেবি হয়। মারিয়ার মত সবাই তো নয় যে নির্বোধের মত এরকম ভিন্ন ভিন্ন বাবার ঔরসে চার সন্তান জন্ম দেবে! সত্যি এরকম কথা এর আগে আর কখনও শুনিনি আমি! মারিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে শপিংমলের মেইন গেটের কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। হঠাৎ কেউ কাউকে ‘‘হ্যালো’’ বলে ডেকে উঠতেই আমিও আমার ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলাম। ঠিক তখনই কাছাকাছি থেকে কেউ বলে উঠল, -‘বাব্বাহ্‌! কি এত মনোযোগ দিয়ে ভাবছেন বলুন তো যে আশেপাশের কাউকে খেয়ালই করেন না?’ পাশে ফিরে তাকাতেই দেখি সেই ভদ্রলোক হাসি মুখে দাঁড়িয়ে।

 

-‘ওহ্‌, সরি! আসলেই আমি একটা ভাবনার মধ্যে ঢুবে ছিলাম আজ। আপনাকে দেখতেই পাইনি’ আমি একটু লজ্জা পাই।

 

-আপনি কি প্রায়ই এরকম ভাবনায় ঢুবে পথ চলেন? এটা কিন্তু খুবই রিস্কি!

 

-না না। আজ হঠাৎ একজনের সাথে দেখা হয়ে গেল। সে তার কিছু সমস্যার কথা বলল। তাই তাকে নিয়েই ভাবছিলাম। সবসময় এভাবে ভাবিনা মোটেও।

 

-তাও ভাল! এখন কি বাসায় ফিরছেন, নাকি কিছু কেনাকাটা আছে?

 

-কেনাকাটা আছে। দুধ, রুটি, ফ্রেশ ফলমূল বা সব্জি এসব কিনতে দু’তিনদিন পরপর তো কাজ থেকে ফেরার পথে গ্রোসারীতে যেতেই হয়।

 

-আমি যদি আপনার সাথে যাই তবে কি আপনি কিছু মনে করবেন?

 

-‘না না সেকি? যেতে চাইলে যাবেন।’ আমি ব্যাস্ত ভাবে বলি।

 

-আসলে কি জানেন, আমি তো কাজ শেষে বেশ আর্লী ডিনার সেরে রেষ্টহাউসে ফিরে যাই। কিন্তু রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে আবারও ক্ষিধে পেয়ে যায়। তাই গতকাল রাতেই ভেবে রেখেছিলাম আজ ফেরার পথে কিছু হালকা খাবার কিনে ঘরে রাখব, যেন রাতে ক্ষিধে পেলে খাওয়া যায়। সেজন্যই এখানে এসেছিলাম। আর আসতেই ভাগ্যগুনে আপনাকে পেয়ে গেলাম।

 

-‘বেশ তো, এবার চলুন।’ ওনাকে সঙ্গে আসতে বলে আমিও পা বাড়াই।

 

আমাদের কেনাকাটা শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগল না। ভদ্রলোক বললেন, -‘চলুন একটু কফি খাওয়া যাক্‌। আমার সাথে কফি খেতে আপত্তি নেই তো?’

 

-আপত্তি থাকলে আপনি কি মনোক্ষুন্ন হবেন?

 

-তা তো কিছুটা হবই। মন বলে কথা! তবে রাগ করব না। প্রত্যেকেরই যার যার ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে এবং আমি সেটাকে অনার করি।

 

-‘তাহলে শুনুন, আপনার সাথে কফি খেতে আমার আপত্তি আছে। কিন্তু আমার সাথে আপনি কফি খেলে তাতে আমার আপত্তি নেই।’ আমি বেশ গম্ভীর মুখ করেই কথাটা বলি।

 

ভদ্রলোকও আমার কথার প্রথমটুকু শুনে কিছুটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কথার শেষটুকু শুনে হা হা করে হেসে ওঠেন। তারপর বলেন, -‘নাহ্‌ মানতেই হচ্ছে, আপনার সেন্স অফ হিউমার খুব ভাল!’

 

কফি খেতে খেতে আমি ওনার নামটা আরেকবার শুনতে চাইলাম। বিনয়ের সাথেই জানালাম ওনার নামটা খুবই আনকমন আর কঠিন, সেজন্যই আমার একবার শুনে নামটা মনে নেই। এটাও বললাম, ওনার নাম মনে না থাকার কারণে ওনাকে নিয়ে কিছু ভাবতে গেলেই আমি মনে মনে ‘‘সেই ভদ্রলোকটা’’ বলি, যেটা খুব বাজে ব্যাপার। উনি দেখলাম একটুও অবাক হলেন না আমার কথা শুনে। বরং হেসে হেসে বললেন, -‘সেটাই তো স্বাভাবিক! আমার নিজেরই কি নিজের নামটা সহজে মনে থাকত!’

 

-‘মানে?’ আমি ওনার কথায় অবাক হই!

 

-‘মানে আর কি! ছোটবেলায় আমার নামটা নাকি কিছুতেই আমার মনে থাকত না। মায়ের মুখে শুনেছি।’ ভদ্রলোক নির্লিপ্ত মুখে বলেন।

 

আমি ওনার কথায় হেসে ফেলি।

 

-‘সে তো সবারই ছোটবেলায় নিজের নাম মনে রাখতে কষ্ট হত। আপনি এমন করে বললেন যে মনে হল আপনি বুঝি বড়বেলার কথা বলছেন!’ আমি হাসতে হাসতে বলি। পরক্ষনেই বলি, -‘নামটা কিন্তু বললেন না এখনও?’

 

-‘‘আজওয়াদ আরীজ’’ এটাই এই অধমের নাম।

 

-আপনার নামটা শুনতে বেশ! অর্থ কি?

 

-উত্তম সুগন্ধ!

 

-বাহ্‌! কে রেখেছেন আপনার এই নাম?

 

-আমার মা রেখেছেন এই নামটা। তবে বাবা আমার নিক্‌নেম রেখেছেন। সেটা হয়ত আপনার কাছে অনেক সহজ মনে হবে। আমার পরিবার, পরিজন, আর বন্ধুুদের কাছে আমি ‘‘প্রত্যুষ’’। অনেক ভোরে হয়েছিলাম বলে বাবা আমার এই নাম রাখেন।

 

-হ্যা! বাচ্চার জন্মের সময় এবং তখনকার পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিল রেখেও তাদের নামকরন করা হয়। যেমন যে বাচ্চা রাতে হয় তার নাম হয় ‘‘রাত্রি’’, দিনে হলে ‘‘দিবা’’। আবার রোজার মাসে হলে ‘‘সিয়াম’’ বা ‘‘রোজা’’। বিকেলে হলে ‘‘গোধুলী’’, আবার আপনি ভোরে হয়েছেন বলে ‘‘প্রত্যুষ’’।

 

-‘সেক্ষেত্রে তো আমি বেশ ভাগ্যবান বলতে হবে!’ প্রত্যুষ বেশ গম্ভীর মুখে বলে।

 

আমি অবাক হই! বুঝিনা হঠাৎ একথার কি মানে! আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রত্যুষ নিজেই এবার তার ভাগ্যবান হবার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে। বলে, -‘আমি বৈশাখের এক তান্ডবের রাতে পৃথিবীতে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরেছিলাম। আমার মাকে জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। অথচ মেঘের গর্জন, বিদ্যুৎ চমকানী আর প্রবল ঝড়ে ঐ রাতে ঘর থেকে পথে নামার কথা স্বাভাবিক বুদ্ধিতে কেউ ভাব্বেও না। কিন্তু তবুও সেই বিভিষিকার মধ্যেই বহু ঝামেলা করে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর সেই ভোরেই আমি হয়েছিলাম। এখন তাহলে বলুন আমার নাম তো ‘‘প্রত্যুষ’’ না রেখে ‘‘বিভিষিকা’’ রাখা যেত। কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমি ‘‘বিভিষিকা’’ নামধারী হওয়ার বিভিষিকা থেকে মুক্তি পেয়েছি, তবে কি আমি ভাগ্যবান নই?’

 

প্রত্যুষের কথা শুনে আমি হাসব কি, উনি নিজেই নিজের রসিকতায় হা হা করে হেসে ওঠেন।

 

-‘সেন্স অফ হিউমার আপনারও তো কিছু কম দেখছি না।’ আমি হাসতে হাসতেই বলি।

 

এরপরে কিছুক্ষন কেউ কোন কথা বলি না।

 

প্রত্যুষই প্রথম কথা বলে, -‘আচ্ছা এদেশে রেসিষ্ট নেই? শুনেছি ইউরোপ, আমেরিকায় প্রচুর রেসিষ্ট আছে।’

 

-নিশ্চয়ই আছে। সবদেশেই থাকে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হল আমরা কখনও আমাদের মধ্যে রেসিজম্‌ দেখতে পাইনা। আমরা মনে করি আমাদের জন্যই শুধু রেসিষ্ট, কিন্তু আমরা কখনও রেসিষ্ট নই।

 

প্রত্যুষ আমার কথায় জিজ্ঞ্যাসু চোখে তাকাতেই আমি আবার বলি, -‘এরকম উন্নত দেশে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মত দেশেও যে কখনোই কেউ আশ্রয় প্রার্থনা করে না, তা কিন্তু নয়। আমাদের দেশে যখন বাইরের কেউ আশ্রয়প্রার্থী হয়  তখন তাদেরকে আমাদের সবাই কি সহজে মেনে নিতে পারে? কেউ কেউ কি এর বিরোধিতা করে না? সেইসব আশ্রয়প্রার্থীকে কি ‘‘উরে এসে জুড়ে বসা’’ মনে করে না? একবার রোহিঙ্গাদের কথা মনে করে দেখুন।

 

-‘তা ঠিক।’ প্রত্যুষ এবার সায় দেয়।

 

-কিন্তু তখন কি আমরা নিজেদের ঐ আচরণের জন্য নিজেদের রেসিষ্ট ভাবি?

 

প্রত্যুষ মাথা নাড়িয়ে বলে, -‘না ভাবিনা।’

 

-এজন্যই এসব দেশেও কিছু রেসিষ্ট থাকলে আমি তার জন্য এদের কোন দোষ দেইনা। সত্যি তো নিজের কোনকিছু যখন বাইরের কেউ এসে দখল করে বসে তবে সেটা মেনে নেয়া কারও কারও জন্য কষ্টকর। বিশেষত এসব দেশে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা এতবেশি এবং এসবদেশের বেশিভাগ ক্রাইমও কিন্তু এই ইমিগ্রেন্টরাই করছে। তাহলে এরা রেসিষ্ট হলে এদেরকে কি আর খুব একটা দোষ দেয়া যায়?

 

-‘ইউ আর রাইট।’ প্রত্যুষ আমার সাথে একমত হয়।

 

প্রত্যুষ হঠাৎ প্রশ্ন করে, -‘এই যে এতগুলো বছর ধরে এখানে আছেন, কেমন লাগে আপনার থাকতে?’

 

প্রত্যুষ না জেনেই আমার মনের খুব নরম একটা জায়গায় আঁচড় দিয়ে ফেলেছে। আমি খানিক চুপ করে থাকি। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রত্যুষই আবার জিগ্যেস করে, -‘ভাল লাগে?’

 

এবার আমি বলি, -‘ভাল লাগে কি লাগে না এত বুঝে থাকতে হলে কি আর এই দূরদেশে একা একা থাকা যায়?’

 

-‘আপনি একা থাকেন এখানে?’ প্রত্যুষ খুব অবাক হয়।

 

আমি নিজেও বুঝিনি কথার মাঝে নিজের এই একাকিত্ত্বের কথা বলে ফেলেছি আমি। আসলে সত্যিটাকে এত যত্ন করে আড়াল করে আর কতক্ষন কথা বলা যায়। তাতে কি আর কথা বলায় সাবলিল ভাবটা থাকে! আমি মাথা ঝাকিয়ে বলি, -‘হ্যা! আমি একাই থাকি এখানে। আমার পরিবারের সবাই দেশে।’

 

-‘ওহ্‌! গড! সবাইকে ছেড়ে একদম একা কিভাবে থাকেন আপনি? কষ্ট হয়না? আমি হলে তো দম বন্ধ হয়ে মরেই যাব।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রত্যুষ এমন একটা মুখোভঙ্গি করে যেন এটা ভাবতে গিয়ে এখনই তার দমবন্ধ অনূভুতি হচ্ছে।

 

-আমারও ঠিক এরকম দমবন্ধ অনুভূতিই হয়েছিল প্রথম যখন আসি।

 

-তারপর কিভাবে মানিয়ে নিলেন?

 

আমার এই কষ্টের দিক নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছিল না। কারণ তখনকার আমার মানিয়ে নেয়ার কাহিনী বলতে হলে প্রত্যুষকে আরও পেছনের ঘটনাও বলতে হয়। নইলে তার পক্ষে আমার মানিয়ে নেয়ার দায়টা কিছুতেই বোধগম্য হবে না। আমি কথার মোড় ঘুরিতে নিতে বলি, -‘এদেশে এসে প্রথম কোন ব্যাপারটা আমার ভাল লেগেছিল জানেন?

 

-কি?

 

-এসেই যখন দেখলাম, ঘাম ঝরানো গরম নেই, যন্ত্রণাদায়ক মশা নেই আর কল খুললেই ডাইরেক্ট সাপ্লাই পানিই খাওয়া যায়, তাও আবার হিম হিম ঠান্ডা তখন খুব ভাল লেগেছিল। একটা শান্িত শান্িত ভাব! দেশের মত গরমে অস্থির হতে হয় না। মশার কামড়ে কষ্ট পেতে হয়না। খাবার পানিকে বিশুদ্ধ করতে ফুটিয়ে ফিলটার করে বোতলে বোতলে ভরে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে খেতে হয় না। শান্িত লাগবে না বলুন? ওহ! আরও একটা ব্যাপার আছে। রাত বিরেতেও এখানে বাইরে বেড়োতে পারি, যা দেশে কল্পনাও করা যায় না।

 

-তা ঠিক!

 

-তবে আমার কি মনে হয় জানেন?

 

প্রত্যুষ চোখ ভরা প্রশ্ন নিয়ে তাকায়, -‘কি?’

 

-আমাদের দেশে এই ক’টা যন্ত্রণা না থাকলে আরও বেশি শান্িততে বাস করা যেত। যেহেতু দেশে বাস করলে অন্য বেশকিছু দিকে এসব দেশের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। বিশেষত অর্থ থাকলে।

 

-রাইট!

 

কথায় কথায় আমাদের দুজনেরই বেশ আগেই কফি খাওয়া শেষ। আমি এবার উঠতে চাইলাম।

 

-এবার চলুন ওঠা যাক।

 

মল থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা পথ আমরা একসাথেই হাটলাম। সামার চলে গেছে, এখন ফল্‌। পথের দু’ধারে ম্যাপল্‌ ট্রির পাতারা সব হলুদ, কমলা হয়ে গেছে। একটু বাতাসেই পাতারা ঝরে ঝরে পরছে। ফলে পথ যেন এখন হলুদ কার্পেটে ঢাকা। অদ্ভূদ এক সৌন্দর্য্য! কিন্তু এই সৌন্দর্য্য মনকে বিষন্নও করে দেয়। বুঝিয়ে দেয় সামার বিদায় নিয়েছে, সামনেই ভয়াল শীত। এই দৃশ্যে মনের মধ্যে কেমন যেন বিদায়ি সুর বেঁজে ওঠে। জীবনের যে কোন ধরনের বিদায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। মন হু হু করে ওঠে।

 

আমার ভাবনার মধ্যে প্রত্যুষ হঠাৎ কথা বলে ওঠে।

 

-জীবনের সময়গুলোও এভাবেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। হেলাফেলা করে জীবনের অনেকটা সময় পার করে দিয়ে আমরা এখন জীবনের যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি তাতে আর কিছুদিন পরেই আমাদের জীবনও বোধহয় এরকম হলুদ বর্ণ হয়ে যাবে। তারপর একদিন এই হলুদ পাতাদের মত আমরাও টুপ করে জীবন থেকে বৃন্তচুত্ত হয়ে ঝরে পরব।

 

প্রত্যুষের কথায় আমাদের দুজনেরই মনটা ভারী হয়ে যায়। কারণ আমরা দুজনেই জানি কথাটা কতখানি সত্যি। আমার মাথার মধ্যে এখন প্রত্যুষের একটা কথা ঘুরপাক খায় ‘হেলাফেলা করে জীবনের অনেকটা সময় পার করে দিয়ে-।’ সত্যি তো জীবনের সুন্দর সময়ের  অনেকটাই আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। সত্যি তো হেলাফেলা করেই জীবনের অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেল। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় আমার। প্রত্যুষও চুপচাপ। কে জানে সেও ঠিক আমার মত করেই এখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবছে কিনা!

 

 

 

১০

শুক্রবারে সবসময়ই আমার মিশ্র একটা অনুভূতি হয়। পরের দুটোদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কাজে ছুটতে হবে না এটা ভেবে একদিকে যেমন ভাল লাগে, তেমনি ছুটীর দুটোদিন আমার আরও বেশি নিঃসঙ্গ লাগে বলে ভাল লাগে না। আজ কাজ থেকে ফেরার সময়ই ভেবে রেখেছিলাম আজ আর রান্নার ঝামেলায় যাব না। যাহোক একটা কিছু খেয়ে বেশ আয়েশ করে পুরোনদিনের বাংলা কোন মুভি দেখব। পরেরদিন শনিবার, তাই রাত জাগলেও কোন সমস্যা নেই আজ। আমি প্ল্যান করে ফেললাম আজ সন্ধ্যে আর রাতটা হবে আলসেমি করার রাত।

 

ঘরে ফিরেই এত ক্ষিধে পেয়ে যায় যে প্রথমেই একটা কিছু খেয়ে না নিলে মাথাটা যেন ঠিকমত কাজ করতেই চায় না। এই সময়টায় দেশের জীবনটাকে যে কি ভীষন মিস্‌ করি! দেশে থাকলে ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরতাম তখন খাবারটা সামনে এগিয়ে দেবার মানুষ থাকত। এরকম রোজই নানান কাজের মাঝে নানান কারণে কত সহস্র্যবার যে দেশকে মিস্‌ করি আমি!

 

ডিপ্‌ফ্রিজে রেডিমেড্‌ পিৎজা আছে, সেটাকে ওভেনে ঢুকিয়ে দিয়ে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হতে হতেই পিৎজা প্রায় হয়ে গেল। কফি করে পিৎজাসহ লিভিংরুমে চলে এলাম। উত্তম কুমারের ‘‘সপ্তপদি’’ চালিয়ে দিয়ে আরাম করে বসি আমি। এখন শুধু উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, আমি, আর আমার পিৎজা। ভাবনাটা আমাকে বেশ আনন্দ দেয়। কিন্তু আমার সেই আনন্দকে খানখান করে দিয়ে মোবাইলটা বেজে উঠল। উহ্‌! এখন আমাদের মধ্যে কাবাব মে হাড্ডি হতে কে আবার ফোন করল? ধুর ছাই! মোবাইলটা আবার হাতের কাছেও নেই। মহাবিরক্ত হয়ে আমি উঠে গিয়ে কল রিসিভ করলাম।

 

-‘বিরক্ত করলাম না তো?’ প্রত্যুষের কন্ঠ।

 

-‘করলে তো করেই ফেলেছেন, এখন আর কি করবেন বলুন?’ আমি ফান করে বলার ভঙ্গিতে বললাম, যদিও সত্যি সত্যি আমি এখন বিরক্ত হয়েছি। কিন্তু সেটা তো আর বলা যায় না। ভদ্রতা বিষম দায়!

 

-তা ঠিক! আসলেই আপনাকে আমি অনেক জ্বালাচ্ছি। এখন অনুমতি দিলে আরেকটু জ্বালাতে চাই। অনুমতি মিলবে কি?

 

-আপনি তো বেশ মানুষ, অনুমতি নিয়ে জ্বালাতে চাইছেন! জ্বালানোর জন্য অনুমতির অপেক্ষা করলে এ জনমে আর আমাকে জ্বালাতে হচ্ছে না আপনার।

 

-বলছেন? আচ্ছা বেশ, তাহলে আর অনুমতির অপেক্ষা করছি না। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম আপনাকে আরেকটু জ্বালাব। কথাটা সরাসরিই বলে ফেলি।

 

আমি তো প্রত্যুষের বলার ঢঙ্গে ভয়ই পেয়ে গেলাম। কি রে বাবা, সরাসরি কি বলতে চায়?

 

প্রত্যুষ বলে, -‘আমি বরাবরই কেনাকাটায় যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ। যখনই দেশের বাইরে কোথাও আসি তখনই ফ্যামিলির সবার জন্য কিছু না কিছু কিনতে খুব ইচ্ছে করে। কিনিও। কিন্তু কখনোই কাউকে ঠিক খুশি করতে পারিনা। সব উলটা পালটা জিনিষ কিনে নিয়ে যাই। তাই মা এবার বারবার করে নিষেধ করে দিয়েছেন যেন কিছু না কিনি। কিন্তু এখন আপনাকে যখন পেয়েইছি তখন কৃপা করে আমাকে একটু কেনাকাটায় হেল্প করুন প্লিজ্‌! আমিও এই সুযোগে ফ্যামিলির সবার জন্য পছন্দের জিনিষ নিয়ে গিয়ে চম্‌কে দেই।’ কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে প্রত্যুষ খানিক থামে, যেন আমার কৃপা পাবে কিনা সেটা জানার অপেক্ষায় আছে।

 

আমি একটু ভাবি। একটু কি বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে? নাহ্‌, নিজেই এই ভাবনাটাকে পাত্তা দেই না। কিসের বেশি বেশি? একজনের নির্দোষ প্রয়োজনে আরেকজন সাহায্য করবে এটাই তো স্বাভাবিক জীবন! আমি তো অন্যায় বা অস্বাভাবিক কিছু করছি না। তবে আর এত ভাবনা কিসের! আমি এবার বলে দেই, -‘কৃপা মঞ্জুর করা হল। তবে সোম থেকে শুক্র কাজ করতে হয় বলে শনি বা রবিবার ছাড়া আমার এই কৃপা এ্যাক্টিভেট্‌ করতে পারবেন না।’

 

-সে জন্যই তো আজ এই মোক্ষম সময়ে আপনার দরবারে আমার আর্জি নিয়ে হাজির হয়েছি। সামনের দু’দিনই তো কৃপা এ্যাক্টিভেট করা যেতে পারে। কাল কি ব্যস্ত থাকবেন, বা পরশু?

 

 

 

 

 

-‘কাল?’ আমি চট্‌ করে ভেবে নেই, কাল আমার খুব জরুরী করণীয় কিছু আছে কিনা! নাহ্‌, রান্না ছাড়া অবশ্য করণীয় কিছু নেই। আর খাবারের জন্য অত চিন্তাই বা কিসের। সে যাহোক করে চালিয়ে নেয়া যাবে। আমি জানিয়ে দেই কাল আমার কোন সমস্যা নেই, সময় দেয়া যাবে। কথা হল আমরা সকাল এগারোটায় সেÏট্রালে যাব। আর যেহেতু একই এলাকা থেকেই যাব সেহেতু একসাথে যাওয়াই ভাল, সেক্ষেত্রে সেÏট্রালে গিয়ে একে অন্যকে খোঁজাখুঁজি করার আর ঝামেলা থাকে না। এগারোটা বাজার দশ মিনিট আগে সাবওয়ে ষ্টেশনে দেখা হবে জানিয়ে বিদায় নিয়ে আমি আবারও উত্তম সুচিত্রা আর আমার পিৎজার কাছে ফিরে এলাম।

 

সকালে পোনে এগারোটার দিকে আমি যখন সবে ফç্যাটের ডোর লক করে আমার বৈদ্যুতিক পালকীতে চড়েছি তখন প্রত্যুষের ফোন এল। রিসিভ করতেই বলল, -‘আপনি ডিরেক্ট প্ল্যাটফর্মে চলে আসুন। আমি এখানেই অপেক্ষা করছি।’ আমি বেশ অবাক হলাম! এই লোক এত আগে আগে চলে এসেছে কেন?

 

 

 

 

আড়াইটার মধ্যেই ওনার কাংখিত সবকিছু কেনা হয়ে গেল। আমি এবার নিজেই বললাম, -‘চলুন কোন দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট লাঞ্চ করি। যদিও আমি নিজে দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট যাওয়াটা পছন্দ করিনা। তবে আপনার অনারে আজ নয় গেলামই।’

 

কাছেই একটা দেশি রেষ্ট্রুরেÏট দেখে ওতেই ঢুকে পরলাম আমরা। এমনিতেই লাঞ্চের সময় প্রায় শেষ, তাই কাছেরটাই ভাল। আমি এসব রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবারের ব্যাপারে খুবই অজ্ঞ। কোনটা খেতে ভাল বা কোনটা নয় কিছুই জানিনা। তাই প্রত্যুষের পছন্দেই খাবারের অর্ডার দেয়া হল। আমরা গিয়ে একটা কর্নার টেবিলে বসলাম। এখানকার সবাই বাঙ্গালী, আর বাঙ্গালীদের কৌতুহলের তো সীমা নেই। কে জানে এরা বোধহয় আমাদের কাপল্‌ ভাবছে। ভাবলে ভাবুক, কি আর করা। খেতে এসেছি, খাওয়া হলে চলে যাব। ব্যাস!

 

এসব দেশে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবারগুলো আসলে কিছুটা ইউরোপীয়ান টাচ্‌ এ এশিয়ান খাবার। ইউরোপীয়ানরা খুব বেশি ঝাল, মশলা খেতে পারে না বলে খাবারগুলো এভাবে রাঁধা হয়। আমার এই বাঙ্গালী, ইউরোপীয়, ইন্ডিয়ান ষ্টাইলের কক্টেল ‘ইউরোয়েশিয়ান’ খাবার পছন্দ না। প্রত্যুষেরও সেকারনেই দেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবার ভাল লাগছে না বুঝতেই পারছি আমি। তবুও খেতে খেতে জিগ্যেস করলাম,

 

-এখানে খেতে কেমন লাগছে?

 

-এ পর্যন্ত তো দুটো দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট খেলাম, সবগুলোর খাবারের টেষ্ট অল্‌মোষ্ট একই।

 

-আমারও তাই মনে হয়।

 

-‘আসলে কি জানেন, বাঙ্গালির এই ছুরি চাকু দিয়ে খেয়ে পেট ভরলেও মন ভরে না।’ প্রত্যুষ খেতে খেতে বলে।

 

-‘হুম্‌, সত্যি তাই।’ আমিও একমত হই।

 

এরপরে বেশ কিছুক্ষন আমরা নিরবেই খেয়ে যাই। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখে আমি কথা বলি, -‘এই যে এখন আপনি যা কিছু কিনলেন, এসবই আর কিছুদিন পরে কিনলে আপনার অনেকগুলো টাকা বেচে যেত।’

 

-‘কেন?’ অবাক হয় প্রত্যুষ!

 

-সামনেই তো ক্রিস্‌মাাস, তাই সবকিছুর দাম কমত। জিনিষপত্রের উপরে নানান অফার থাকত।

 

-কি আশ্চর্য্য! তাই নাকি? কিন্তু কেন? আমাদের দেশে তো ঈদ, পূজো, এরকম যে কোন উৎসবের আগে সবকিছুর দাম আরও বেড়ে যায়!

 

-‘আমাদের জন্য সত্যিই অবাক হবার মতই ব্যাপার এটা। আসলে কি জানেন, স্বচ্ছলতা উদার হতে সাহায্য করে, অন্যের জন্য সুবিধে দিতে পারে।’ আমি বলি।

 

-‘তাই কি? কিন্তু আমি আপনার কথা সম্পূর্ণ মানতে পারছিনা। আমাদের দেশের ধনীদের কথা একবার ভেবে দেখুন, তারা কি উদার হতে পেরেছে? অন্যের সুবিধের কথা কি একবারও ভাবে তারা?’ প্রত্যুষ মাথা নাড়িয়ে আমার কথার বিরোধিতা করে।

 

আমি প্রসঙ্গ পালটাই।

 

-এসব ভারী ভারী কথা এখন থাক। তারচেয়ে বলুন আপনার এবারের শপিং আপনার ফ্যামিলি পছন্দ করবে বলে মনে হচ্ছে?

 

-নিশ্চয়ই!

 

-এত জোড় দিয়ে কিভাবে বলতে পারছেন?

 

-আমার নিজের পছন্দের উপরে আস্থা না থাকলেও আপনার পছন্দের উপরে আস্থা আছে।

 

-আমার পছন্দ আপনার ফ্যামিলির তো পছন্দ নাও হতে পারে!

 

-আপনার পছন্দ আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে, আর আমার পছন্দকে আমার ফ্যামিলিরও পছন্দ হবে।

 

-এর আগেও আপনি যা কিছু কিনেছেন ওনাদের জন্য সেগুলোও তো আপনার পছন্দেই কেনা ছিল।

 

-আরে ধুর্‌! অত পছন্দ করে কিনেছি নাকি। একা একা অত ঘুরে ঘুরে কিনবে কে, সামনে যা পেতাম তাই কিনে নিয়ে গেছি।

 

-‘ওহ! তাহলে তো আর আপনার ফ্যামিলিকে দোষ দেয়া যায় না।’ আমি এবার হালছাড়া সুরে বলি।

 

-আমার ছোটবোনটাকে তো চেনেন না আপনি, তাই একথা বলছেন। ওর কোনকিছুই মনমত হয় না।

 

-আদরের ছোট বোন, একটু তো এরকম হবেই।

 

-হুম্‌! ভীষন মুডি! মা বলেন, ‘তোর জন্য প্রত্যুষের বৌ টিকতে পারবে না।’

 

-আপনি বুঝি সেই ভয়েই বিয়ে করছেন না?

 

-আরে না না, সে জন্য হবে কেন? আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গিয়ে বিয়েটা আর করা হয়নি।

 

-ফ্যামিলিও বিয়ের জন্য প্রেসার দেয়নি?

 

-দেয়নি মানে? মা তো আমার কানের কাছে সারাক্ষন একটা ভাঙ্গা রেকর্ড চালিয়েই রেখেছে, আর তাতে একনাগারে বেজেই চলেছে  ‘‘বিয়ে কর’’  ‘‘বিয়ে কর’’  ‘‘বিয়ে কর’’।

 

প্রত্যুষের বলার ঢঙ্গে আমি হাসতে হাসতে বলি, -‘আর আপনি সেই রেকর্ডটা কিছুতেই থামাতে পারছেন না তাই তো?’

 

-‘থামাতে পারা তো দূরের কথা, থামাতে চেষ্টা করলেই সেই রেকর্ডের ভলিয়্যুম বরং আরও বেড়ে যায়।’ প্রত্যুষ চোখ বড় করে হতাশ ভঙ্গিতে বলে।

 

আমার আরও হাসি পায়। বলি, -‘তাহলে আর কি করবেন বলুন, বিয়েটা করেই ফেলুন বরং।’

 

-হুম্‌, আমিও ভাবছি মায়ের উপরে রাগ করে এবার বিয়েটা করেই ফেলব কিনা!

 

আমি বলি, -‘সেটাই উচিৎ হবে। বিয়ে যদি করতেই হয় তবে সেটা সময়মত করাই ভাল। শুধু শুধু বয়স বাড়িয়ে কি লাভ!’

 

-তাই যদি মনে হয় আপনার তবে নিজেও কেন আমার মতই বয়স বাড়াচ্ছেন? আপনিই বা বিয়ে করেননি কেন?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি থম্‌কে যাই। আমার মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত সরে যায় মূহুর্তেই। আমি ভাবিনি বিয়ের প্রসঙ্গে আমাকে এরকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাহলে হয়ত এই বিষয়ে আমি কোন কথাই বলতাম না। আমার আপনা থেকেই হাত থেমে যায়, খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যুষ বোধহয় আমার হঠাৎ এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে। সে স্বসব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে,

 

-আমাকে ক্ষমা করবেন প্লিজ্‌! আমি আসলে খানিকটা ফান করেই কথাটা বলেছিলাম। প্লিজ্‌ অপরাজিতা, আপনি কাইন্ডলী কিছু মনে করবেন না!

 

আমি ততক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়েছি।

 

-ইট্‌স ওকে!

 

আমি বেশ খানিক্ষন আর কোন কথা বলতে পারিনা। মাথার মধ্যে এখন আমার ফç্যাশ ব্যাক হচ্ছে। মাথায় কেমন যেন একটা যন্ত্রণা অনুভব করি! আজ কতদিন পরে আবারও আমাকে সেই সময়ের মুখোমুখি হতে হল! নিজের ভেতরে কুরে কুরে খাওয়া যন্ত্রণাটা কখনোই কারও সাথে শেয়ার করতে পারিনি আমি। এদেশে একা থাকি বলে খুব বেশি মানুষের সাথে মেলামেশা করিনা আমি। বিশেষত বাঙ্গালীরা ভীষন কৌতুহলী বলে তাদের আমি বরং কিছুটা এড়িয়েই চলি। যদি দেশে থাকতাম তাহলে হয়ত বলার মত মানুষ পেতাম। কিন্তু সেই থেকেই তো এভাবেই সবার চোখের আড়ালে এতটা দূরে প্রায় আত্মগোপন করে আছি আমি। একটা মানুষও পাইনি যার সাথে যন্ত্রণাগুলো শেয়ার করে নিজেকে কিছুটা হালকা করব। হঠাৎ অনূভব করি, আমার কথাগুলো কাউকে বলাটা সত্যি জরুরী। কারো সাথে শেয়ার করলে এই যে এখন যে কষ্টটা হচ্ছে সেটা হয়ত অনেকটা কমে যেত। আমার কেন যেন মনে হয় প্রত্যুষকে বলা যায়। প্রত্যুষ তো আর এখানে থাকবে না, দেশে ফিরে যাবে। একসময় ভূলেও যাবে হঠাৎ পরিচয় হওয়া কোন এক মেয়ের কষ্টের কাহিনী। আমাকেও তো তার মুখোমুখি আর কখনও হতে হবে না। আমি আর একটু ভাবি, তারপরে বলি, -‘বয়স বাড়ার আগে সময়মতই আমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল।’

 

এবার প্রত্যুষের চম্‌কানোর পালা। আমাকে দেখে অবিবাহিতই ভাবার কথা তার, তাই হঠাৎ বিয়ে হয়েছে শুনলে চম্‌কাতেই পারে। কিন্তু সে মূহুর্ত মাত্র। প্রত্যুষ খুব সাবলিল ভাবেই এবার জানতে চায়, -‘দেয়া হয়েছিল মানে? আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে?’ প্রশ্নটা করে ফেলেই প্রত্যুষ আবারও স্বসংকোচে বলে ওঠে, -‘আই এ্যাম সরি এগেইন! এটা খুব পারসোনাল প্রশ্ন হয়ে গেছে। আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আমরা বরং অন্য কোন প্রসঙ্গে কথা বলি।’

 

প্রত্যুষের ভদ্রতায় আমি এবার সামান্য হাসি। বলি, -‘আপনার এত সরি হবার কিছু নেই। আসলে অনেকদিন পরে আমার জীবনের অন্ধকার একটা অধ্যায় নিয়ে কারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে প্রথমেই একটু রিয়্যাক্ট করেছিলাম। কিন্তু এখন আমি ঠিক আছি। যে জীবন পেছনে ফেলে এসেছি সে তো এখন কেবলই পাষ্ট, সেটা নিয়ে আর রিয়্যাক্ট করাও উচিৎ না। আর পারসোনাল অনেক কিছু নিয়েই আমাদের কথা বলতে হয়, বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, এটাই জীবনের ধর্ম।’

 

আমি আবারও খানিক চুপ করে থাকি। তারপরে বলি, -‘দশ বছর আগে এক প্রবাসী ছেলের সাথে আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দেয়। আমি তখন মাত্র অনার্স করেছি। আমাদের এক আত্মিয়ই আমার বিয়ের জন্য এই প্রস্তাবটা নিয়ে আসে। ভদ্র পরিবার, অবস্থা ভাল। ছেলেও ইঞ্জিনিয়ার। ইউরোপে ছেলে নাকি বাড়ীও কিনেছে। যাইহোক দেশে ছেলেদের বাড়ী দেখে, যাবতীয় খোঁজ খবর নিয়ে ইত্যাদী সবকিছুতেই সন্তুষ্ট হবার মত। তবুও আমার বাবা রাজী হতে চাইলেন না। তিনি বললেন, -‘‘দেশের সবকিছু চোখে দেখে ভাল মনে হলেও ছেলে যেখানে কয়েক বছর ধরে আছে সেখানে সে কি করছে বা কেমন স্বভাবের সেটা তো আর আমরা চোখে দেখতে পাচ্ছিনা বা কোনভাবে খোঁজও নিতে পারছি না। আমি এভাবে কোন অজানায় তো আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একলা পাঠিয়ে দিতে পারিনা।’’ কিন্তু আমার মা বেঁকে বসলেন। তিনি এখানেই আমার বিয়ে দেবেন। ওনার একটাই কথা এমন অবস্থাসম্পন্ন শিক্ষিত পরিবারের ইউরোপে সেটেলড্‌ ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ের এমন সূবর্ণ সুযোগ তিনি কিছুতেই হারাতে পারবেন না। বাবা মাকে কত করে বোঝাতে চাইলেন, বিদেশে থাকা ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তাকে একলা পাঠিয়ে পরে প্রস্তাতেও হতে পারে। তার চেয়ে অনেক ভাল মেয়েকে দেশেই বিয়ে দিয়ে নিজেদের চোখের সামনে রাখা। কিন্তু মায়ের একটাই কথা, ‘‘এদেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। মেয়ে ইউরোপে থাকলে অনেক ভাল থাকবে, নিরাপদে থাকবে।’’ ফলে বাবার শত আপত্তিও ধোপে টিকল না। আমার ঐ ছেলের সাথেই বিয়ে হয়ে গেল। কয়েকমাসের মধ্যে আমি তার কাছে চলে গেলাম। আর সেখানে গিয়েই একের পরে এক ধাক্কায় আমি নির্বাক হয়ে যেতে লাগলাম। বিয়ের পরে আমি গিয়ে প্রথমেই জানলাম সে ইঞ্জিনিয়ার তো নয়ই, এমনকি পরাশোনাটাও শেষ করেনি। সে ওখানে সামান্য একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। আমি ভীষন শক্‌ড হই! কিন্তু তবুও মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে আমি নয় একটু কম্প্রোমাইজ করলামই। কিন্তু তখনও যে আমার আরও অনেক কিছু জানতে বাকী সেটা বুঝিনি। এরপর কিছুদিন যেতে জানলাম সে ওখানে আমার আগেই ওদেশি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে এবং সেখানে তাদের একটা মেয়েও আছে।’

 

-ওহ গড্‌! দেন?

 

-আমি এটাও মেনে নিতে চাইলাম। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আমি তার জীবনে আসার আগে কি হয়েছে না হয়েছে সেসব নিয়ে না ভেবে আমার এখন এটাই দেখা উচিত সে আমাকে কতটুকু মূল্য দিচ্ছে, কতটুকু ভালোবাসছে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলাম এটা ভেবে যে, এখন তো আমি ছাড়া তার জীবনে আর সেই মেয়ে নেই। কিন্তু আমার সেই ভাবনাটুকুও মিথ্যা প্রমানিত হতে খুব বেশিদিন লাগল না। আমি জানতে পারলাম সেই মেয়ের সাথে তার নাকি এখনও আগের মতই সম্পর্ক আছে। আমাকে যে প্রায়ই রাতে টেক্সি চালালে পয়সা বেশি বলে রাতে বাসায় ফিরত না, সে আসলে সেই মেয়ের সাথেই সেসব রাতে থাকত। সে খুব কৌশলে দু’জন মেয়ের সাথেই ডাবল্‌ রোল প্লে করে যাচ্ছিল।

 

আমি একটু থামতেই প্রত্যুষ জিগ্যেস করে, -‘এটা কি আপনি বিস্বস্ত সূত্র থেকে জেনেছিলেন?’

 

আমি প্রত্যুষের দিকে তাকাই, আমি বুঝতে পারি প্রত্যুষ আসলে কি ভাবছে।

 

-আমিও বিষয়টা প্রথম জানার পরে আপনার মতই ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম শুধু শোনাকথায় কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না।

 

-এক্সাক্টলী!

 

-আমি শোনাকথায় সিদ্ধান্ত নেইনি, নিয়েছি নিজের চোখে সবকিছু দেখে। সম্পূর্ণ বিষয়টা বুঝে এবং নিজের জীবনের শেষ পরিনতি সম্পর্কেও ধারণা পেয়েই আমি আমার সিদ্ধান্েত পৌঁছাই। ভূল সম্পর্কের শিকড় জীবনের মূলে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই তাকে স্বমূলে উপরে ফেলাই ভাল। তবে এটা কেউ পারে, কেউ পারে না। আমি পেরেছিলাম। আমি অন্য জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে তার বাসা ছেড়ে চলে আসি। তাকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে ওদেশে থাকার অনুমতি আমার ছিলই। কাজ জোগার করে নিতেও খুব বেশি কষ্ট হয়নি। কিন্তু কষ্ট হয়েছে কাজের পাশাপাশি যখন পড়াশোনা শুরু করলাম আবার। ইতিমধ্যে আমাদের ডিভোর্সের যাবতীয় ফর্ম্যালীটিও শেষ হয়ে যায়। এরপরে কাজ আর পড়াশোনা, এছাড়া আমার জীবনে আর কোনকিছুর অস্তিত্ত্ব ছিল না তখন। এভাবেই অমানষিক পরিশ্রমের তিনটা বছর পার হল। তার সাথে দু’বছরের সংসার আর এই তিন বছর মিলিয়ে পাঁচ বছর হতেই আমি পার্মানেÏট সিটিজেনশিপের জন্য আবেদন করি। সেটাও যখন হয়ে গেল, তখন তো আর ওদেশে থাকার আর কোন প্রয়োজনই রইল না আমার। আমি তো তখন ইউরোপের যে কোন দেশেই সেটল্‌ করতে পারি। আমি এদেশে চলে এলাম। তারপর তো এদেশেও পাঁচটা বছর কেটে গেল।

 

-ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি একদম ঠিক কাজটাই করেছিলেন। কিন্তু তারপরে অত কষ্ট আপনি করতে গেলেন কেন? দেশে ফিরে গেলেন না কেন?

 

-মা বাবার জন্যই দেশে ফিরে যেতে পারিনি আমি।

 

-‘মানে?’ প্রত্যুষের অবাক প্রশ্ন!

 

-একজন ডিভোর্সি মেয়ের বাবা মায়ের অনেক যন্ত্রণা, অনেক অসম্মান। তাই ওনাদের সেই অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের যন্ত্রণা নিয়ে আমিই দূরে দূরে আছি।

 

-কে বলেছে আপনাকে এমন কথা? আপনার এমন মানষিক অবস্থায় আপনার মা বাবার কাছে থাকাটাই বরং আরও বেশ জরুরী ছিল। ওনারাই পারতেন আপনার কষ্ট কমাতে।

 

-আপনি বুঝবেন না আসলে। আমি তো অনুমানের উপরে নির্ভর করে এমনটা বুঝিনি নিশ্চয়ই? আমার মায়ের কথাতেই আমি বুঝেছি, আমি দেশে ফিরে গেলে লোকে আমাকে নিয়ে নানান কৌতুহল দেখাবে, নানান মন্তব্য করবে। কেউ কেউ হয়ত উপযাচক হয়ে উপদেশ দিতে আসবে। আর এসবে আমার পরিবার প্রতিনিয়ত কষ্টের মধ্যে থাকবে, অসম্মানিতবোধ করবে। বরং ডিভোর্সের পরে আমি কখনোই দেশে থাকার জন্য যাইনি বলে অনেকেই এখনও জানে আমি ভাল আছি। সুখে সংসার করছি। ফলে দেশে যাবারও সময় হয়না আমার। গত দশ বছরে আমি একবারই দেশে গিয়েছি এবং সেটা সারে তিন বছর আগে। তখন অনেকেই ভেবেছে স্বামী ব্যস্ত তাই সাথে আসতে পারেনি।

 

-আপনি দূরে আছেন বলে এখন কি ওনারা আপনার জন্য কষ্ট পাচ্ছেন না?

 

-হয়ত পাচ্ছেন। কিন্তু আমি দূরে আছি বলে অন্তত অনেকের অনেক কথা শোনার হাত থেকে তো বেঁচে যাচ্ছেন। একটা কথাই তো আছে ‘‘চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল’’। আমিও আত্মিয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীর চোখের আড়ালে থেকে অনেকটাই তাদের মনের আড়ালেও থাকতে পারছি। তাই দূরে আছি বলে আমাকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনাও নিশ্চয়ই কম হবে। আর এতে আমার পরিবারও অপেক্ষাকৃত ভালো থাকবে।

 

কথাগুলো বলে আমার নিজের অজান্েতই দীর্ঘ্যশ্বাস পরে। প্রত্যুষও খানিক চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎই বলে,

 

-আর আপনি? আপনি কি সবাইকে ছেড়ে এই বনবাসে ভালো থাকতে পারছেন?

 

-পরিবারের কথা ভাবতে গেলে নিজের কথা আর ভাবা যায় না। তাছাড়া মায়ের উপরে আমার কিছুটা অভিমান তো আছেই। নিজের মা বলেই ওনার ভূলটাকে তো আর সঠিক বলা যাবে না। এটা তো সত্যি ওনার কারণেই আজ আমার জীবনের এই অবস্থা। মায়েরও সেটা বোঝা উচিৎ, স্বীকার করা উচিৎ। উচিৎ আমাকে ওনাদের কাছে ডাকা। কিন্তু মা সেটা না করে আবারও একই ভূল করার কথা ভাবছেন।

 

-মানে?

 

-মা চাইছেন আবারও দেশের বাইরের কোন ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিতে। কারণ আমি একে তো ডিভোর্সী, তার উপরে আবার দ্বিতীয় বিয়ে। লোকে আমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করবে। তাই আমাকে দেশের বাইরেই রাখার ব্যবস্থা করা যেন লোকে আমার সমালোচনা করার সুযোগ বেশি না পায়।

 

প্রত্যুষ অসম্ভব অবাক হয়ে শোনে। বলে, -‘আর আপনার বাবা? ওনারও কি একই মত?’

 

-না। তবে আমার বাবা শান্িতপ্রিয় মানুষ। তাই বিয়ের পর থেকে বরাবরই মায়ের মতকেই প্রাধান্য দিয়ে এসে আজ আর মা ওনার কোন মতের তোয়াক্কাই করেন না।

 

-হুম্‌! কোন কোন মহিলা এমন হন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলতে পারে! সারাজীবন তো নয় নিশ্চয়ই?

 

 

-‘জানিনা।’ আমি হালছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে বলি। নিজের অজান্েতই আমার দীর্ঘ্যশ্বাস পরে।

 

প্রত্যুষের কানে আমার দীর্ঘ্যশ্বাস যায় বোধহয়। সে খানিক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে নরম স্বরে বলে, -‘আপনার নাম অপরাজিতা, আর সেই আপনিই কিনা জীবনের কাছে এভাবে হেরে যাবেন?’

 

প্রত্যুষের কথায় আমি যেন একটা ধাক্কা খাই। আমি কখনও এভাবে ভেবে দেখিনি। জীবনের একটা একটা করে দিন দু’হাতে শুধু ঠেলে ঠেলে পার করেছি। নিজেকে নিয়ে এত ভেবে দেখার অবকাশই হয়নি কখনও। আমার হঠাৎ করেই সবকিছুর উপরে কেমন বিরক্তিভাব চলে আসে। এমন কি প্রত্যুষের সাথে কথা বলতেও আর একটুও ইচ্ছে করে না আমার। আমি বাসায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি।

 

 

 

১১

গত দু’টোদিন প্রত্যুষের সাথে আর কোন কথা হয়নি আমার। আমিও সোমবার থেকে যথারীতি কাজে যাচ্ছি, ঘরে ফিরছি। এর মধ্যে রবিবারে বাবার সাথে কথা বলে জানিয়ে দিয়েছি, এত অল্প সময়ে আমার পক্ষে ছুটী পাওয়া সম্ভব হয়নি। বাবা মন খারাপ করেছেন সেটা বুঝে আমারও খারাপ লেগেছে। কিন্তু কি বা করার আছে আমার! এখানে থাকতে হলে আমাকে রোজগার তো করতেই হবে। আর তার জন্য চাকরীটা ঠিক রাখা সবচেয়ে জরুরী। আমার আর এত ভাবতে সত্যি ভাল লাগে না। এমনিতেই আমার জীবন অনেক কঠিন, আর এই কঠিন জীবনের ভারও অনেক বেশি। এই ভারী জীবনের বোঝা টানতে টানতে আমি ভীষন ক্লান্ত। এর মধ্যে সবার মনের খবর রাখতে বা সবাইকে খুশি করতে আমি আর পারছি না।

 

মঙ্গলবার সকালে কাজে যাবার পথে প্রত্যুষের ফোন এল। জানাল আজ সে ইটালি যাচ্ছে, শনিবারে ফিরবে। এটাও জানাল ইটালি যাবার আগে এখানে কিছু কাজ গুছিয়ে না গেলেই চলত না বলে গত দু’দিন তাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আর সেজন্যই আমাকে ফোন করতে পারেনি। তাছাড়া আমাকে খুব বেশি জ্বালানো হয়ে গেছে মনে করেও নাকি রোজ রোজ ফোন করতে সংকোচ হয়। নইলে নাকি তার ফোন করতে ইচ্ছে ঠিকই হয়েছে। আমি জানাই এতে এত সংকোচ বোধ করার মত কিছুই হয়নি। আমাদের কথা আর বেশি এগোয় না। প্রত্যুষ জানায় ইটালি গিয়ে সে ফোন করবে। আমিও তাকে ‘গুড লাক’ জানিয়ে ফোন রাখি।

 

আমরা যারা প্রবাসী তারা কখনও দেশে যাবার কথা একটুখানি ভেবে ফেললেই মহাসর্বনাশ! এরপরে দেশে না যাওয়া পর্যন্ত কাজেকর্মে কিছুতেই আর মন বসে না। তখন যেন আমরা প্রাণহীন হয়ে যাই। শরীরটাই শুধু নিজের কাছে থাকে, মনটা চলে যায় দেশে। আমারও এখন সেই অবস্থা! বাবা যেদিন বললেন ‘এবারের ঈদটা তোর সাথে করতে ইচ্ছে করছে, তুই কি আসতে পারবি?’ সেদিন থেকে আমার মনও কেবলই যাই যাই করছে। আমিও যেন এখন এক প্রাণহীন ছায়াশরীর। দূর এভাবে কি ভালো লাগে কিছু? আমারও কিছুই ভালো লাগছে না। আমি ঠিক করি, ঈদের দিনটা যেভাবেই হোক ছুটী ম্যানেজ করে সারাদিনের জন্য আমি দূরপাল্লার কোন ট্রেনে চড়ে বসব। সারাদিন ধরে একাই ঘুরে বেড়িয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে রাতে ঘরে ফিরব। যেন ঈদে বাবার সাথে থাকতে না পারার কষ্টটা থেকে কিছুটা হলেও পালিয়ে থাকা যায়।

 

 

 

 

বুধবার একটু বেশি রাতেই প্রত্যুষের ফোন এল। বেশি রাত মানে তেমন বেশি নয়, দশটার একটু বেশি। কিন্তু এর আগে প্রত্যুষ কখনোই নয়টার পরে ফোন করেনি বলেই আজ রাত দশটাকেই বেশি রাত মনে হচ্ছে। আমি ফোন রিসিভ করতেই প্রত্যুষের সহাস্য প্রশ্ন, -‘রাত দশটা বাজিয়ে ফোন করলাম বলে অভদ্র ভাবছেন না তো?’

 

প্রত্যুষ যে ক’দিন আগেই আমার জীবনের অতীত জেনেছে, তার কথায় সেটার কোন ছাপই নেই। আমিও তাই স্বস্তি পাই। হেসে উঠে বলি, -‘মোটেও না। তা ভাববো কেন?

 

-না আপনাদের ইউরোপীয় কালচারে তো কাউকে রাত ন’টার পরে ফোন করাটাই অভদ্রতা, সেখানে তো এখন রাত দশটা বেজে গেছে।

 

-হ্যা! এখানকার কালচার অবশ্য এরকমই। কিন্তু আমি তো আর ইউরোপীয় নই!

 

-কি করে বুঝি বলুন, যেভাবে একলাই জীবনকে দাপিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তাতে কি এখনও আপনি অবলা বাঙ্গালী নারীই আছেন?

 

-অবজেকশন! বাঙ্গালী নারী মানেই অবলা এরকম ভাবেন কেন আপনারা, মানে পুরুষরা বলুন তো? আপনি নিজেও কিন্তু জানেন আজ বাঙ্গালী নারীরা কোথা থেকে কোথায় পৌঁছেছে, তারপরেও এরকম ভাবতে বা বলতে পারেন কি করে?

 

-‘রক্ষে করুন। মাফ চাই! আপনারা যে মোটেও অবলা নন সেটা এই মূহুর্তে আমার চেয়ে আর বেশি কে বুঝছে!’ প্রত্যুষের স্বরে ছদ্ম ভয়। তারপরেই বলে, -‘সারাদিন কি করলেন?’

 

-কি আর করব! আমার জীবন তো আর রবি ঠাকুরের সেই গৃহপালিত মহিলা সদস্যের মত নয় যে রাঁধার পরে খাওয়া, খাওয়ার পরে রাঁধা-এই নিয়ে মোর জীবনখানি বাঁধা থাকবে! আমাকে নিজের অন্ন, বস্ত্রের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। আর সেজন্য সকালে উঠে কাজে যেতে হয়। আবার কাজ থেকে ফিরেও আবদুর রহমানের মত জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সবই নিজেকেই করতে হয়। এক্ষেত্রে আবদুর রহমানের সাথে আমার তফাৎটা এটুকুই, সে মাসিক বেতন চুক্তিতে একটা পরিবারের সবার জন্য কাজগুলো করত আর আমি কেবল নিজের জন্যই কাজগুলো করি এবং অবৈতনিক!

 

-আপনি কথা এত গুছিয়ে বলেন কি করে?

 

-‘জীবনটাকে গোছাতে পারিনা তো, তাই কথাগুলোই গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করি।’ আমি হঠাৎ হালকা পরিবেশে ভারী কথা বলে ফেলি। তাই পরিবেশটাকে স্বাভাবিক রাখতে নিজেই তাড়াতাড়ি করে বলে উঠি, -‘আপনি কেমন আছেন বলুন? কাজকর্ম  ঠিকমত এগোচ্ছে তো?’

 

-‘না এগিয়ে উপায় আছে? তাছাড়া কোথাও যাবার আগে আমি যখন লাগেজ গোছাই তখন লাগেজের সাথে সাথে আমার মনটাকেও গুছিয়ে নেই। তাই সেই গোছানো সংক্ষিপ্ত মনের দাবী দাওয়া অনেক কম থাকে, প্রত্যাশাও তেমন বেশি থাকে না তার। সেজন্য কোথাও গেলে ভালই থাকি আমি। শুধু একনাগারে ভাত না খেয়ে থাকলেই একটু যা কষ্ট হয়।’ প্রত্যুষ শেষ কথাটুকু হাসতে হাসতে বলে।

 

-বাহ্‌! আপনার মন যখন এতই ফেçক্সিবল্‌ যে তাকে চাইলেই গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত করে ফেলা যায় তবে আপনি কখনও দেশ ছেড়ে থাকতে পারবেন না বলেন কেন? আপনার পক্ষে তো যে কোন জায়গাতেই ভাল থাকা সম্ভব।

 

-কি যে বলেন! মনকে কয়েকদিনের জন্য সাময়িক ভাবে গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত করে রাখা যায়, কিন্তু তাই বলে কি বছরের পর বছর মনকে এভাবে আবদ্ধ রাখা সম্ভব? মন হাফিয়ে উঠবে না? মনের সাফোকেশন হবে না?

 

আমি প্রত্যুষের কথায় হেসে উঠি। বলি, -‘মনের সাফোকেশন?’

 

-হাসলেন কেন? মনের সাফোকেশন হয়না? মনের জন্য স্পেস প্রয়োজন হয় না? আপনি কি মনে করেন শুধু শরীরের জন্যই অক্সিজেন প্রয়োজন? শুনুন, মনেরও অক্সিজেন লাগে।

 

প্রত্যুষের কথায় আমি যেন স্বগোক্তির মত করে বলি, -‘মনের আবার অক্সিজেন!’

 

-‘নিশ্চয়ই! শরীরের জন্য আমাদের যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন তেমনি মনের জন্যও এক ধরনের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আপনাকে কোন ছোট্ট, বদ্ধ ঘরে আটকে রাখলে আপনার শরীরের যেমন অক্সিজেনের অভাব বোধ হবে, সাফোকেশন হবে, ঠিক তেমনি আপনার মনকেও তার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু থেকে বিযুক্ত রাখলে আপনার একটা বদ্ধ অনুভূতি হবে। এই অবস্থায় আপনার চারপাশের পরিসর যতই হোক না কেন, আপনার মনের জন্য স্পেস কিন্তু অনেক কম হবে। কারণ আপনি আপনার মত করে কিছুই পাচ্ছেন না। আপনার মনের তখন অস্থির লাগবে, সাফোকেশন হবে। আর মনের সাফোকেশন হলে শরীরের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনকেও আপনার আর যথেষ্ট মনে হবে না। তখন আপনার সত্যি দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইবে। আমার কাছে দেশ ছেড়ে থাকাটাও ঠিক তেমন। এখানে আমার শরীরের জন্য প্রচুর স্পেস, অক্সিজেনেরও কোন অভাব নেই ঠিকই, কিন্তু আমার মনের জন্য এখানে কতটুকু স্পেস আছে বলুন? আমার মন তো সারাক্ষন আমার পরিবার, আমার বন্ধু বান্ধব, আমার দেশ, আমাদের নানান কালচারাল উৎসব, এমন কি আমার দেশের আকাশ, বাতাস, মাটী, বসন্েত কোকিলের ডাকটা পর্যন্ত চাইবে, কিন্তু সেসব এই প্রবাসে আমি কোথায় পাব বলুন? মনকে আমি গুছিয়ে নাহয় কিছুদিনের জন্য মানিয়ে নেব। কিন্তু সেটাই বা কতদিন? তারপর? আমার মনের কি তখন দম বন্ধ হয়ে আসবে না এখানে?’ প্রত্যুষ এক নিঃশ্বাসে তার অনুভূতির কথা বলে যায়।

 

তারপরেই আবার বলে, -‘অনেকেই আমার সাথে একমত হবে না হয়ত। তারা হয়ত দেশ ছেড়ে দিব্যি যে কোন জায়গাতেই থাকতে পারে। কিন্তু যে পারে সে পারে, আমি পারি না।

 

আমি কানের সাথে আমার ছোট্ট মোবাইলটা ধরে রেখে প্রত্যুষের কথাগুলো শুনি। কথাগুলো মোবাইল গলে আমার কানে, তারপরে কান থেকে আমার বুকের মধ্যে গিয়ে ঢোকে, সেখান থেকে আমার মনে, আমার অনূভবে। আমি আমার চারপাশে তাকাই। এই তো ছাপ্পান্ন স্কোয়্যার মিটারের বাসা আমার, একার জন্য বেশ বড়! চতূর্দিকে বড় বড় কাঁচের জানালা। বাইরে তাকালেই অবারিত আকাশ। একটা ব্যালকনিও আছে, চাইলেই আমি সেখানে গিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি। দরজা খুলে বেড়িয়ে পরলেই তো বিশাল দেশটাই আমার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু তবুও এখন আমার এত দম বন্ধ হয়ে আসছে কেন? কেন আমার মনে হচ্ছে আমি একটা বদ্ধ ঘরে কতকাল বন্দি হয়ে আছি? আমি বুক ভরে শ্বাস নিতেও পারিনা যেন! প্রত্যুষের ‘হ্যালো, হ্যালো’ আমার কানে যেন আর ঢোকে না। আমি কোনরকমে ‘এখন রাখি’ বলে ছুটে ব্যালকনিতে যাই, বুক ভরে শ্বাস নেবার চেষ্টা করি। কিন্তু কই আমার বুকটা তো আর অক্সিজেনে ভরে যাচ্ছে না! আমার বাতাসে অক্সিজেন কমতে থাকে। আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।

 

 

 

১২

সেই রাতের পরে আমি আবারও জীবনের স্বাভাবিকতায় ফিরে এসেছি ঠিকই, কিন্তু অনেক কিছু নিয়েই এখন কিছুটা অন্যভাবে না ভেবেও পারছিনা আর। এতদিন আমি আমার পরিবার, আমার সমাজ-সংস্কার নিয়ে যতটা ভেবেছি ততটা নিজের জন্য ভাবিনি আমি। জেনেছি আমি সুখি নই, কিন্তু দুঃখটা ঘোচাবার কোন চেষ্টা করিনি কখনও। বুঝেছি আমি প্রতারিত, বঞ্চিত, কিন্তু নিজে থেকেও কোনকিছু নিতে চাইনি। অনেকের অনেক ভূল দেখেও সেই ভূল ভাঙ্গিয়ে দেবার চেষ্টা করিনি কখনও। বরং নিরবে নিজেকেই সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছি। আমি অভিমান করেছি যতখানি, সাহস করিনি ততটা। আমার বোধহয় একবার নিজের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

 

বৃহস্পতিবারে প্রত্যুষকে নিজেই ফোন করে রবিবারে আমার এখানে খেতে বললাম। এই বলাটা ঠিক হবে কিনা সেটা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়েছে আমাকে। বুঝতে পারছিলাম না আমার বাসায় একটা একলা পুরুষকে খেতে বলা ঠিক হবে কিনা। কিন্তু পরে নিজেই ভেবে দেখলাম, এটা এমন কিছু বিশাল ব্যাপার না, যা নিয়ে এত করে ভাবতে হবে আমাকে। একজন মানুষ খারাপ না ভাল সেটা অন্যের পক্ষে বোঝা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু তো নয়। এই কয়েকদিনে প্রত্যুষ যে খারাপ মানুষ নয় সেটুকু বোঝার মত বয়স এবং অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমার হয়েছে। তাছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে একটা মানুষের সাথে পরিচয় হল, তার সাথে বাইরেও গেলাম একদিন, ফোনে কথা বলছি প্রায়ই, এমন কি বন্ধুর মত নিজের জীবনের অতীত নিয়েও বলে ফেললাম। এখন তাকে যদি একবার নিজের বাসায় খেতে না বলি তবে সেটা অভদ্রতার চূড়ান্ত হয়ে যায় না? বিশেষ করে সে যদি একটুখানি মন ভরে ভাত খেতে না পারার কষ্টের কথা আমার কাছেই বলে? তাই আর এত সাতপাঁচ না ভেবে বলেই ফেললাম আজ। প্রত্যুষ শনিবার বিকেলের মধ্যেই ইটালি থেকে ফিরবে, রবিবার দুপুরে আমার এখানে আসবে।

 

শুক্রবার কাজ সেরে ফেরার পথে বাজারটা সেরে ফেললাম। এখন আর শনিবারে না বেড়োলেও চলবে আমার। ঘরদোর ক্লিনিং, গোছানো, রান্না, এসব শনিবারেই করে রাখতে হবে। রবিবার সকালে তাহলে আর কাজের কোন ষ্ট্রেস্‌ থাকবে না। প্রবাস জীবনে কাউকে ইনভাইট করার বড় যন্ত্রণা! একা হাতে সব করতে হয় বলে প্রতিটা মূহুর্ত হিসেব করে চলতে হয়। আমিও কখন কি করলে আমার সুবিধে হবে হিসেব করেই নিয়েছি। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এসেই ঝামেলায় পরে গেলাম। প্রত্যুষ যে কি খায় আর কি না খায় সেটা তো জানিনা আমি! আমি ভেবেই রেখেছি রিচ্‌ফুড করব না। কারণ প্রত্যুষের এখন মন ভরে ভাত খেতেই ইচ্ছে করছে, পোলাও না। কিন্তু ভাতের সাথে করতে গেলেও তো কতশত পদ আছে, আর তার সবই যে প্রত্যুষ খায় বা পছন্দ করে তা নিশ্চয়ই নয়। একবার ভাবলাম ফোন করে জিগ্যেস করি। কিন্তু পরোক্ষনেই মনে হল, জিগ্যেস করে কোন লাভ নেই। ভদ্রতা করে কিছুই বলবে না। তারচেয়ে বেটার নিজের যা কিছু করতে ইচ্ছে হয় তাই করি আমি। প্রত্যুষ খেলে ভাল, না খেলেও কোন সমস্যা নেই। আমি বরং ক’দিনের জন্য রান্নার হাত থেকে বেঁচে যাব। খাবারগুলো ফ্রিজে রেখে বেশ কয়েকদিন আরাম করে খেতে পারব।

 

রবিবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রান্নার ফিনিশিংটা দিয়ে নিলাম আগে। এরপর ঘরদোর গুছিয়ে পরিপাটি করে নিজেও শাওয়ার নিয়ে বারোটার মধ্যেই তৈরী হয়ে নিলাম। প্রত্যুষকে আমার বাসার লোকেশন আগেই ফোনে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। তবুও বলে রেখেছিলাম, চিনতে অসুবিধা হলে আমাকে যেন ফোন দেয়, আমি ফোনে ডিরেকশন দিলে তার আর পথ চিনে আসতে কষ্ট হবে না। পোনে একটা পর্যন্ত মোবাইল বাজল না, বরং একটা বাজার ঠিক দশ মিনিট আগেই ডোরবেল বেজে উঠল। কোন ফোন না দিয়েই নিজেই পথ চিনে চলে এসেছে প্রত্যুষ। আমি হাসিমুখে দরজা খুলে দিয়ে অভ্যার্থনা জানালাম। প্রত্যুষের হাতে বিশাল এক ফçাওয়ার বুকে আর বড় এক প্যাকেট চকোলেট।

 

প্রত্যুষ বাসায় ঢোকার পরে আমি দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই আমার দিকে হাসি মুখে ফুল আর চকোলেট বারিয়ে দিল প্রত্যুষ।

 

আমি হেসে উঠে বললাম, -‘আপনি দেখছি খাস ইউরোপীয়ান কায়দায় দাওয়াতে এসেছেন! কিন্তু না আমি ইউরোপীয়ান, না আপনি।’

 

-‘হুম্‌, এখন তো তাই দেখছি।

 

-‘মানে? এটা বুঝি আপনি আগে জানতেন না? এতদিন কি আপনি ভেবেছেন ইউরোপে থেকে থেকে আমি ইউরোপীয়ান হয়ে গেছি?’ আমি অবাক হই!

 

-এই কয়েকটাদিন আপনাকে জিন্‌স, শার্ট, কিম্বা টপ্‌সেই দেখেছি তাই ওরকম একটু ভাবলে কি খুব ভূল ভাবা হবে বলুন?

 

-তো আজ সেই ভূল ভাঙ্গলো বলতে চাইছেন?

 

-‘যেরকম শাড়ীতে, চুড়িতে, আর টিপে সেজেছেন তাতে আজ আর ভূল না ভেঙ্গে কোন উপায় আছে?’ প্রত্যুষ আমার দিকে স্বসংকোচ দৃষ্টিতে একবার দেখে নিয়ে আবারও বলল, -‘আজ আপনাকে একশত ভাগ বিশুদ্ধ বঙ্গললনা মনে হচ্ছে।’

 

-আপনি এমন করে ‘একশত ভাগ বিশুদ্ধ’ বললেন, নিজেকে এখন আমার সরিষার তেল মনে হচ্ছে।

 

প্রত্যুষ ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। আমিও প্রত্যুষের সাথে খানিক হাসি, হেসে ভেতরে এসে বসতে বলি। সোফায় বসতে বসতে প্রত্যুষ বলে, -‘এখন বুঝতে পারছি কেন সবাইকে ছেড়ে ছুরে এখানে বছরের পরে বছর থাকতে পারছেন আপনি!’

 

আমি অবাক হই! -‘কি বুঝলেন?’

 

-‘এই যে এত সুন্দর আবাস হলে মন কি আর না বসে পারে!’ প্রত্যুষ চোখ দিয়ে চারিদিক দেখিয়ে বলে। তারপরেই আবার বলে, -‘নাহ্‌, আপনি শুধু কথাই গুছিয়ে বলতে পারেন না, নিজগৃহও সুন্দর করে গোছাতে পারেন। আপনার আবাস সত্যিই সুন্দর! এটা কিন্তু সবাই পারে না। এটাও একটা শিল্প।’

 

-আপনি যেন সবাইকে খুব চেনেন, জানেন? অনেকেই পারে। ক’জনকে আর দেখেছেন আপনি।

 

-‘কোনকিছু বুঝতে সবটুকু দেখতে হয় না। যতটুকু দেখা হয়েছে তার মধ্যে থেকেই অনুমান করে নেয়া যায়। আমি তো এমনটা সচরাচর দেখিনি। তাই এটা বলতেই পারি আমি।’ প্রত্যুষ নিজের ধারণায় অবিচল।

 

আমি নিজের প্রশংসা শুনে আস্বস্তিবোধ করতে থাকি। প্রত্যুষকে থামাতেই বলে উঠি, -‘আমার কিন্তু সমস্তই রেডি। এখনই কি খাবার দিয়ে দেব, নাকি একটু পরে খাবেন?’

 

-সবে তো এলাম, একটু পরে খাই? নাকি আপনি আমাকে তাড়াতাড়ি করে খাইয়ে বিদায় করতে চাইছেন?

 

-কি যে বলেন না আপনি! আমি নিশ্চয়ই সেটা মিন করিনি! আমার ওভাবে বলার অর্থ হল, আপনার ক্ষিধে পেয়ে থাকলে আমি এখনই খাবার দিতে প্রস্তুত।

 

-না আমার এখনও অতটা ক্ষিধে পায়নি। আপনি বসুন তো, আপনার সাথে গল্প করি।

 

-আচ্ছা আপনাকে এখন তাহলে জুস্‌ দেই। ঘরে কমলা, আপেল, আর মিক্সড্‌ ফ্রুট্‌স জুস আছে, কোনটা দেব?

 

-এটা কি কোন জুস ফ্যাক্টরী! এত রকমের জুস কেন বাসায়?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি মনে মনে বলি, আপনি কি করে বুঝবেন এতরকমের জুস কেন বাসায়! আরে ভাই আমি কি জানি নাকি আপনি কি খান আর কি খান না? কিন্তু মুখে তো আর সেটা বলতে পারি না। তাই কোনরকমে বলি, -‘কখনও কখনও কেনা হয়ে যায়। এখন আপনি বলুন আপনার কোনটা পছন্দ?’

 

-আপনার তো জানার কথা না, আমি কিন্তু তেলাপোকা, অর্থাৎ সর্বভূক। যা খুশি দিতে পারেন আপনি। তবে আপনাদের এখানকার আপেল জুসটা বেশ ভাল লেগেছে আমার।

 

আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! মনে মনে বললাম, আপনি তেলাপোকা হওয়াতে আমি যারপর নাই খুশি। এখন আমি নিশ্চিন্েত আমার আইটেমগুলো সার্ভ করতে পারব। আমি আমাদের জন্য জুস নিয়ে ফিরে এসে দেখি প্রত্যুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার এগিয়ে দেয়া জুসের গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল, -‘আপনাদের প্রকৃতি সত্যিই সুন্দর! এই যে অক্টোবরের প্রকৃতি যেন আগুনঝরা! গাছে গাছে হলুদবর্ণ পাতাদের দেখলেই ‘‘ওরে ভাই আগুন লেগেছে বনে বনে’’ গানটা মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে।’

 

-আপনি একদম আমার মনের কথাটা বলেছেন। আমারও অক্টোবরের হলুদ প্রকৃতি দেখলেই ঐ গানটা মনে পরে যায়।

 

-‘এত হলুদ এর আগে আমি কখনও দেখিনি!’ প্রত্যুষ মু© দৃষ্টিতে বাইরে দেখতে দেখতে বলে।

 

-আসলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কাÏিট্রগুলোর সবকিছুই যেন একটু  বেশি বেশি, এক্‌ষ্টৃম!

 

-‘কেমন?’ প্রত্যুষ আমার দিকে ফিরে বলে।

 

-এই যেমন এখন গাছের পাতাদের হলুদ দেখছেন, সেটাও যেমন ভীষন একটা ব্যাপার! তেমনি সামারে যখন গাছে গাছে সবুজ পাতা থাকে তখন সেই সবুজও ভীষন! বাংলাদেশকে সবুজের দেশ বলা হয়, কিন্তু এদেশের সামার যতটা সবুজ তার পচিশভাগ সবুজও বাংলাদেশে নেই। সামারের প্রকৃতি পুষ্পে, পত্রে পল্লবিত হয়ে ভীষন জীবন্ত! অথচ শীতে শুধুমাত্র ক্রিস্‌মাস ট্রি আর পাইন গাছেই পাতা থাকে, এছাড়া অন্যসব গাছের সমস্ত পাতা ঝরে গাছগুলো যেন কংকালের মত দাঁড়িয়ে থাকে। তাই শীতের প্রকৃতি ভীষন মৃত! সামারে রঙ্গিন প্রকৃতি যেমন স্বর্গের মত সুন্দর, শীতের তুষারে ঢাকা শুভ্র প্রকৃতিও তেমনই ভয়ানক স্বর্গিয়! সামারে নাতিশীতোষ- আবহাওয়া যেমন ভীষন আরামদায়ক, শীতে হারকাঁপানো ঠান্ডা ততটাই ভয়ংকর! আবার শীতের দিনগুলো ভীষন ছোট, সকাল হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার আগেই তিনটা বাজতে না বাজতেই রাত নেমে আসে। ওদিকে সামারের দিনগুলো ভীষন বড়! সূর্য্য প্রায় কখনোই ঢোবে না। ঘড়ি দেখে রাত কিনা বুঝে নিতে হয়। ঘড়ির হিসেবে যখন রাত এগারোটা তখন কেবল সন্ধ্যা নামে। আবার সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত ঘন হবার আগেই একটার দিক থেকেই ভোরের আলো ফুটে ওঠে। সূর্য্য যেন যেতে গিয়েও মত পালটে আবারও পৃথীবির কাছে ফিরে আসে। সূর্য্য আর পৃথীবির এমন প্রেম দেখতে হলে আপনাকে ইউরোপের এদিকটায় আসতেই হবে।

 

-‘সত্যিই প্রকৃতি যেভাবে মানুষকে মু© করতে পারে সেভাবে আর কিছুই মানুষকে মু© করতে পারে না!’ প্রত্যুষ বাইরে থেকে চোখ না সরিয়েই বলে।

 

আমার ঘড়ির দিকে চোখ পরতেই দেখি দুটো বাজতে তেরো মিনিট বাকী। আমি আর কথা বাড়াই না। এবার আর প্রত্যুষের বলার অপেক্ষাও করিনা, নিজেই এবার খাবার দেবার কথা বলি। প্রত্যুষ আমাকে হেল্প করতে চায়। আমি তাকে জানিয়ে দেই, তাতেই বরং আমার আরও দেরী হয়ে যাবে। আমি আসলে নিজের মত করে গুছিয়ে কাজ করতেই পছন্দ করি। প্রত্যুষকে দেখার জন্য একটা মুভি চালিয়ে দিয়ে আমি কিচেনে আসি।

 

সমস্ত খাবার গরম করে টেবিল সাজিয়ে প্রত্যুষকে খেতে ডাকলাম। প্রত্যুষ টেবিলে খাবারের সমারোহ দেখে চোখ কপালে তুলে বলল, -‘আপনি এসব করেছেন কি! এত খাবার? একা আমার জন্য? আমি সর্বভূক হতে পারি, তাই বলে খাদক তো নই!’

 

-আপনি যে তেলাপোকার মত সর্বভূক সেটা তো আর আমার জানা ছিল না। কোনটা খান আর কোনটা খান না তার সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলনা বলেই যতটা পেরেছি করেছি। এই ভরষায় যে এতগুলোর মধ্যে অন্তত কয়েকটা নিশ্চয়ই আপনার পছন্দের সাথে মিলে যাবে। আর ভাত করেছি অনেকদিন আপনার ভাত না খেতে পারার দুঃখের কথা মাথায় রেখেই।

 

-‘অপরাজিতা, আমি সত্যি অভিভূত!’

 

প্রত্যুষের ক¥ শুনেই সেটা বুঝতে পারি আমি।

 

প্রত্যুষ এবার বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলে, -‘আপনি তো রাঁধেনও খুব ভাল!’

 

-আপনি না খেয়েই খুব বুঝে গেলেন আমি রাঁধি ভাল?

 

-আরে রং আর গন্ধেই খাবারের গুন বোঝা যায়। নিশ্চিত হওয়া যায় খাবারটা স্বাদ হয়েছে কিনা।

 

-তাই নাকি?

 

-নিশ্চয়ই! যেমন ধরুন একটা পাকা আমের রং আর গন্ধেই কিন্তু আপনি বুঝে যাবেন আমটা মিষ্টি হবে কিনা। ঠিক কিনা বলুন?

 

-হুম্‌, আমটার রং আর গন্ধে সেটা খেতে মিষ্টি হবে কিনা তা বোঝা যাবে ঠিকই, কিন্তু আমটার ভিতরে পোকা আছে কিনা সেটা কিন্তু বোঝা যাবে না, সেটা বোঝা যাবে খেতে গিয়েই। আমার রান্নার ক্ষেত্রেও আপনার ধারণা ভূল হয়ে যেতে পারে।

 

-আচ্ছা আপনার সমস্যাটা কি বলুন তো? আপনার কি প্রশংসায় এলার্জি?

 

-‘মানে?’ আমি অবাক হই!

 

-না, এসে থেকেই দেখছি আপনার প্রশংসা করলেই আপনি সেটাকে ভূল প্রমানিত করতে উঠে পরে লাগছেন। তাই জানতে চাইছি আপনার প্রশংসায় এলার্জি আছে কিনা?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি হেসে ফেলি। বলি, -‘প্রশংসায় এলার্জি নেই, তবে সাইড এফেক্ট আছে।’

 

-‘মানে?’ এবার প্রত্যুসের অবাক প্রশ্ন।

 

-মানে কেউ এত প্রশংসা করলে খুব অস্বস্তি হয়, কিছুটা লজ্জাও লাগে। এটা তো প্রশংসার সাইড এফেক্টই তাইনা?

 

-‘হুম্‌! তবে এরকম সাইড এফেক্টে কিন্তু প্রশংসার মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।’

 

আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতেই বলে প্রত্যুষ। আমি অর্থটা বুঝিনা।

 

-মানে?

 

-মানে এরকম সাইড এফেক্টে মেয়েদের সৌন্দর্য্য আরও অনেক বেড়ে যায়। ফলে প্রশংসাও আরও বেড়ে যাবে, তাইনা?

 

আমি হেসে ফেলি।

 

-‘আপনি কিন্তু সাইড এফেক্ট বাড়াচ্ছেন।’ হাসতে হাসতে বলি আমি।

 

-তাহলে আর কি, প্রশংসাও বাড়তেই থাকবে।

 

কাঁধ ঝাকিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে কথাটা বললো প্রত্যুষ যে এবার দুজনেই একসাথে হেসে উঠি।

 

-‘আচ্ছা আমার জন্য কি শুধু অর্ধভোজনই বরাদ্দ?’ প্রত্যুষ হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে বলে।

 

-‘তা হবে কেন?’ আমি আবাক হই!

 

-কিন্তু তাই তো মনে হচ্ছে। ঘ্রানে নাকি অর্ধভোজন হয়। সেই থেকে তো আমি কেবল খাবারগুলোর ঘ্রাণই পাচ্ছি, এখনও তো টেবিলেই বসতে বলা হল না আমাকে।

 

আমি ব্যস্ত হয়ে বলি, -‘ছি! ছি! তাই তো! আপনি বসুন প্লিজ!

 

 

 

 

খাবার শেষে লিভিংরুমে ফিরে আসার পরে প্রত্যুষ বলল, -‘সত্যি, দেশ থেকে আসার পরে এই এতদিনের মধ্যে আজ আমি সত্যিই মনভরে খেলাম। এতটাই মন ভরেছে যে গত কয়েকদিনের ভাত না খাবার কষ্ট সুদসমেত উশুল হয়ে গেছে। আজকের এই খাবারের তৃপ্তির কথা আমার মনে থাকবে।’

 

-জেনে ভাল লাগছে।

 

-‘আমার এখন কি ইচ্ছে করছে জানেন? ইচ্ছে করছে এখনই মাকে ফোন করে আজকের দিনটার কথা বলি।’ ছেলেমানুষের মত করে বলে প্রত্যুষ।

 

-কেন? বলার মত তো এমন কোন বিশেষত্ত্ব নেই আজকের দিনটায়?

 

-নিশ্চয়ই আছে।

 

-কেমন?

 

-আমার মা জানেন দেশের বাইরে এলে আমি ভাল থাকি না, ঠিকমত খেতে পারিনা। তাই আমি দেশের বাইরে এলে আমার মা’ও ভাল থাকেন না। কাজেই আজকের দিনটা আমি খুব ভাল কাটিয়েছি জানলে, মনভরে খেয়েছি জানলে আমার মা’র মনটাও আজ ভরে যাবে। আমার মা আমার বন্ধুর মত। আর সেজন্যই আমি যে কোন আনন্দ, ভাললাগাই মায়ের সাথে শেয়ার না করে থাকতে পারিনা।’ কথাগুলো বলে মুহূর্তকাল থেমেই প্রত্যুষ জিগ্যেস করল, -‘আপনি কি কিছু মনে করবেন আমি যদি আপনার এখান থেকেই মাকে ফোন করি?

 

-না না, কিছু মনে করব কেন? আপনি করুন প্লিজ্‌!

 

আমি উঠে গিয়ে কর্ডলেস ফোন আর দেশে কল করার কার্ড এনে দেই। ওগুলো আনতে দেখেই প্রত্যুষ বলে ওঠে, -‘ওসবের প্রয়োজন নেই। আমার কাছে দেশে কল করার কার্ড সবসময়ই থাকে। আমি মোবাইল থেকেই কার্ড ইউজ করে কল করি।’

 

মাকে ফোন করে প্রত্যুষ। কেউ তার কাছের মানুষকে ফোন করলে সেখানে থেকে তার কথা শোনাটা কোন শোভন কাজ নয়। আমি তাই প্রত্যুষকে কথা বলার প্রাইভেসি দিয়ে কিচেনে চলে আসি। দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে এই সময়টায় আমি ডিস্‌ ওয়াশের কাজটা এগিয়ে রাখি। মিনিট পনেরো পরে প্রত্যুষ হঠাৎ আমাকে ডেকে বলে, -‘আমার মা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান।’

 

কথাটা শুনে আমি যেমন অবাক হই, তেমনই অস্বস্তিতে পরি। ওনার মায়ের সাথে আমি তো পরিচিতই নই, কি কথা বলব হঠাৎ আমি? তাও আবার না দেখেই, ফোনে? কিন্তু এখন তো না বলারও কোন উপায় নেই। আমি তাড়াতাড়ি ভেজা হাত মুছে প্রত্যুষের হাত থেকে ফোনটা নেই।

 

-‘হ্যালো! অপরাজিতা মা, কেমন আছ তুমি?’ ওপ্রান্ত থেকে প্রত্যুষের মা’ই প্রথম কথা বলেন।

 

কোন অদেখা, অচেনা মানুষ যে এমন কাছের মানুষের মত, এত আপন করে কথা বলতে পারেন আমি এর আগে কখনোই জানতাম না। আমি বিষ্ময়ে এতটাই অভিভূত হয়ে যাই যে কিছু মূহুর্ত আমি কোন কথাই বলতে পারি না। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে ওনাকে সালাম জানাই। বলি,

 

-আমি ভালো আছি। আপনি ভালো তো খালাম্মা?

 

-ছেলেকে দেশের বাইরে নিজের কাছে থেকে এতদূরে পাঠিয়ে আমি আর ভাল থাকি কি করে মা! তাও আবার সামনে ঈদ, অথচ ছেলেটা আসবে ঈদের ঠিক আগেরদিন। এর আগে কিছুতেই নাকি টিকেট পাওয়া গেল না। ভাল লাগে বল?

 

-সে তো নিশ্চয়ই!

 

আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই উনি আবার বলে ওঠেন, -‘প্রত্যুষ তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রোজই ফোন করলে তোমার কথা কিছু না কিছু বলেই। তুমি মা আমার ছেলেটার জন্য অনেক করছ!’

 

আমি ভীষন লজ্জা পেয়ে যাই। বলি, -‘উনি আপনাকে শুধু শুধু বাড়িয়ে বলেন।’

 

-না মা, আমার ছেলে কোন কিছু বাড়িয়ে বলার ছেলে না। যেখানে বলার মত কিছু থাকে না সেখানে সে কিছু বলতেই পারেনা। আবার যেখানে বলার মত কিছু থাকে সেখানে না বলেও থাকতে পারে না। এজন্য অনেকেই অবশ্য ভূল বোঝে ওকে। কেউ ভাবে ও খুবই ভাল, আবার কেউ ভাবে ও অহংকারী।

 

-জ্বি! স্পষ্টভাসিদের সমালোচনার মুখে পরতে হয় সবসময়।

 

প্রত্যুষের মা প্রসঙ্গ পালটে বলেন, -‘তুমি মা ঐ দূরদেশে একা একা থাক,  দেশের জন্য, সবার জন্য মন কেমন করে না? ভাল লাগে ভিনদেশে, ভিনদেশিদের মধ্যে থাকতে?’

 

-দেশের জন্য মন তো খারাপ হয়ই। কিন্তু কি করব, খারাপ লাগলেও থাকতেই হয়।

 

-‘কেন মা, পরিবার পরিজন সবাইকে ছেড়ে মন খারাপ নিয়ে, কষ্ট নিয়ে নিজ দেশ থেকে অত দূরে থাকতে হবেই কেন? যেসব মেয়েদের স্বামী সংসার, ছেলেমেয়ে আছে তারা নয় কেউ স্বামীর ইচ্ছেতে বা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য বাধ্য হয়ে থাকে। কিন্তু তোমার তো কোন পিছুটান নেই, তুমি কেন শুধু শুধু মনের মধ্যে কষ্ট নিয়ে বিদেশে পরে থাকবে? একটাই তো মাত্র জীবন, আর সেই একমাত্র জীবনটা কিনা পরদেশে, পরের মধ্যে, পর পর অনুভূতি নিয়ে কাটাবে? দেশের সন্তান দেশে ফিরে পরিবার পরিজন নিয়ে বাবা মায়ের আদরে জীবনটা কাটাও। তবেই না জীবনের সব সুখ, সব আনন্দ।’ প্রত্যুষের মা এবার একটু থেমে ব্যস্ত হয়ে বলেন, -‘দেখ দেখি, তোমার সাথে আজ সবে পরিচয় হল আর আজই কিনা আমি তোমাকে কতগুলো উপদেশ দিয়ে দিলাম। তুমি কিছু মনে করনি তো মা?’

 

আমি কি করে বোঝাব ওনাকে এরকম কথা শোনার জন্য আমার দু’কান, আমার হূদয়, আমার আত্মা, আমার সমস্ত চেতনা কতকাল ধরে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আমার পরিবার পরিজন কেউ গত আটটা বছরে কখনোই আমাকে এভাবে বলেনি। আমার ভেতরটা তোলপাড় করে। আমি শুধু বলতে পারি, -‘না, না, আমি কিছু মনে করিনি।’

 

-আসলে কি জানো মা, মেয়েদের বয়স ষাটের ঘরে চলে এলেই তোমাদের মত সবাইকে নিজের সন্তান মনে হয়। তাই সুযোগ পেলেই মা’গিরি করে ফেলি। তুমি কিছু মনে কর না মা গো। তবে আমি তোমাকে যা বলেছি সেটা নিজের অন্তর থেকেই বলেছি। আমার কাছে যা সঠিক মনে হয়েছে তাই বলেছি। তুমি আমার মেয়ে হলে আমি কিছুতেই তোমাকে এভাবে অতদূরে, একা একা থাকতে দিতাম না।

 

এরপরে প্রত্যুষের মায়ের সাথে সামান্যই কথা হয়। প্রত্যুষ আরও অনেকটা সময় থাকে। বিকেলে আবার একপ্রস্থ চা নাস্তা খাওয়া হয়। রাত সারে আটটার দিকে প্রত্যুষ চলে যাবার সময় তাকে কিছু খাবার বক্সে করে দিয়ে দেই আমি। রেষ্টহাউসে তার রুমে মাইক্রো ওভেন আছে, রাতে গরম করে খেতে পারবে। প্রত্যুষকে বিদায় দেয়া পর্যন্ত আমি যন্ত্রচালিতের মত সবকিছু করে গেছি। প্রত্যুষের সাথে কথা বলেছি, হেসেছি, তাকে খাবার তুলে তুলে দিয়েছি। সবই করেছি আমি তার সাথে থেকে। কিন্তু তবুও আমি যেন তার সাথে ছিলাম না। আমার ভদ্রতা, কর্তব্যবোধ, দায়িত্ত্ব আমাকে দিয়ে এসব কাজ করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমার মন, আমার অনুভব জুড়ে তখন কেবল একটাই কথার অনুরণন ‘‘তুমি আমার মেয়ে হলে আমি কিছুতেই তোমাকে এভাবে অতদূরে, একা একা থাকতে দিতাম না।’’

 

 

 

 

প্রত্যুষ চলে গেছে অনেকক্ষন। সে চলে যেতে দরজা বন্ধ করে আমি এই সোফাটায় এসে বসেছিলাম। তারপর কখন, কিভাবে যে দু’টো ঘন্টা চলে গেছে আমি জানি না। আমার চারপাশ, জগৎ সংসার সব মিথ্যে হয়ে গেছে যেন! আমি স্থানুর মত বসেই থাকি। আমার ভাবনাও আর সুক্ষভাবে কাজ করে না এখন। মনের মধ্যে আমার কেবল ছোট্ট একটা জিজ্ঞ্যাসা, ‘আমার মা কেন প্রত্যুষের মায়ের মত হল না?’ আমার মা প্রত্যুষের মায়ের মত হলে তো আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে যেত না!

 

 

 

১৩

মানুষের ভাবনার আকাশে যখন ঝড় ওঠে তখন বাইরের মানুষ ততটাই শান্ত হয়ে যায়। আমিও গত দু’দিন ধরে ভীষন শান্ত, ভীষন ধীর, সমাহিত হয়ে আমার করণীয়গুলো করে যাচ্ছি। কাজে যাচ্ছি, সেখানে আমার যা কিছু দায়িত্ত্ব সেগুলো যথাসাধ্য করে যাচ্ছি। আবার ঘরে ফিরে নিজের জন্য রাধছি, খেতেও বসছি। কিন্তু আগে যে খাবার আমি পনেরো/বিষ মিনিটে খেয়ে উঠতাম, এখন ঘÏটা কাটিয়েও আমি সেই খাবার খেতে পারছি না। রাতেও আমার ভাবনারা এতটুকু ক্লান্ত হয়না, তারা অবিরাম আমার মনের মধ্যে চলতেই থাকে।

 

গত আটটা বছর ধরে যে আমি নানান কষ্ট, অপমান, হতাশা, দুঃখ আর একাকিত্ত্বকে অভিমানের আবরণে ঢেকে এই তুষারের দেশে থেকে থেকে আমার মনকেও তুষারখন্ডের মতই শীতল, শান্ত আর শক্ত করেছিলাম, প্রত্যুষের মায়ের সেদিনের কথাগুলো সেই আমার মনকেই আবারও অশান্ত করে দিয়েছে, ভীষন অশক্ত করে দিয়েছে। এখন আর আমি আগেরমত করে ভাবতেও পারছিনা। আগেও যে আমি নিজের কাছে খুব পরিষ্কার ছিলাম তাও নয়। কিন্তু তবুও এটুকু জানতাম আমার পরিবারের ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে যাব, সে নিজের যত কষ্টই হোক। বরং এই ভাবনাটাই আমাকে আমার নিজের জন্য ভাবতে দেয়নি কখনও। আমি কখনোই যেন ভেবে দেখিনি আমি নিজে কি চাই। কিম্বা বলা যায়, আমি যা চাই তেমন একটা জীবন পেতে আমার কি করণীয় বা আমার কোন করণীয় আছে কিনা সেটা নিয়ে আমি কখনোই নিজের সাথে কথা বলিনি। প্রত্যুষের মায়ের কথাগুলো শোনার পরে মনে হচ্ছে এতকাল আমি নিজের সাথে কথা কেন বলিনি? কেন একবারও নিজের মুখোমুখি হইনি? আমার জীবনের উপরে আমার বাবা, মা, পরিবারের অধিকার আছে সেটা যেমন সত্য, তার চেয়েও তো বড় সত্য আমার জীবনটা আমারই। আমার জীবনের দুঃখ বেদনায় বাবা মা’ও নিশ্চয়ই দু;খিত হবেন, কষ্ট পাবেন, কিন্তু আমার মত করে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবেন কি? এই যে তারা মনে করছেন আমাকে আবার একটা বিয়ে দিলেই আমার জীবনে যা কিছু ঘাটতি সব পূরন হয়ে যাবে। কিন্তু আমার জীবনে আসলেই যে কিসের কিসের ঘাটতি, কি পেলে আমার জীবনের সমস্ত ঘাটতি পূরন হয়ে যাবে সেটা তো আমার মত করে তারা জানেন না, বোঝেন না, বোঝার কথাও না। তবে আমি কেন নিজের জন্য এটুকু বুঝে দেখিনি এতকাল? কেন এভাবে নিজের সাথেই নিজে লুকোচুরি খেলেছি আমি? আমি তো কোন অন্যায় করিনি বা নিজ থেকে কোন ভূল! তবে কেন আমি এভাবে ফেরারী হয়ে বছরের পর বছর দ্বীপান্তরিত জীবন কাটাচ্ছি? কেন কাটাব আমি এই ফেরারী জীবন? কেন কিসের দায় আমার? কেন আমি আমার নিজের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না? কেন আমি থাকব এখানে? আমার তো কোন পিছুটান নেই, দায়বদ্ধতা নেই! একবারও আমি নিজেই কেন বলিনি আমি ফিরে আসতে চাই? এটা বলার এবং নিজদেশে ফিরে যাবার অধিকার তো আমার চিরকালের, তবে অযথা অভিমানে অন্যের বলার অপেক্ষায় থেকেছি কেন আমি?

 

গত আটটা বছর আমি নিজের জন্য কোন সিদ্ধান্তই নিতে চাইনি। কিন্তু আজ যখন আমি আমার মুখোমুখি হয়েছি, আজ যখন আমি নিজেই নিজের জন্য ভাবতে চাইছি, সিদ্ধান্ত নিতে চাইছি তবে আর অযথা সময় নেয়া কেন! আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

 

আজ রাতে অনেকদিন পরে সাধ্য সাধনা ছাড়াই আমার ঘুম চলে আসে।

 

 

 

 

 

সকালে কাজে যাই। গিয়ে অসুস্থতার কথা বলে তিনদিনের ছুটী নেই। আমার ডেস্কমেট এমা আমাকে ছুটীর আবেদন লিখতে দেখে ভুরু নাচিয়ে জিগ্যেস করে, -‘কি ব্যাপার, ছুটীর কারণ অসুস্থতা লিখছ, কিন্তু তোমাকে দেখে তো মোটেও অসুস্থ মনে হচ্ছে না?’

 

আমি লিখতে লিখতেই জবাব দেই, -‘সব অসুস্থতা কি বাইরে থেকে চোখে দেখা যায়?’

 

এমা এবার ঝুঁকে পরে আমার কাছাকাছি মুখ এনে উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে, -‘হেই! আর ইউ প্রেগ্‌ন্যাÏট?’

 

এমা’র প্রশ্ন শুনে আমার কলমই এবার চম্‌কে উঠে লেখা থামিয়ে দেয়। আমার অবস্থাও তথইবচ! আমি রাগী গলাতেই এমাকে বলি,

 

-তুমি জান না আমি সিঙ্গেল?

 

এমা চোখ কপালে তুলে বলল, -‘সিঙ্গেল হবার সাথে প্রেগ্‌ন্যাÏট না হবার সম্পর্ক কি?’

 

আমার আর এমা’র সাথে এই নিয়ে কথা বাড়াতে ভাল লাগে না। এদেশীয় কালচারে বড় হওয়া এমাকে সিঙ্গেল হবার সাথে প্রেগ্‌ন্যাÏট না হবার সম্পর্ক বোঝাতে গেলে আজ আর আমার ছুটী নিয়ে কোন লাভই হবে না। ওকে এটা বোঝাতে বোঝাতেই আমার সারাদিন কেটে যাবে, যে কাজের জন্য ছুটী নেয়া তার কিছুই হবে না। আমার লেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পেপারটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমি শুধু বললাম, -‘তোমার সাথে আমার যে সম্পর্ক!’

 

আমার কথার অর্থ না বোঝা এমা’র বোকা চেহাড়ায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের সামনে দিয়ে আমি চিফ্‌ এর ঘরে গিয়ে ঢুকি। ছুটী মঞ্জুর করিয়ে আমি আর দেরী করিনা সোজা চলে যাই এজাজ ভাইয়ের অফিসে। এজাজ ভাই একজন পাকিস্তানী। ওনার ট্রাভেল এজেন্‌সি থেকেই আমি গতবার দেশে যাবার সময় টিকেট নিয়েছিলাম। এছাড়াও ওনার স্ত্রীর সাথেও আমার আলাদা করে পরিচয় আছে। ইন্‌ফ্যাক্ট ওনার স্ত্রীর মাধ্যমেই বরং ওনাকে চেনা আমার। ওনাদের বাড়ীতেও কয়েকবার গিয়েছি আমি।

 

ঈদের আর মাত্র নয়দিন বাকী। এখন টিকেটের আশা করা মানে পাগলামি। কিন্তু এজাজ ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ত্বসুলভ সম্পর্কের ভরষাতেই আমি ওনার কাছে এসেছি। আমার ঈদের আগেই টিকেট লাগবে শুনে এজাজ ভাই তো প্রথমে এত দেরীতে আসার জন্য একটু অনুযোগ করলেন। কিন্তু আমি যখন তাকে বুঝিয়ে বললাম, এই যাবার সিদ্ধান্তটা বিশেষ প্রয়োজনে হঠাৎ করে নেয়া তখন তিনি বললেন, তাহলে তো ওনাকে একটা ব্যবস্থা করেই দিতে হয়। যদিও আজই উনি আমাকে ফাইন্যাল কিছু জানাতে পারলেন না। তবে যে কোন উপায়ে উনি আমার জন্য একটা টিকেটের ব্যবস্থা করে দেবেনই এমনটা আশ্বাস দিলেন। আমি একটু দুশ্চিন্তা নিয়েই বাসায় ফিরে এলাম। আমার এখন অনেক কাজ, কিন্তু টিকেটের ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তো সেসব শুরু করা যাচ্ছে না। কি করি এখন! কাজ থেকে ছুটী নিয়ে দেখছি কোন লাভই হল না!

 

সারাদিন কিছু না করেই কেটে গেল। বিকেলের দিকে ভাল লাগছিল না বলে শুয়েছিলাম। এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। নাম্বারটা ঠিক চিনতে পারলাম না। কিন্তু রিসিভ করতেই মনের মধ্যে কিছু একটা যেন লাফিয়ে উঠল। এজাজ ভাই ফোন করেছে। তার মানে টিকেটের ব্যবস্থা কি হয়ে গেছে!

 

এজাজ ভাই জানালেন সোমবার কাতার এয়ার্লাইনসে তিনি আমার জন্য টিকেটের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আমি তো আনন্দে প্রায় আত্মহারা। ডাবল সিটের দুটোই এ্যাভেইলেবল্‌, যে কোনটা নিতে পারি আমি। এজাজ ভাই জানতে চাইলেন আমি কোনটা চাই, জানালার ধারেরটা, নাকি প্যাসেজের পাশেরটা। সোমবার, মানে ঈদের তিনদিন আগেই দেশে পৌঁছে যাওয়া যাবে। হঠাৎ করেই আমার প্রত্যুষের কথা মনে পরে। প্রত্যুষও তো কাতারেই এসেছে! সে নাকি বাধ্য হয়েই ঈদের আগেরদিন ফিরছে, এর আগে নাকি কোনভাবেই সে ব্যবস্থা করতে পারেনি। সব নাকি বুক্‌ড ছিল। প্রত্যুষের সাথে কথা বলা দরকার। যদিও সে এখন এখানে নেই, পাশের আরেক দেশে গেছে। আমি এজাজ ভাইকে বলি ডাবল সিট্‌ দুটোই আমার জন্য রাখতে। আমি ওনাকে কিছুক্ষনের মধ্যেই ফোন করে সব ফাইন্যাল করছি।

 

এজাজ ভাইয়ের সাথে কথা শেষে ফোন রেখেই আমি প্রত্যুষকে ফোন করি। আমি দেশে যাচ্ছি শুনে প্রত্যুষ প্রথমে ভীষন অবাক! হঠাৎ কখন এই সিদ্ধান্ত নিলাম জানতে চাইল। কিন্তু আমার তো এখন এতসব বলার কোন সময় নেই। আমি তাকে জরুরী কথাটাই আগে বললাম। আমার কথা শুনে প্রত্যুষ তো যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল। তার কাজ নাকি এই শুক্রবারের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। শুধুমাত্র এর আগে টিকেট পায়নি বলেই পরের বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত শুধু শুধু তাকে থাকতে হত এখানে। এখন যদি আগেই টিকেট পাওয়া যায় তবে তো ভাবাভাবির প্রশ্নই ওঠেনা, একশভাগ নিশ্চিত সে আগের ফçাইটেই যাবে। যদি একস্‌ট্রা পে করেও যেতে হয় তবুও সে আগেই যেতে চায়। প্রত্যুষের সাথে কথা বলে আমি সাথে সাথেই এজাজ ভাইকে ফোন করি। ওনাকে প্রত্যুষের ব্যাপারটা খুলে বলি। উনি বললেন প্রত্যুষের টিকেট পালটে এগিয়ে আনা খুব একটা সহজ কাজ না। তবুও তিনি দেখছেন কতদূর কি করতে পারেন।

 

ঘÏটাখানেক পরেই এজাজ ভাই আবার ফোন করলেন। জানালেন প্রত্যুষের ব্যাপারটা উনি ঠিক করে ফেলেছেন। আমার যে এখন কি ভাল লাগছে! ভাল লাগছে এই জন্য যে প্রত্যুষ দু’দিন আগে গেলে তার মা ভীষন খুশি হবেন, কল্পনায় ওনার আনন্দে ভাসা অবয়বটার কথা ভেবেই আমারও ভাল লাগছে। তবে এটা কেবল এজাজ ভাই ছিলেন বলেই সম্ভব হল। কে জানে উনি কিভাবে ম্যানেজ করেছেন! আমি এজাজ ভাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। উনিও আমার জন্য কাজটা করে দিতে পেরে ভালবোধ করছেন। উদার হাসি হেসে আমাকে বললেন,

 

-বাজি, আব আপকো ফিকর কারণে কে লিয়ে কুছ নেহি রাহা। আপ বাস আপনা লাগেজ প্যাক কারণা সুরু কার দিজিয়ে।

 

শুক্রবারে আমি টিকেট আনার জন্য ওনার ওখানে যেতে চাইলে উনি বললেন সেটারও প্রয়োজন নেই। শনিবারে আমার এই এলাকাতেই নাকি ওনাদের দাওয়াত আছে। উনি সেই সময়ই আমার কাছে টিকেট হ্যান্ডওভার করবেন, টাকাটাও তখন দিয়ে দিলেই হবে।

 

আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল!

 

প্রত্যুষকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম সোমবার আমাদের যাওয়া ফাইন্যাল। আমি এবার আমার কাজগুলোতে মনোযোগ দিতে পারি। আমাকে এভাবে যেতে হলে কিছু অফিসিয়াল কাজ করে যেতে হবে। আজ তো আর সেসব হবে না, বিকেল গড়িয়ে গেছে। আজ বরং যতটা পারি ঘরের কাজ এগিয়ে নেই।

 

ঘরে এটা সেটা কাজ করতে করতে হঠাৎই মনে হল, আচ্ছা এই যে আমি আমার এতদিনের গোছানো একলার সংসার ফেলে চলে যাচ্ছি আমার কি একটুও কষ্ট হবে না? এই যে নিজে একটা একটা করে কিনে কিনে নিজের হাতে গোছানো সব, এর সব কি আর আমি নিয়ে যেতে পারব! আমার কি এসবের জন্য মায়া লাগবে না? মনের ভেতরে একটু যেন মুচ্‌রে ওঠে। আমার ছোট্ট আবাসটুকুর জন্য নিশ্চয়ই আমার কষ্ট হবে। এতগুলো বছর এখানে দিবারাত্রি কাটিয়েছি আমি। ক্লান্ত অবস্থায় এঘরই আমাকে প্রশান্িতর ছাঁয়া দিয়েছে, আরাম দিয়েছে। শীতে উষ-তা দিয়েছে। এই ঘরের কাছে আমি একটু হলেও তো ঋণী। অনেক আগে কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষ যেখানে একটা রাত্রিও যাপন করে সেখানকার জন্যই তার মায়া জন্মে যায়। আমি তো এই বাসায় মাত্র একটা রাত্রি না পাঁচ বছরেও বেশি সময় ধরে থেকেছি। আমার মায়া তো তাহলে আরও বেশিই হবার কথা!

 

শুক্রবার দুপুরের মধ্যে আমি অফিসিয়াল কাজগুলো সেরে ফেলি। কাজে গিয়ে জানিয়ে দেই আমি আর কাজটা করছি না। আমার এই ফç্যাটের জন্য আপাতত ছয় মাসের ভাড়া ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়েছি। এই ছয়মাসের মধ্যে একবার এসে আমার যা কিছু নেবার নিয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে গেলেই হবে। আপাতত ছয়মাসের জন্য তো নিশ্চিন্ত। আমার যাবতীয় জিনিষপত্র নিয়ে আমার নামে এই বাসা ছয়টা মাস নিরাপদেই থাকবে। এসব সেরে আমি বাবা, মা, ভাইবোনের জন্য কিছু কেনাকাটাও করে ফেললাম। আর হয়তো কখনও এদেশ থেকে তাদের জন্য কিছুই কেনা হবে না আমার!

 

এই ঘরদোর ফেলে যাব বলেই তাকে তো আর যেন তেন করে ফেলে যাওয়া যায় না। অনেকগুলো মাস এই ঘরদোর বন্ধ হয়ে পরে থাকবে বলেই আরও বেশি ভাল করে পরিষ্কার করে রেখে যাওয়া উচিত বলেই মনে করি আমি। শনিবার বিকেলের মধ্যে পুরো বাসাটা ঝকঝকে পরিষ্কার করে কোনটা কোথায় কিভাবে রেখে যাব সম্পূর্ণ গোছানো হয়ে গেল আমার। আমার বাসায় বেশ কিছু প্ল্যাÏটস্‌ আছে। এগুলো তো আর ছয়মাস পানি ছাড়া বাঁচবে না। তাই উপরের দশতলার ঐ সদাহাস্যময়ী ফুলপ্রেমী প্রতিবেশীনিকে প্ল্যাÏটগুলো দিয়ে দিলাম। সে তো ভয়ানক খুশি। সে তো জানেনা ওগুলো দিয়ে দিতে কতটা কষ্ট লাগছে আমার।

 

রাতে নিজের সাথে করে কি কি নিয়ে যাব সেসবও গুছিয়ে ফেললাম। এরই মধ্যে এক ফাকে এজাজ ভাইরা দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আমার বাসায় এসে টাকা নিয়ে টিকেট দিয়ে গেলেন। আমি প্রত্যুষকে জানিয়ে দিলাম, টিকেট আমার হাতে এসে গেছে।

 

আমার যা যা করণীয় সবই করলাম, কিন্তু দেশে ফোন করে আমার যাবার কথাটা কাউকে জানালাম না আমি। ইচ্ছে করেই। এই ইচ্ছেটা কেন হলো জানিনা আমি, তবে এই ইচ্ছেটাকেই সঠিক মনে হচ্ছে।

 

রোববার সকালে তেমন আর কোন কাজই করার মত বাকী রইল না আমার। হঠাৎ মনে হল এমার্জেন্‌সি কিছু ঔষধ সাথে করে নেয়া প্রয়োজন, কিন্তু ঘরে তেমন কোন ষ্টক নেই। চট্‌ করে বেড়িয়ে গিয়ে কাছেই দোকান থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে ফেরার পথে একবার ভাবলাম, নিজের জন্য কিছু কিনব কিনা! কিন্তু ভাবতে গিয়েই মনে হল, কি হবে আর এদেশি জিনিষ ব্যবহারের অভ্যেস বাড়িয়ে। আমাকে তো শুধু এদেশ, এদেশে আমার এতদিনের একলার সংসার ফেলেই যেতে হবে না, সেই সাথে এদেশের জীবন যাপনের যাবতীয় অভ্যেসও ফেলেই যেতে হবে। অভ্যেসটাকে সাথে করে নিয়ে গেলে আমি বরং দেশে গিয়ে কষ্টই পাব।

 

 

 

১৪

আমার আর প্রতুষের চেকিং হয়ে যেতেই ভীড় থেকে সরে গিয়ে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম আমরা। এখন বেশ হালকা লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে সবকাজ শেষে এবার যেন ছুটী হয়েছে আমার। আমি একটু আরাম করে বসার চেষ্টা করি। হঠাৎ মনে হল এখন একটু কফি হলে বেশ হত। আমি এটা ভাবতে না ভাবতেই আমাকে ভীষন অবাক করে দিয়ে প্রত্যুষ বলে উঠল, -‘আপনি এখানে বসুন, আমি দেখি একটু কফি পাই কিনা।’

 

আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রত্যুষ সামনের একজন ষ্টাফের দিকে এগিয়ে গেল। ওদের মধ্যে কিছু কথা হতেই ষ্টাফ ভদ্রলোকটি হাত দিয়ে একটা দিক দেখিয়ে দিল। ওদিকেই মনে হয় কফি পাওয়া যাবে। আমি বসে বসে প্রত্যুষের যাওয়া দেখি। কিন্তু আমার মন চলে যায় আমার এখানকার ফেলে আসা বাসায়। কষ্ট লাগে আমার। কিন্তু শুধু বাসাটার জন্যই কষ্ট লাগে আমার! আর কোন কিছুর জন্য বা এই দেশ ছেড়ে যাচ্ছি বলে তেমন কোন কষ্ট হয়না আমার। আমি মনে মনে ভাবি, এটুকু কষ্ট তো লাগবেই। নিজের দেশের মধ্যেও মানুষ যখন একবাসা থেকে আরেক বাসায় শিফ্‌ট করে তখন কি তার পূরোন বাসাটার জন্য কষ্ট হয় না! আমারও সেরকম এই বাসা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আমার নিজের মনকেই বলি, এটা কোন ব্যাপার না, এটা খুবই স্বাভাবিক!

 

দু’হাতে দুটো পেপার কফি মগ নিয়ে প্রত্যুষকে আসতে দেখি। কাছে আসতেই আমার দিকে একটা মগ এগিয়ে দিতে দিতে বলল, -‘গরম থাকতে থাকতে খেয়ে ফেলুন।’

 

আমরা দু’জন কিছুক্ষন চুপচাপ কফি খাই। হঠাৎ প্রত্যুষই কথা বলে ওঠে।

 

-আপনার এবারের ঈদটা তাহলে আর একা কাটাতে হল না, দেশে সবার সাথেই করছেন!

 

-হুম্‌!

 

-আবার ফিরছেন কবে? ঈদের পরেও কয়েকটা দিন নিশ্চয়ই থাকবেন?

 

-‘হুম্‌, তা তো থাকতেই হবে।’ আমি কফিতে চুমুক দিয়ে খুব গম্ভীর হয়েই বলি।

 

-ডিসেম্বরটা থেকেই আসবেন তো? নাকি তারও পরে? নতুন বছরে?

 

-তারও পরে।

 

-‘জানুয়ারী?’ প্রত্যুষ যেন নির্দিষ্ট করে জানতে চায় আমি কতদিন দেশে থাকব।

 

-না জানুয়ারী হবে কি করে? নভেম্বরে ঈদ হয়ে অত তাড়াতাড়ি আবার কেন ঈদ হবে?

 

-‘মানে কি? আপনি এত হেয়ালি করে কথা বলছেন কেন বলুন তো? আপনি তো এই কোরবানী ঈদটা করতেই দেশে যাচ্ছেন। তাহলে আবার ঈদ মানে?’ প্রত্যুষের চোখে একরাশ প্রশ্ন।

 

আমি গম্ভীর মুখে বলি, -‘মানে কিছুই না। ভাবছি এখন থেকে আমার জীবনের সবগুলো ঈদ দেশেই করব। তাই কোন ঈদের কত পরে আবার এখানে আসব, বা আদৌ আসব কিনা সেটা এখুনি বলি করে বলুন?

 

প্রত্যুষের চেহাড়া এবার দেখার মত হয়! সে একদিকে যেমন ভীষন রকমের অবাক, আরেকদিকে তেমনি ভয়ানক আনন্দিত! কিছুক্ষন কোন কথাই বলতে পারে না সে। আমি প্রত্যুষের অবস্থা দেখে হেসে ফেলি।

 

-‘অপরাজিতা, ডোÏট সে দ্যাট ইউ আর কিডিং উইথ মি!’ প্রত্যুষ এবার খুব সিরিয়াস চেহাড়া করে বলে।

 

-উহু, আমি তা বলিওনি। আমি যা সত্যি তাই বলেছি।

 

-‘কিন্তু কখন আপনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন? আমাকে তো কিছুই বলেননি! এমন কি কিছু বুঝতেও দেননি যে আপনার এই যাওয়া শুধু যাওয়াই না, ফিরে যাওয়া!’ প্রত্যুষের বিষ্ময় যেন কাটেই না।

 

-নিজেই তো বুঝলাম এই এখন যে আমি সত্যি ফিরে যাচ্ছি, তবে আর আপনাকে বোঝাব কখন!

 

-‘এনিওয়ে, আই এ্যাম সো হ্যাপি!’ প্রত্যুষের চোখে মুখে আনন্দ যেন উপ্‌চে পরে।

 

-আপনার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে আপনার ফ্যামিলীর কেউ দেশে ফিরছে!

 

-‘আরে আপনি আমার ফ্যামিলী নন বলেই কি আপনার প্রত্যাবর্তনে আমি আনন্দিত হব না? আপনার সাথে আমার একটা বন্ধুত্ত্ব তো হয়েছেই। আপনি এখানে থাকলে আর হয়ত কখনও আমাদের দেখাও হত না। কিন্তু এখন আপনি দেশে যাচ্ছেন, এখন আমাদের প্রায়ই দেখা হতে পারে। কথা তো হবেই।’ প্রত্যুষ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু থামে, তারপরেই আবার বলে, -‘তাছাড়া দেশের মানুষ দেশে ফিরে আসছেন এটাই তো আনন্দের বিষয়।’

 

আমাদের ফçাইটের প্যাসেঞ্জারদের যেতে বলার নির্দেশ ঘোষিত হল। আমরা যে যার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে উঠে পরি।

 

 

 

প্লেনে উঠে যাবতীয় ফরম্যালিটি শেষে যে যার সিটে এসে বসেছি আমরা। আমি জানালার ধারে বসেছি। বাইরে একবার যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখি আমি। এই দেশটাকে মনে মনে বলি, ‘তুমি ভাল থেক, আমিও এবার ভাল থাকব।’ এবার মাকে একটা এস এম এস করব বলে মোবাইলটা হাতব্যাগ থেকে বের করি। কি লিখব আমি মাকে? একটু ভাবি। তারপরে লিখতে শুরু করি-

 

‘‘মা, সেই ছোট্টবেলা থেকে আমার যখন যা কিছু প্রয়োজন হয়েছে তার সবকিছুই চাওয়ার আগেই তুমি এনে দিয়েছ আমাকে। ফলে চাওয়ার কোন অভ্যেসই গড়ে ওঠেনি আমার। ভেবে দেখ মা, কখনও কি কোনকিছু তোমার কাছে চেয়েছি আমি? কিন্তু সেই তুমিই কেন বুঝলে না আমি এখন কি চাই? কেন বুঝলে না তোমাদের ছেড়ে থাকতে আমার ভীষন কষ্ট হয়? কেন বুঝলে না আমার দেশটাকে ছেড়ে থাকতে ভীষন কষ্ট হয়! আমার কি কেবল একটা স্বামী আর নিরাপত্তাই চাই? আমার কি তোমাকে, বাবাকে, আমার পরিবারকে প্রয়োজন নেই? আমার কি তোমার কোলে মাথা রেখে চোখের সামনে নিজভূমির বিশাল আকাশের প্রয়োজন নেই, আর পায়ের নীচে চিরচেনা সেই মাটি? এত বিপদ গেল আমার একবারও কেন তোমার কাছে আমাকে ডাকলে না মা? তুমি কেন বুঝলে না সে সময়ে তোমাদেরকেই আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল? তুমি কি জানো না তোমার অপু কত অভিমানী? তুমি কি জানো তুমি বুঝবে বলে সে কতকাল অপেক্ষায় ছিল? কিন্তু আর কোন অপেক্ষা না মা, তোমার অপু এবার বুঝেছে মায়ের কাছে যেতে সন্তানকে কারও কোন কথার অপেক্ষায় থাকতে হয়না-না জন্মদায়ীনি মায়ের কাছে যেতে, না স্বদেশমাতার কাছে যেতে। মা, আগামীকাল দুপুরের ভাতে আমার জন্য দু’মুঠো চাল বেশি নিও। আমি আসছি।’’

 

আমার কথাগুলো চারটা মেসেজে ভাগ হয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। আমি হাতের মুঠোর মধ্যে মোবাইলটা ধরে বাইরে তাকিয়ে থাকি। কিছুটা সময় যায় কি যায় না, হাতের মুঠোর মধ্যে মোবাইলটা কেঁপে ওঠে। মা রিপ্লাই করেছে! আমি তাড়াতাড়ি মেসেজটা পড়ি-

 

‘‘তোর জন্য সরষে ইলিশ করি? আর ঝাল করে শুটকি?’’

 

মুহূর্তে আমার অনেকদিনের হিমশীতল মনের মধ্যে উষ- বাতাস বয়ে যায়। আর সেই বাতাসে পাখির পালকের মত আমি ভেসে যেতে থাকি। ভাসতে ভাসতে আমি দশটা বছর আগের আমি হয়ে যাই। আমার আর মনেই হয়না আমার জীবনের দশটা বছর অনাবাদী জমির মত নষ্ট পরেছিল। আমার এই দশটা বছরের যত বঞ্চনা, যত দুঃখ, ক্ষোভ আর অভিমান সব অনেককালের চাপা পরে থাকা উষ-তায় গলে গলে যায়। মোবাইলটাকে মুঠো করে ধরে বুকের কাছে নিয়ে আসি আমি। এই হল মা! আমার পুরো অন্তর হেসে ওঠে। আমি হাসিমুখে চোখ বন্ধ করি। আমার বন্ধ দু’চোখের কোল বেয়ে উষ- অশ্রু গড়িয়ে পরে। আমার মনের মধ্যে দশটা বছরের জমে থাকা বরফ আজন্মলালিত উষ-তায় গলে গলে পরে। আমার একবারও খেয়াল হয়না পাশের সিটে বসে ভীষন অবাক হয়ে প্রত্যুষ আমার দিকেই তাকিয়ে দেখছে। দেখলে দেখুক, আনন্দের অশ্রু দেখার অধিকার সবারই আছে।

 

 

৮ই ডিসেম্বর’ ২০০৯                                      ^  বৃত্ত ঘুরে বৃন্েত ^

 

-নওরীন ইয়াসমীন

 

গ্রোসারী থেকে বেরোতেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যাগের মধ্যে দুধ, রুটি গুছিয়ে তুলতে গিয়ে আমার আরেকটা ব্যাগ ভূল করে ক্যাশ কাউÏটারে ফেলে এসেছি। আবার এখন ছোট! কাজ থেকে ফিরে এসব ঝক্কি ভাল লাগে? নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে আবার গিয়ে গ্রোসারীতে ঢুকি। আমাকে ঢুকতে দেখেই ক্যাশ কাউÏটারের মেয়েটি আমার দৃষ্টি আকর্ষন করতে হাতে করে আমার ব্যাগটা উঁচু করে তুলে দেখাল। আমি ব্যাগটা নিয়ে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। আর বেরোতেই দূর থেকে নিপুন ভাবীকে দেখতে পেলাম। উফ্‌! এখন আমি ওনার সামনে কিছুতেই পরতে চাইনা। উনি মানুষ ভাল, কিন্তু এত কথা বলেন যে এখন ওনার পাল্লায় পরলে নির্ঘাত ঘÏটা খানেকের আগে আমি কিছুতেই ছাড়া পাব না। আজ এমনিতেই আমি ভীষন ক্লান্ত। রাতে মোটেও ঘুম হয়নি। তবুও সেই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে ছুটতে হয়েছিল। এই তো এতক্ষনে ফিরছি। ফিরে, গ্রোসারী হয়ে বাসায় যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। আমি অনেক কায়দা করে নিপুন ভাবীর চোখ বাঁচিয়ে শপিংমল থেকে বের হয়ে আসি।

 

বাসার লিফ্‌টের সামনে পৌঁছুতেই দেখি লিফ্‌ট নীচে নেই। কে জানে দশতলায় উঠে বসে আছে কিনা! বাটন প্রেস্‌ করে অপেক্ষায় থাক এখন! আজ আমার সাথে এসব হচ্ছেটা কি? একে তো একলা মানুষ, একা হাতেই সব করতে হয়। তার উপরে চাকরী করলে প্রায় সারাক্ষন কাজের প্রেসারের মধ্যেই থাকতে হয় সেটা নিশ্চয়ই বুঝি আমি। কিন্তু যেসব দিনগুলোতে শরীর আর চলে না, বিশ্রাম চায়, সেদিন চলতে গিয়ে বারবার বাধা পেলে সত্যি আমার ভীষন বিরক্ত লাগে! তাও যদি বাসায় ফিরে রেষ্ট নেবার কোন উপায় থাকত! ক্লান্ত, ক্ষুধার্থ্য অবস্থায় রাঁধোরে, সব ক্লিন করোরে, তারপরেই না শাওয়ার নিয়ে খাওয়া। আর তারপরে রেষ্ট।

 

এতক্ষনে আমার পালকী এল। পালকী আর কি! লিফ্‌টকেই আমি মজা করে পালকী বলি। কি সুন্দর বেহারা নেই, হেইও রব নেই, অথচ পালকীর মত ছোট্ট এই ঘরখানি আমাকে আমার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়! আবার ঘর থেকে বেরোবার সময়ও আমাকে কত যত্নে অত উঁচু থেকে নামিয়ে আনে! হঠাৎ কখনও পালকীর মত একটু দুলেও ওঠে। তবে দুলে উঠলে তখন আর আমার কোন ফ্যাÏটাসি থাকে না। তখন আমি ভয় পাই। আতংকিত হয়ে পরি হঠাৎ যদি মাঝপথে থেমে যায়। আর আমি জানালা দরজাবিহীন ছোট্ট এই ঘরে আটকে পরি! এমন অভিজ্ঞতা একবার তো হয়েছিলই আমার। তবে আমার বিলডিং এর এই লিফ্‌টে না। ঘটনাটা ঘটেছিল সেÏট্রালের সাবওয়ে ষ্টেশনের লিফ্‌টে। আমি যে কি ভীষন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! মূহুর্তে মনে হয়েছিল বুঝি হার্ট এ্যাটাক হয়ে মরেই যাব। কিন্তু রেসকিউ বাটনে প্রেস করতে না করতেই আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মত কোথা থেকে একজন সিকিউরিটির লোক চলে এল। কাঁচের ওপার থেকেই আমাকে ইশারায় বলল, -‘ভয় পেয়ো না, ঠিক করা হচ্ছে।’ আর সত্যি মাত্র দু’মিনিটের মধ্যেই আমি লিফ্‌ট থেকে বেরিয়ে এলাম! সেই থেকে এই ব্যাপারটায় আমার ভয়ানক ভয়। একলা লিফ্‌টে উঠতে হলেই আমি দোয়া দরূদ পড়তে থাকি। আজ আমাকে একাই উঠতে হবে, ভাবতে ভাবতে লিফ্‌টে ঢুকলাম। কিন্তু দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার আগেই দশতলার সেই সদাহাস্যময়ী মহিলাটি মেইন গেট দিয়ে ঢুকেই ছুটে এসে লিফ্‌টের ডোরটা ধরে ফেললেন। ভেতরে ঢুকে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন,

 

-সরি! আমি তোমাকে বিরক্ত করলাম না তো?

 

-একটুও না। তুমি তো লিফ্‌টের ডোর বন্ধ হবার আগেই এসে পরেছ, আমার তো কিছু ঝামেলা হয়নি। তোমারই বরং তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কষ্ট হল। কেমন হাঁপাচ্ছ দেখ?

 

-‘সো কাইন্ড অফ ইউ!’ মহিলা কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলেন। তারপরেই হাতের ফুলগুলো দেখিয়ে বললেন, -‘এই ফুলগুলো কিনতে গিয়েই দেরী হয়ে গেল।’

 

-ফুলগুলো খুব সুন্দর! তুমি প্রায়ই ফুল কেনো বোধহয়, তাইনা?

 

এদেশিয় অন্য মহিলাদের মত নন ইনি। বেশ মিশুক বোঝাই যায়। আমার কথায় এবার উনি একটু লাজুক হেসে বললেন, -‘ঘরে সবসময় কিছু ফ্রেশ ফুল না থাকলে ভাল লাগে না আমার। তাই দু/চারদিন পরপরই আমি নতুন ফুল কিনে পুরোনগুলো পালটে দেই। তাছাড়া সামার মানেই তো ফুল, তাইনা?’

 

-‘সত্যিই ফ্রেশ কিছু ফুল ঘরের পরিবেশই পালটে দেয়।’ আমি ওনার কথায় সায় দেই।

 

কথায় কথায় আমি আমার সাততলায় পৌঁছে যাওয়াতে ওনাকে ‘হ্যাভ এ নাইস ডে’ বলে নেমে পরি। বৈদ্যুতিক পালকী ওনাকে নিয়ে দশতলায় উঠে যায়। আমি আমার এপার্টমেÏেটর দরজায় দাঁড়িয়ে ব্যাগ হাতরে চাবি বের করি। এভাবে রোজ যখন ঘরে ফিরে নিজেকেই দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকতে হয় তখন মনটা সত্যি খুব খারাপ হয়ে যায় আমার। নিজেকে ভীষন নিঃসঙ্গ মনে হয়। মনে হয় আমি এমনই এক হতভাগ্য মানুষ যার জন্য ঘরে কেউ অপেক্ষায় নেই যে কিনা আমি ফিরলেই হাসিমুখে দরজা খুলে দেবে। আমি ঘরে ফিরেছি বলে খুশি হয়ে উঠবে। সারাদিন আমার কেমন কেটেছে জানতে চাইবে। নাহ্‌, এসব ভেবে কোন লাভ নেই! আমি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকি। ভেতরে ঢুকতেই শুনতে পেলাম ল্যান্ডফোনটা বাজছে। কিন্তু জুতো খুলে যেতে যেতেই লাইনটা কেটে গেল। কোথা থেকে করা হয়েছিল ডিসপ্লেতে নাম্বারটা দেখার আগেই ফোনটা আবারও বেজে উঠল। দেশের কল। আজ আবার কে ফোন করল!! ভাবতে ভাবতেই রিসিভারটা তুলে নেই-

 

-হ্যালো!

 

-‘কি রে আজ তোর ফিরতে এত দেরী হলো কেন?’ ওপ্রান্েত মা’র ক¥।

 

মা ফোন করেছে! আমি খুবই অবাক হই, কিছুটা আতংকিতও। কারও কিছু হলো না তো?

 

-কি ব্যাপার মা তুমি আজ ফোন করলে কেন? আমি না কালকেই তোমার সাথে কথা বললাম। কিছু হয়েছে?

 

-‘না, না, কিছুই হয়নি। কাল তো তোর সাথে কথা বলতে বলতেই লাইনটা কেটে গেল, কথা ঠিকমত শেষ করতেই পারিনি। পরে তুইও আর ফোন করলি না। ভাবলাম তোর কিছু হলো না তো! ভাল লাগছিল না, তাই আমিই আজ করলাম।’ মা এক নিঃস্বাসে কথাগুলো বলে।

 

-ওহ! মা, তোমাকে না আমি লাইন কেটে যাওয়ার আগেই বলে নিয়েছিলাম কার্ডের টাইম শেষ, যে কোন সময় লাইন কেটে যাবে?

 

-‘বলেছিলি তো, কিন্তু তবুুও আমার তোর জন্য ভাবনা হচ্ছিল।’ মা নরম গলায় বলেন। তারপরেই আবার বলেন, -‘আজ তোর দেরী হলো কেন রে? আমি সেই আধা ঘÏটা ধরে ফোন করেই যাচ্ছি। বুঝতে পারছিলাম তুই বাসায় নেই। আরও চিন্তা হচ্ছিল।’

 

-‘তুমি অযথা এত ভাব কেন বলো তো মা? আমি কি এখনও নাবালিকা আছি? নাকি আমি জঙ্গলে বাস করছি যে সারাক্ষনই তুমি আমাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করবে?’ আমি এবার কিছুটা রাগত স্বরেই বলি।

 

-‘তুই সেকথা বুঝলে তো হতই! শুধু নাবালিকা হলেই তাকে নিয়ে ভাবনা হয় বাবা-মায়ের? তোর মত বয়সি একটা মেয়ের এভাবে একা থাকাটা যে তার বাবা-মায়ের জন্য কতটা ভাবনার সেটা যদি বুঝতি তুই!’ মায়ের দীর্ঘ্যশ্বাস পরে।

 

-‘এই তো আবারও শুরু হল!’ মায়ের কথা শুনে আমার যেমন বিরক্ত লাগে, তেমনি আবার মায়ের জন্য মায়াও লাগে। আমি কথা ঘোরাই, -‘আচ্ছা মা, চিতল মাছের কোপ্তায় মাছটা কি ব্লেন্ড করে নিতে হয়, নাকি শুধু কাঁটা বেছে হাত দিয়ে মেখে নিলেই হয়? ক’দিন ধরে খুব খেতে ইচ্ছে করছে। ভাবছি এরমধ্যে একদিন রাঁধব।’

 

-‘না, না, হাত দিয়ে কোনরকমে শুধু মাখালেই হবে নাকি! চিতল মাছের কোপ্তা করার অনেক নিয়ম কানুন আছে’ মা আমার জন্য সব টেনশন ভূলে চিতল মাছের কোপ্তার রেসিপি খুব সুন্দর করে আমাকে বুঝিয়ে দিতে শুরু করেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি!

 

মা’র সাথে কথা শেষ করে কি খাওয়া যায় ভাবি! আজ কাজে আমার খুব ষ্ট্রেসফুল একটা দিন গেছে। ভীষন ক্লান্ত লাগছে। ঝামেলার কিছু রাঁধার প্ল্যান নেই আজ। ফ্রিজে গ্রীল চিকেন ব্রেষ্ট আছে। পাস্তা সিদ্ধ করে গ্রীল চিকেন, শশা, টমেটো, ব্ল্যাক অলিভ আর চিজ্‌ কিউব দিয়ে আমি ঝটপট পাস্তা সালাদ করে ফেলি। তারপর হাতের টুকটাক কাজ সেরে শাওয়ার নিয়ে খাবারসহ কম্পিউটার টেবিলে এসে বসি। স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ইÏটাের্নটের কল্যানে মানুষ এখন প্রবাসে বসেও দেশের সব ধরনের টিভি প্রোগ্রামই দেখতে পারে। আমি একলা মানুষ, চাকরীর জন্য সারাদিন বাইরেই কেটে যায়। তাই স্যাটেলাইট চ্যানেলে আমার কোনই প্রয়োজন নেই। দিন শেষে ঘরে ফিরে ইÏটাের্নটই আমার জন্য যথেষ্ট। সারাদিনের কাজের শেষে এটুকুই আমার যা রিক্রিয়েশন।

 

 

খুব সকাল সকাল উঠতে হয় আমাকে। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে আমার কাজে যেতে প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মত সময় লাগে। তাই পথের এক ঘÏটা সময় হাতে রেখেই প্রাত্যহিক কাজের জন্য আরও এক ঘÏটা আগে বিছানা ছাড়তে হয় আমাকে। শনি-রবি ছাড়া রোজই এই একই সময়ই উঠি আমি। কিন্তু তবুও এলার্ম ছাড়া আজও নিজে নিজে ওঠার অভ্যেসটা হলো না আমার। তবে আজ কোন এলার্ম নেই, আজ শনিবার। তবুও সাতটা পঞ্চান্নতে ঘুম ভেঙ্গে যেতে মেজাজটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল! আজ তো আমার সারাদিন ঘুমালেও কোন সমস্যা ছিল না, আর আজই কিনা সাত সকালে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল! কোন মানে হয়? বিরক্ত আমি শুয়ে শুয়েই খানিক আলসেমি করি। আমার এক রুমের ছোট্ট এই এপার্টমেÏটটার যতটুকু এই বিছানা থেকে দেখা যায়, শুয়ে থেকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আমি। দিনের প্রথম আলোতে কেমন যেন অচেনা লাগে সবকিছু। কিছুই নিজের বলে মনে হয়না। বিষয়টা ভাবতেই একটু অবাক লাগে আমার! এতগুলো বছর ধরে দেশের বাইরে আমি, এখানেই তো প্রায় সারে পাঁচ বছর হয়ে গেল, অথচ এখনও এখানকার কোনকিছুকেই নিজের বলে মনে হয়না আমার। কিন্তু কেন? এই যে এই ছোট্ট ফç্যাটের যা কিছু সবই তো আমি নিজের রোজগারের টাকায় কিনেছি। তবুও নিজের মনে হয়না কেন!! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি আমি, আবার নিজেই নিজেকে সে প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করি। আমার ধারণা নিজেস্যতার অনুভূতি আরও গভীরে সৃষ্টি হয়। আরও সুক্ষ্য। আসলে নিজে এখানে থাকলেও মনটা তো প্রায় সারাক্ষন দেশেই পরে থাকে, তাই হয়ত এখানকার কোনকিছুকে আপন মনে হয়না। তাছাড়া যে ভূখন্ডে আমি আছি সেই ভূখন্ডই আমার না, যখনই এটা মনে হয় তখনই এখানকার আর কোনকিছুকেই নিজের বলে মনে হয়না, সে যতই নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা হোকনা কেন। যার উপরে দাঁড়িয়ে সেই জায়গাটাই যদি পরের হয়, তবে নিজের বলে তখন আর কিছুকে ভাবা যায় কি? হঠাৎ আবদুল আলীমের ‘‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’’ গানটা মনে পরে যায় আমার। এই পর পর অনুভূতি নিয়ে কোথাও বাস করা যে কতখানি কষ্টের সেটা প্রবাসী ছাড়া আর বোধহয় কেউ এভাবে বুঝবে না। কি জানি আমার মত করে সব প্রবাসীর একই রকম অনুভূতি হয় কিনা! হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠতেই ভাবনার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এলাম আমি। এত সকালে কার আবার আমাকে প্রয়োজন পরলো! ভাবতে ভাবতেই ঘড়ির দিকে চোখ পরে আমার। আরে এগারোটা বাজে প্রায়, কখন এত বেজে গেল! আলসেমি কাটিয়ে ফোন রিসিভ করার জন্য উষ- বিছানা থেকে নেমে পরি আমি।

 

-হ্যালো!

 

-‘গুড মরণিং সুইটি! হোপ্‌ আমি তোমার ঘুম ভাঙ্গাইনি।’ ওপ্রান্ত থেকে লিলিয়ানা খল্‌বল্‌ করে ওঠে।

 

লিলিয়ানা, আমার ক্রোয়েশিয়ান বান্ধবী। এদেশে আসার পরপর লিলিয়ানা আর আমি একই সাথে ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে পড়েছি। ভীষন মিশুক একটা মেয়ে। আমার মতই বয়স হবে। কিন্তু ওর অনর্গল কথা বলা আর অস্থিরতা দেখলে মনে হবে ও বুঝি এখনও টিন এজ্‌ই পেরোয়নি। এখনও মাঝেমাঝেই আমাদের যোগাযোগ হয়। শেষবার লিলিয়ানাই ফোন করেছিল আমাকে। আমার আর করা হয়নি। আজ হঠাৎ কি মনে করে শনিবার সকালেই ফোন করল ভাবতে ভাবতেই লিলিয়ানার কথার জবাব দেই-

 

-তোমার মত ফ্রাইডে নাইট বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ডিস্‌কোতে কাটাইনা আমি যে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পরে পরে ঘুমোব।

 

-‘ও হানি, সত্যি তুমি যে কি একটা লাইফ কাটাচ্ছ! মানুষ ভেজেটেরিয়ান হয় আর তুমি নিজেই একটা ভেজিটেবল্‌।’ লিলিয়ানার বলার ঢঙ্গে মনে হয় সত্যি সে আমাকে নিয়ে ভীষন হোপলেস্‌।

 

-ওকে! এবার বল তোমার মত একজন আমিষের শনিবারের মত এমন এক স্ফুর্তির দিনের সকালেই আমার মত একজন ভেজেটেবল্‌কে মনে পরল কেন? তোমার তো এখন পরে পরে ঘুমোবার কথা!

 

আমার কথায় লিলিয়ানা খিলখিল করে হেসে ওঠে। -‘ওহ্‌ গড্‌! হানি তুমি এমন মজা করে কথা বল!’

 

-‘মজা করে শুধু কথাটাই বলতে পারি, তোমাদের মত মজা তো আর করতে পারিনা। নইলে তুমি কি আমাকে এই শনিবার সকালে ভেজেটেবল্‌ বল!’ আমি ছদ্মগাম্ভীর্য্যে বলি।

 

লিলিয়ানা ভেবেছে আমি বুঝি সত্যি সত্যি তার কথায় মন খারাপ করেছি। সে বলে ওঠে, -‘ডারলিং ডোÏট বি সিলি! ইউ নো ভেরী ওয়েল দ্যাট হাউ মাচ আই লাইক ইউ। ডোÏট ইউ?’

 

-‘সত্যি তোমার বয়ফ্রেন্ডগুলো তোমার ব্রেইন একদম নষ্ট করে দিয়েছে, নইলে তুমি ফানও বোঝনা?’ আমি এবার হেসে উঠি। পরমূহুর্তেই বলি, -‘এখন বল তো কি মনে করে আমাকে ফোন করেছ? তুমি তো এত সকালে কখনও ফোন কর না! এনি প্রবলেম্‌?’

 

-‘ঝামেলায় না পরলে কি আর এই সময়ে নিজে না ঘুমিয়ে তোমাকে কল করি।’ লিলিয়ানার ক¥ এবার একটু ক্লান্ত শোনায়। কিন্তু সে মূহুর্তকাল মাত্র। আবারও সে স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় বলে ওঠে, -‘দেখনা, আমি এখন যে কোর্সটা করছি সেখানে এশিয়ার কোন দেশের উপরে আমাদের এ্যাসাইনমেÏট দিয়েছে। আমি কি এশিয়ার এতকিছু জানি? বিষয়টা জানার পর থেকেই কেবল তোমার কথাই মনে হচ্ছে আমার। তুমি আমার জন্য তোমার নিজের দেশ নিয়ে এই এ্যাসাইনমেÏটটা করে দাও হানি, প্লিজ্‌!’

 

-তুমি এশিয়ান নও বলেই যে এশিয়া বা এশিয়ার কোন দেশ নিয়ে একটা এ্যাসাইনমেÏট লিখতে পারবে না তেমনটা ভাবছ কেন? গুগল্‌ এ সার্চ করলেই তো তুমি যে কোন দেশের যাবতীয় ইনফর্মেশন পেয়ে যাবে।

 

-‘সুইটি, সেটা আমিও জানি। কিন্তু এই মূহুর্তে গুগল্‌ সার্চ করে ইনফর্মেশন কালেক্ট করে করে এ্যাসাইনমেÏট করার মত অত সময় আমার কোথায়?’ লিলিয়ানা খুব ব্যস্ত মানুষের মত করে কথাগুলো বলে। তারপরেই যেন গোপন কোন কথা বলছে এভাবে গলাটাকে নীচু করে প্রায় হুইস্পারিং এর মত করে বলে, -‘গতকাল নাইট ক্লাবে একজনের সাথে আলাপ হয়েছে, সে আমাকে আজ রাতে ডিনারে ইনভাইট্‌ করেছে। আমি এখন বাটারফçাই মুডে আছি হানি, এর মধ্যে আমার দ্বারা গুগল্‌ সার্চ করে এ্যাসাইনমেÏট লেখা হবে না।’

 

লিলিয়ানার কথায় আমি এবার একটু তিরস্কার করে বলি, -‘দু’দিন পর পরই বয়ফ্রেন্ড চেঞ্জ করে তুমি এমন বাটারফçাই মুডে থাক, তোমার দ্বারা কখনই কি সিরিয়াস কিছু হবে? আর কতদিন বাটারফçাই লাইফ কাটাবে, এবার একটু সেটল্‌ করার কথা ভাব।’

 

-সেটল্‌ করার কথা ভাবলেই কি আর এত সহজে সেটল্‌ করা যায় হানি, নিজেকে দিয়ে দেখছ না? এই যে তুমি আমার মত লাইফ কাটাচ্ছ না তাতেই কি তুমি হ্যাপি? তার চেয়ে এই যে মাঝেমাঝে হলেও আমার বাটারফçাই মুডে সময় কাটছে সেটাই বা কম কি? ডিয়ার, জীবনে কিছু সুখের স্মৃতি থাকা খুব জরুরী। নইলে বার্ধক্যের একাকিত্ত্ব কাটাবে কি নিয়ে?’ লিলিয়ানার মত অস্থিরমতি মেয়ের মুখে হঠাৎ এই কথাগুলো খুব ভারী শোনায়।

 

লিলিয়ানার শেষ কথাটায় আমি একটু থম্‌কে যাই। বার্ধক্যের একাকিত্ত্বের জন্য সত্যি কি কিছু সুখের স্মৃতি থাকা জরুরী? কি জানি! আমার কাছে তো সব স্মৃতিই কষ্টের মনে হয়। দুঃখের সময়ের স্মৃতি যখনই ভাবা হোক না কেন তাতে দুঃখই হয়। সুখের স্মৃতি নিয়ে ভাবলেও আমার কষ্ট লাগে, সেই সময়গুলো আমার জীবনে আর নেই এটা ভেবে। তাছাড়া বার্ধক্য যে একাকিত্ত্বেই কাটবে তেমনটাই বা ভাবব কেন? লিলিয়ানা বা এদের মত কালচারে বিষয়টা খুব স্বাভাবিক হলেও আমাদের কালচারে বার্ধক্য তেমন একটা একাকিত্ত্বে কাটে না। ছেলে-ছেলের বৌ, মেয়ে-মেয়ে জামাই, নাতি-নাতনী নিয়ে ভরপুর জীবন তো বার্ধক্যেই। যদিও আমাদের কালচারেও এখন আধুনিকতার হাওয়া লেগেছে। এখন অনেক পরিবারই আর আগের মত ভরপুর থাকে না, মানষিক ভাবেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তবুও নেই নেই করেও এখনও আমাদের যতটুকু আছে সেটা লিলিয়ানাদের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এটাও হয়ত সত্যি, বার্ধক্যে মানুষ অনেকের মধ্যে থেকেও মানষিক ভাবে বোধহয় ভীষন একাই হয়, যদি না তার কোন সঙ্গি থাকে।

 

-হ্যালো! হানি তুমি কি ওপাশে আছো? কখন থেকে চুপ করে আছো, এত কি ভাবছ?

 

লিলিয়ানার কথায় আমার সংবিৎ ফেরে। আমি কিছুক্ষনের জন্য নিজের ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম। একটু লজ্জিত হয়েই তাড়াতাড়ি বলি, -‘সরি! তোমার কথাগুলোই একটু ভেবে দেখলাম।’

 

-‘রিয়েলি? ভাব ভাব, এটা কোন জীবন হল নাকি? লাইফ একটাই হানি, এখানে অবহেলায় নষ্ট করার মত এত অফুরন্ত সময় নেই। এই এক জীবনে যতটা সম্ভব আনন্দ করার নামই বেঁচে থাকা।’ সুযোগ পেয়ে লিলিয়ানা আমাকে জ্ঞান দিয়ে দেয়।

 

-হয়েছে, আর লেকচার দিতে হবে না। এখন বল, তোমার এ্যাসাইনমেÏটটা কি সত্যি আমাকে করে দিতে হবে?

 

-‘ইয়েস হানি, তোমাকেই করে দিতে হবে এবং কালকের মধ্যেই। মান্‌ডে ওটার প্রেজেÏেটশন। আমি জানি তোমার একটু ঝামেলাই হবে। কিন্তু হানি তুমি ছাড়া আমাকে এখন উদ্ধার করার মত কেউ তো নেই। প্লিজ্‌ সুইটি হেল্প মি!’ লিলিয়ানার গলা সত্যি সত্যি ভীষন কাতর শোনায়।

 

-থাক আমাকে আর এত ‘হানি, সুইটি’ বলতে হবে না। ওই মিষ্টি সম্মধোনগুলো তুমি তোমার বয়ফ্রেন্ডদের জন্যই রেখে দাও।

 

-আর বলোনা হানি, ওদের ডাকতে ডাকতেই তো আমার এখন এই অবস্থা, ঐ ওয়ার্ডগুলো ছাড়া কারও সাথে কথাই বলতে পারিনা।

 

লিলিয়ানার এই সহজ স্বীকারোক্তিতে আমার ভীষন হাসি পায়। আমি ওকে এ্যাসাইনমেÏটটা লিখে দেব বলে আশ্বস্ত করে ফোনটা রাখি। সত্যি লিলিয়ানাদের মত করে যদি জীবনটাকে নিয়ে ভাবতে পারতাম! নাহ্‌ শত চেষ্টাতেও ওদের মত করে জীবনকে নিয়ে ভাবা বাঙ্গালী মেয়েদের পক্ষে কখনোই বোধহয় সম্ভব না। বাঙ্গালী মেয়েদের অতটা সাহসই নেই। বাঙ্গালী মেয়েদের সাহস বানরের সেই তৈলাক্ত পিচ্ছিল বাঁশে ওঠার মত, একটু উঠলেই আবার অনেকখানি নেমে যায়।

 

 

শীতের দেশে ছুটীর দিনগুলোতেও দুপুরে কেউ ঘুমায় না। আমার তো দুপুরে ঘুমোবার অভ্যেস দেশে থাকতেই ছিল না। কোন কাজ থাকলে দুপুরবেলাতেও আমি সেটা নিয়েই কাটিয়ে দেই। আমি একলা মানুষ হলেও ছুটীর দিনগুলোতে আমার কাজের কোন অন্ত থাকে না। ঘর-দোর ক্লিনিং, সারা সপ্তাহের ময়লা কাপড় ধোয়া, রান্না, শাওয়ার, খাওয়া, দেশে ফোন করা ইত্যাদী করতে করতেই উইকেন্ডের দুটো দিন যে কখন ফুরিয়ে যায়! আজও তার ব্যতিক্রম নয়, যথারীতি অনেক কাজ রয়েছে। কিন্তু এবারের উইকেন্ডের কাজগুলোকে সংক্ষিপ্ত করতে হবে। নইলে লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏটটা লেখার সময় পাব না। ভাবছি নিজের যেটুকু কাজ না করলেই নয় সেটুকু আজকের মধ্যেই সেরে ফেলে কালকের দিনটা এ্যাসাইনমেÏেটর জন্য রাখব। খুব প্রয়োজনীয় কিছু কাজ আর রান্না খাওয়া সেরে বিকেলবেলার দিকে এক মগ গরম কফি হাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই আমি। দু’চোখ ভরে সামনের উন্মুক্ত প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য পান করতে করতে গরম কফির মগে চুমুক দিতে বেশ লাগে আমার।

 

সেÌেটম্বরের প্রথম সপ্তাহ। এখন গাছে গাছে পাতায় পাতায় নানান রঙ্গের খেলা। ক্ষণজন্মা ফুলেরা সব এবছরের মত বিদায় নিয়েছে। পাতারাও সব বিদায় নেবার আয়োজনে ব্যস্ত। তাদের সবুজ বর্ণ শরীরে এখন হলদে রঙ্গের মাখামাখি। হালকা হলুদ থেকে গা• হলুদ, তারপরে কমলা ভাব, একদম শেষে হালকা খয়েরী থেকে গা• খয়েরী, এভাবেই রং বদলাতে বদলাতে গাছ থেকে ঝরে পরবে ওরা। আর বাতাসের দাপটের সাথে যুদ্ধ করেও যে কয়েকটা পাতা গাছেই থেকে যাবে তারা ঐ খয়েরী রং থেকেই এক সময় শুকিয়ে তারাও ঝরে পরবে। এরপর ডিসেম্বর থেকে সেই মার্চ পর্যন্ত পরে থাকবে কেবল গাছগুলোর পাতাবিহীন কংকাল শরীর, আসছে সামারে আবারও পল্লবিত হবার আকাংখা নিয়ে। এপ্রসঙ্গে একজনের কথা মনে পরে গেল। ঘটনাটা মনে পরলেই আমার এখনও ভীষন হাসি পায়। আমি তখন প্রথম এসেছি এদেশে। আসার পরপরই একজন দেশি ছেলের সাথে ঘটনাচক্রে পরিচয় হয়েছিল। সেই ছেলে এদেশে তার প্রথম আসার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়েই বলেছিল, সে যখন প্রথম এদেশে আসে তখন ছিল জানুয়ারী মাস। তখন তো কোন গাছে পাতা থাকে না, শুধু মরা ডালপালা নিয়ে গাছের শরীরগুলো দাঁড়িয়ে থাকে। এরকম একটা দৃশ্য দেখে ছেলেটি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল, ‘‘এ কোন পাগলের দেশে এসে পরলাম, সবখানে শুধু মরা গাছ! এরা এত মরা গাছ রেখে দিয়েছে কেন? গাছগুলোকে কেঁটে ফেলে না কেন এরা?’’ পরে এপ্রিলের শুরু থেকে সেই মরা গাছগুলোকেই পাতায় পাতায় ছেঁয়ে গিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখে সে যারপর নাই বিষ্মিত হয়েছিল।

 

সত্যি এদেশের প্রকৃতি খুব বেশি জীবন্ত। সামারে একটু উষ-তার আভাসেই চোখের পলকে এমনভাবে প্রকৃতিতে প্রাণের ছোঁয়া লাগে যে বিষ্মিত না হয়ে সত্যি পারা যায় না। এপ্রিলের শুরুতেই শীত ভাল মত যেতে না যেতেই গাছে গাছে নতুন কুঁড়িতে ছেয়ে যায়। যে পথ দিয়ে আগেরদিন সন্ধ্যেতেও যাবার সময় কোন ফুল দেখা যায়নি, পরদিন সকালেই সেপথের পাশে ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায়। বড় অদ্ভূত লাগে আমার! ফুলগুলো যেন ফুটবার জন্য মাটির নীচে অপেক্ষাতেই থাকে। আর সামান্য একটু উষ-তা পেলেই মাটী ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। অথচ আমাদের দেশে ফুলকে ফোটাবার জন্য কত সাধ্য সাধনাই না করতে হয়! সামারে এদেশের প্রকৃতি এতবেশি জীবন্ত বলেই বোধহয় উইÏটারে তার ঘুমন্ত রূপ এতবেশি নিরবতা, এতবেশি নিস্তব্ধতা এনে দেয়। এদেশে শীতের প্রকৃতি যেন জুলিয়েটের মত গভীর ঘুমে মৃতপ্রায় হয়ে গ্রীষ্মের উষ-তার অপেক্ষায় থাকে, যেমনটা রোমিওর জন্য ছিল জুলিয়েট।

 

আমি প্রকৃতির সৌন্দর্য্যের মাঝে ডুবে গিয়ে গরম কফিতে চুমুক দেই। থেকে থেকে হিমেল হাওয়া এসে শীতের আগমনী বার্তা জানিয়ে যায়। আবারও শীত আসছে। আমার জন্য আবারও প্রায় গৃহবন্দি কয়েকটি মাস। শুধু বাসা থেকে কাজে, আবার কাজ থেকে বাসায় ফেরা। যেন হিম হিম শুভ্র তুষারের কাফনে ঢাকা মৃত কয়েকটি মাস। তবে এরই মধ্যে লিলিয়ানার মত যারা তারা ঠিকই জীবনের রূপ, রস উপভোগ করে। আমার জন্য এই মাসগুলো মৃত হতে পারে, কিন্তু তাদের জন্য বছরের কোন সময়ই জীবন থেমে থাকে না। শীত, গ্রীষ্ম, কিম্বা হিম তুষার, যে কোন সময়েই তারা জীবনের জন্য উষ-তা খুঁজে নেয়।

 

শুধু লিলিয়ানারাই না, শীত আসছে বলে সারাটা সামার জুরে কলরব করে বেড়ানো গাংচিলেরাও উষ-তার খোঁজে দক্ষিনের কোন উষ- দেশে দলবেধে চলে গেছে। এখন আর কোথাও তাদের কোন চিহ¡ও নেই। ভাবতে অবাক লাগে, সামান্য পাখী তারাও কি সুন্দর বুঝে যায় জীবনের জন্য উষ-তার কি ভীষন প্রয়োজন। কি অবলিলায় তারা তাদের জন্য সেই প্রয়োজনীয় উষ-তা খুঁজে নেয়। অথচ সৃষ্টির স্রেষ্ঠ জীব মানুষ হয়েও আমি আমার জন্য প্রয়োজনীয় উষ-তাটুকু খুঁজে নিতে পারি না। যদিও আমাকে ওদের মত উন্মুক্ত প্রকৃতিতে থাকতে হয় না। আমার জন্য রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উষ- আবাস। কিন্তু এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উষ- আবাস-ও যে স্বজনহীন একাকিত্ত্বে হিম শীতল হয়ে যায়, আর সেই শীতলতা আমার প্রাণরসকে জমাট বরফে পরিনত করে-আমি জীবনমৃত হয়ে ঐ শীতবৃক্ষের মতই বেঁচে থাকি, একা, সঙ্গিবিহীন। কিন্তু কেন, কিসের দায়ে আমি এমন জীবনমৃত হয়ে থাকব? আমি জীবনের সব রূপ, রস, গন্ধ থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখে রোজ কাজে যাচ্ছি, অর্থ উপার্জন করছি, সেই অর্থে খেয়ে পরে একটা একটা করে দিন পার করছি-এটাই কি জীবন? এভাবে বাঁচব বলেই কি আমি আমার সব ছেড়ে এতদূরে একলা হয়ে হিমাগারের কফিনে শুয়ে আছি? কেন আমি ঐ গাংচিলের মত উষ-তার জন্য উষ- দেশে চলে যেতে পারছিনা? আমার তো কোন পিছুটান নেই! তবে?

 

নাহ্‌ আমার বয়স বাড়ছে। আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। নইলে বুড়োদের মত আজকাল আমি এত ভাবি কেন? একটু অবসর পেলেই হল, অমনি সাতপাঁচ ভাবনা এসে আমাকে স্থবির করে দেয়। আমি নিজেকে তিরস্কার করি। বাস্তবতা ভূলে শুধু ভাবলেই তো আর চলবে না আমার। সারা সপ্তাহের ময়লা কাপড় ধোবার জন্য এখন একবার বেজমেÏেট যেতে হবে আমাকে। আমি শুণ্য কফির মগটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকি।

 

সমস্ত ময়লা কাপড় গুছিয়ে লিফ্‌টের সামনে অপেক্ষা করতে করতে আমার আবারও মনে হয়, জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন সঙ্গির সত্যি ভীষন প্রয়োজন। এই যে এখন আমাকে একা একা বেজমেÏেট যেতে হবে ভাবতেই আমার শরীর ভয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে। এখন একজন সঙ্গি থাকলে কত ভাল হত! লিফ্‌ট এসে গেছে। আমি মনে মনে ‘‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে’’ গুনগুন করতে করতে লিফ্‌টে উঠি। কিন্তু এই গানেও আজ নিজেকে সাহসী বা ইন্‌স্পায়ার্ড মনে হয়না আমার। কবি গুরু তুমি কি করে বুঝবে তোমার জন্য এই কথাটা বলা যতটা সহজ ছিল, কথাটাকে বাস্তবায়িত করা ততটা সহজ মোটেও নয়। নিজ জমিদারীতে পরিবার, পরিজন, প্রনোয়িনী, ভক্ত, অনুরাগীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকে অভ্যস্ত তোমাকে তো কখনও কাউকে ডাক দিতেই হয়নি, ডাকার আগেই অনেককে পেয়ে গেছ তুমি। তুমি কি করে বুঝবে একলা চলা কতটা কঠিন, কতটা কষ্টের? তাও আবার নিজভূমি ছেড়ে এই প্রবাসে! রবি ঠাকুরকে অদৃশ্য প্রতিপক্ষ মনে করে মনে মনেই তার সাথে বিতর্ক করতে করতে নিজেকে আমি কিছুটা সাহসী ভাবার চেষ্টা করি।

 

 

রবিবার সকাল সকাল ব্রেকফাষ্ট সেরেই লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏেটর জন্য পিসি’র সামনে বসি। এসময়ে লিলিয়ানা হয়ত রাত্রিযাপনের ক্লান্িত দূর করতে গভীর ঘুমে। আর আমাকে কিনা তার জন্যই এই ছুটীর দিনেও সকাল সকাল বিছানা ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু কি আর করা, বন্ধুত্ত্বের দায় বিষম দায়! কিছুটা হলেও শুধতে তো হবেই। আমি আমার ভাবনাকে আর প্রশ্রয় না দিয়ে গুগলে হানা দেই। গুগল্‌ মূহুর্তের মধ্যেই আমার চোখের সামনে আমার বাংলাদেশ আর তার যাবতীয় তথ্যের ঝাঁপি মেলে ধরে। কত শত ইনফর্মেশন! কোথা থেকে শুরু করব, কিভাবে লিখব ভাবতেই মনে পরল লিলিয়ানা তো শুধু দেশ নিয়ে এ্যাসাইনমেÏট লেখার কথা বলেছে, কিন্তু তাতে কোন কোন বিষয় থাকবে সেটা তো বলেনি! একটা দেশের তো কত রকমের বিষয় থাকে, কতদিক থাকে, তার সবকিছু কি আর কয়েক পৃষ্ঠার এ্যাসাইনমেÏেট লেখা সম্ভব? আমি কি একবার ওকে ফোন করব? কথাটা ভাবতেই নিজেই আবার সাথে সাথে নাকচ করে দিলাম। ও তো এখন নির্ঘাৎ ঘুমোচ্ছে। তার চাইতে আমি নিজেই বরং নিজের মত করে লিখি। কিন্তু নিজের মত করেই বা কি লিখব? হঠাৎ মনে পরল আমার এই লেখাটা আগামীকাল লিলিয়ানা তার পুরো ক্লাসের সামনে পড়বে। আর এটা মনে পরতেই মূহুর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমি বাংলাদেশের প্রাপ্তি আর অর্জনকে হাই লাইট করেই লিখব। কারণ উন্নত বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ মানেই হতাশা, দারিদ্র, দূর্নীতি আর বন্যায় নিমজ্জিত একটা দেশ। বাংলাদেশেরও যে অহংকার করার মত কিছু থাকতে পারে, বাংলাদেশেরও যে কোন অর্জন থাকতে পারে এটা যেন এরা কল্পনাই করতে পারে না। আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাটা মনে পরে গেল। আমি এদেশে আসার কিছুদিন পরের কথা। জানুয়ারী মাস, ভীষন ঠান্ডা। চারিদিকে শুভ্র তুষারে ঢাকা। এরমধ্যেই একদিন ট্রেনে করে ফিরছিলাম। আমার মুখোমুখি একজন মধ্যবয়সি এদেশি ভদ্রলোক বসেছিলেন। ট্রেন চলতে শুরু করার কিছুক্ষন পরেই উনি আমার সাথে আলাপ করতে চাইলেন-

 

-এক্‌স্কিউজ মি! তুমি কি ইন্ডিয়ান?

 

-না আমি ইন্ডিয়ান নই, আমি বাংলাদেশী।

 

-‘ওহ্‌ সরি! আমি তোমাকে ইন্ডিয়ান মনে করেছিলাম। তোমাকে ওদের মতই দেখতে কিনা!’ ভদ্রলোক ভদ্রভাবেই নিজের ভূল স্বীকার করেন।

 

-‘না না সরি হবার কিছু নেই। আমাকে ওদের মত লাগতেই পারে তোমার কাছে। কারণ মাত্র কয়েকটা বছর আগেও আমরা একই দেশ ছিলাম।’ আমিও বিনয় করে বলি।

 

-আসলে আমি ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কেই কিছুটা জানি, বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিনা।

 

-সেটাই তো স্বাভাবিক! ইন্ডিয়া বয়সে এতটাই প্রৌ• যে তার সঠিক বয়সটাই প্রায় কেউই জানে না। আর সেখানে কিনা বাংলাদেশের বয়স সবে তিরিশের ঘরে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে মানুষ ইন্ডিয়ার চেয়ে কমই চিনবে।

 

-‘তোমাদের দেশে তো শুধুই পানি। বাংলাদেশ তো বন্যার পানিতে ডুবে থাকা একটা দেশ, তাইনা?’ ভদ্রলোক এবার বাংলাদেশ সম্পর্কে ওনার একমাত্র জ্ঞানের কথাটুকু বলেন।

 

কিন্তু এবার আমার খুব রাগ হয়! এই একটা কথা শুনতে শুনতে আমি মহাবিরক্ত। বহির্বিশ্বে প্রায় সবারই এটাই ধারণা বাংলাদেশ মানেই বন্যার পানি। বন্যা কি আর কোন দেশে হয় না? আমি নিজের বিরক্তিটুকু যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করে বলি, -‘তোমার বুঝি তাই ধারণা, সারা বছর বাংলাদেশে কেবল বন্যাই হয়, আর বাংলাদেশ সারাক্ষন বন্যার পানিতে ডুবে থাকে? কিন্তু তুমি কি জানো এই আমি আমার এত বছরের জীবনে কখনও বন্যা দেখিনি, বাংলাদেশে থেকেও?’

 

ভদ্রলোক এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, -‘তাই নাকি? আসলে দেখ, টিভিতে যা দেখায় আমরা তো সেটাই জানতে পারি। তার বাইরে তো আমাদের পক্ষে কিছু জানা সম্ভব হয়না, তাইনা?’

 

ভদ্রলোকের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারি। আমি জানি উনি ঠিকই বলেছেন। উন্নত দেশের টিভিতে আমাদের মত দেশগুলোর অন্ধকার দিক ছাড়া কখনও কোন আলোকিত দিক দেখানো হয়না। তবে আর এনার দোষ কোথায়? কিন্তু তবুও আমার রাগ যেন পরতেই চায় না। আমি হঠাৎ ছেলেমানুষের মত বলে ফেলি-

 

-এই যে তোমরা বাংলাদেশ মানেই বন্যার পানিতে নিমজ্জিত একটা দেশ বলে জান, একবারও ভেবে দেখেছ কি বাংলাদেশের এই বন্যার জন্য কোন বিষয় বা কি কারণ মূলত দায়ি?

 

আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে জবাবের অপেক্ষায় কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকি। কিন্তু পরে নিজেই আর তার জবাবের অপেক্ষা না করে বলি,

 

-‘তোমরা যারা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল মার্কেট ইকোনমি কাÏিট্র তারা নিজেদের উন্নত থেকে উন্নততর করতে গিয়ে পৃথীবির উষ-তা বাড়িয়ে দিয়ে নর্থ পুলের সমস্ত বরফ গলিয়ে সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছ। আর তার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশই শুধু নয়, এর সাথে আরও অনেক দেশ জলচ্ছ্বাস আর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। তোমরা তোমাদের প্রযুক্তির সুফলটা ভোগ করছ, আর আমাদের বিনা অপরাধেই তার কুফলটা ভোগ করতে হচ্ছে। তোমরা নিজেদের আলোকিত করতে গিয়ে আমাদের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছ। আবার এই তোমরাই ‘বাংলাদেশ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত দেশ’ বলে বেড়াও!’

 

ভদ্রলোক আমার কথা শুনে এতটাই হতভম্ব হয়ে যান যে আর কোন কথাই বলতে পারে না। আর আমিও আমার ছেলেমানুষী আচরনে অস্বস্তিবোধ করতে থাকি। কথাগুলো বলার সময় বুঝিনি যে ছেলেমানুষী হচ্ছে। তখন আমার মধ্যে শুধু ক্ষোভটাই কাজ করছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কাজটা ছেলেমানুষী হয়ে গেছে। কারণ সত্যও তো আসলে সবসময় বলা যায় না। তবে কথাগুলো বলে একটু যে ভালও লাগছে না তা কিন্তু নয়।

 

রাতের মধ্যে লিলিয়ানার এ্যাসাইনমেÏট লিখে এ্যাটাচ্‌ড করে ওকে মেইল করে দিলাম। এ্যাসাইনমেÏটটা লিখে নিজের কাছেই বেশ ভাল লাগছে আমার। কাল যখন লিলিয়ানা ওর ক্লাসে সবার সামনে বাংলাদেশ নিয়ে লেখা এই এ্যাসাইনমেÏট প্রেজেÏট করবে তখন সেখানকার সবাই বাংলাদেশ নিয়ে অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারবে। জানতে পারবে বিশ্বের দরবারে এই ছোট্ট দেশটার অর্জনও কিছু কম নয়। আরও জানবে বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলাদেশিদের অবিশ্বাস্য ইতিহাস!

 

 

 

 

পরদিন কাজ থেকে ফিরে সবে কফি নিয়ে বসেছি অমনি লিলিয়ানার ফোন এল।

 

-‘হানি থ্যাঙ্কস্‌ আ লট! তুমি নিজেও জান না তুমি আমাকে কত সুন্দর একটা এ্যাসাইনমেÏট করে দিয়েছ। আমি ক্লাসে যখন সবার সামনে পরে শোনাচ্ছিলাম তখন পুরো ক্লাস ছিল একদম পিন ড্রপ সাইলেÏট। পরা হয়ে গেলে আমার টিচার তো আমার এ্যাসাইনমেÏেটর ভীষন প্রশংসা করেছে। বলেছে আমি বাংলাদেশকে নতুন করে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। হানি আই এ্যাম রিয়েলী প্রাউড অফ ইউ এ্যান্ড আই এ্যাম প্রাউড অফ মাইসেলফ অলসো। বিকজ আই হ্যাভ আ ফ্রেন্ড লাইক ইউ।’ লিলিয়ানা বিশ্বজয়ের উত্তেজনা আর আনন্দ নিয়ে গড়গড়িয়ে কথাগুলো বলে যায়।

 

আমি আমার বাংলাদেশকে সবার সামনে নতুন ভাবে তুলে ধরতে পেরে একদিকে যেমন ভীষন আনন্দিত হই, অন্যদিকে তেমনি নিজের প্রশংসা শুনে কিছুটা অস্বস্তি হয়। তাড়াতাড়ি করে ওকে বলি, -‘অযথা এত বেশি বেশি বল না তো। আমার লেখায় তোমার হেল্প হয়েছে এটুকুতেই আমি খুশি। এখন বল শনিবার রাত তোমার কেমন কাটল?’

 

-‘না সুইটি খুব ভাল কিছু ছিলনা। আমরা সারারাত একসাথেই কাটিয়েছি ঠিকই তবে আমি এটাও বুঝেছিলাম আমি রং নাম্বারে ডায়াল করেছি।’ লিলিয়ানার বলার ঢঙ্গে কোন কষ্টবোধের ছিটেফোটাও নেই।

 

-‘ওহ্‌! সো স্যাড্‌!’ তবুও আমি কপট দুঃখ প্রকাশ করি।

 

-‘ডোÏট বি স্যাড্‌! এটা রং নাম্বার ছিল তো কি হয়েছে নেক্সট্‌ উইকে রাইট নাম্বার পেয়েও যেতে পারি।’ লিলিয়ানা দমবার পাত্রি যে নয় সেটা তার কথাতেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

 

লিলিয়ানার সাথে কথা শেষ হবার পরেও ওর কথা আমার মাথা থেকে যেতে চায় না। ওদের এই জীবনটাই কি সঠিক, ভাল? অন্তত আমাদের মত দুঃখবোধ যে ওদেরকে পিছিয়ে দেয়না এটা তো সত্যি। এই যে নিজ দেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়েছে, কিন্তু কই তার জন্য ওর মনে তো আমার মত এতটুকু কষ্টবোধ নেই! এদেশে ওরও কোন স্বজন থাকে না, তাতেও ওর কোন দুঃখ নেই। কয়েক বছর আগে এদেশি এক ছেলের সাথে ইÏটাের্নটে প্রেম হওয়াতে এদেশে চলে এসেছিল লিলিয়ানা। সেই প্রেমিকের সাথেই দু’বছরের মত ছিল ও। কিন্তু সেই প্রেমিকটিও তাকে ছেড়ে গেছে আজ অনেকদিন। লিলিয়ানা ইচ্ছে করলেই নিজ দেশে ফিরে যেতে পারত, কিন্তু সে আর ফিরে যায়নি। এখানে থাকতেই নাকি তার ভাল লাগে। সেই প্রেমিকটির সাথে বিচ্ছেদের পরে লিলিয়ানা আর কারও সাথে লিভ টুগেদার করেনি ঠিকই, কিন্তু এরকম ক্ষণস্থায়ি টুকরো প্রেম একটাদিনের জন্য সে থামিয়েও রাখেনি। আমি তার এই ক্ষণস্থায়ি প্রেমের সমালোচনা করলেই লিলিয়ানা প্রতিবাদে মুখোর হয়। বলে, -‘স্থায়িভাবে ভালোবাসার জন্য জীবনে কাউকে যতদিন না পাব ততদিন কি আমার জীবনে কোন প্রেম থাকবে না? ক্ষণস্থায়ি বা টুকরো প্রেম বলেই কি সেগুলো প্রেম নয়, সেই কাটানো সময়গুলো মধুর নয়?’ এরপরে আমি আর লিলিয়ানার সাথে তার কখনও মাসিক, কখনও সাপ্তাহিক, কখনও বা দৈনিক প্রেম নিয়ে তর্কে জড়াইনা। ওর কথা শুনলেই আমার কেবল কিশোর কুমারের গানটা মনে পরে, ‘‘পলভারকে মুঝে কই পেয়ার কারলে, ঝুঠা হি সাহি!’’ একটা পলের জন্য হলেও আমাকে কেউ ভালোবাসুক, সে ভালোবাসা মিথ্যে হলেও ক্ষতি নেই। মিথ্যে ভালোবাসাতে লিলিয়ানাদের সমস্যা না থাকলেও আমার অনেক সমস্যা আছে। আমার কাছে বরং মনে হয়, যদি মিথ্যেই হয় তবে সামান্য একটা পলের জন্যও ভালোবাসার কোন প্রয়োজন নেই। নাহ্‌ আমার পক্ষে কখনোই লিলিয়ানার মত হওয়া সম্ভব না। কিন্তু এতটা বৈপরীত্য নিয়েও আমার আর লিলিয়ানার মধ্যে বন্ধুত্ত্ব হতে কোন সমস্যাই হয়নি। আসলে বন্ধুত্ত্ব ব্যাপারটাই বোধহয় এমন। বন্ধুত্ত্ব হওয়ার কোন ফরমূলা নেই।

 

 

 

বুধবার কাজে থাকতেই মায়ের এস এম এস পেলাম। খুব নাকি জরুরী দরকার, বাসায় গিয়েই যেন ফোন করি। আমার খুব টেনশন হচ্ছে! কি হয়েছে হঠাৎ যে এমন জরুরী ফোন করতে বলা হয়েছে? আমি মাকে কতবার করে বলেছি আমাকে কখনও যেন এরকম কোন মেসেজ না পাঠায়। আর একান্ত যদি পাঠাতেই হয় তবে যেন অল্প করে হলেও কারণটা নিয়ে লেখা হয়। নইলে আমার ভীষন দুশ্চিন্তা হয়, নার্ভাস লাগে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মায়ের কোন চেঞ্জই নেই। আমার কাছে কোন কার্ড না থাকায় বাসায় যাওয়া পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। কার্ড থাকলে আমি কাজ থেকেই ফোন করতাম, এতক্ষন ধরে টেনশন নিয়ে থাকতাম না।

 

 

 

বাসায় ফিরে কোন রকমে হাতব্যাগটা নামিয়ে রেখেই দেশে ফোন করলাম। মা’ই ফোনটা রিসিভ করলেন।

 

-কি ব্যাপার মা, কি হয়েছে, এত জরুরী ভিত্তিতে ফোন করতে বলেছ যে?

 

-‘হ্যা! বিষয়টা খুব জরুরী। শোন তোর লাভলী খালার একটা ভাগ্নী ইটালীতে থাকে না? তার এক দূসম্পর্কের দেবরের সাথে তোর জন্য সে নিজেই প্রপোজাল দিয়েছে। ছেলে নিজেও ইটালীতেই থাকে। তোর সবকিছু শুনে সে নাকি তোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন তোর সাথে কথা বলতে চায়। মুন্নি মানে লাভলীর ভাগ্নীর সাথে আমার কাল রাতে ফোনে কথাও হয়েছে। মুন্নি তো তার দেবরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওখানে ছেলের নিজের ব্যবসা আছে, রোজগার অনেক ভাল। বয়সেও তোর সাথে মানানসই। সাইত্রিশ পুরে আটত্রিশ চলছে। মুন্নি বলেছে ছেলে দেখতে শুনতেও নাকি ভাল। আমি তোর মেইল এ্যাড্রেস, ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছি। মুন্নি তার দেবরের ছবি তোকে মেইল করে দেবে। আর ছেলেটা আজ, কালকের মধ্যেই তোকে ফোন করবে। তুই মা রাগারাগি না করে সুন্দর করে কথা বলিস।’ এতগুলো কথা একনাগারে বলে মা এতক্ষনে একটু থামে। কিন্তু সে মাত্র ক্ষণিকের জন্য। পরক্ষনেই আবার বলে, -‘ছেলের সবকিছু শুনে তোর বাবার পছন্দ হয়েছে। ফ্যামিলি ভাল। ঢাকাতে নিজেদের বাড়ী আছে। ছেলে একাউÏিটং এ মাষ্টার্স। ভাইবোনও বেশি না, মাত্র দুই ভাই, এই ছেলেই বড়। ফোন করলে তুই কিন্তু অবশ্যই সুন্দর করে কথা বলিস, এর আগের ঘটনার মত কিছু করবি না, বুঝলি?’

 

আমি এতক্ষন ধরে চুপচাপ শুনে গেলাম মায়ের সব কথা। শুনে মেজাজ যে আমার কতটা খারাপ হয়েছে সেটা মাকে বোঝানো সম্ভব না। আমি নিজের মেজাজকে যথাসম্ভব সংযত করে শুধু বললাম, -‘টেনশন কর না, আমাকে ফোন করলে আমি ভদ্রভাবেই তার সাথে কথা বলব। তোমার মেয়ে আর যাইহোক অভদ্র না। তবে মা, এভাবে তোমার মেয়ের এ্যাডভার্টাইজমেÏট করে না বেরালেও পারতে!’

 

-কি বললি তুই? আমি তোর এ্যাডভার্টাইজমেÏট করে বেরিয়েছি? আমি তোকে বললামই তো মুন্নি নিজেই তার দেবরের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে।

 

-মা তুমি যদি লাভলী খালার কাছে আমাকে নিয়ে নাকি কান্না না কাঁদতে তবে লাভলী খালাও তার ভাগ্নীকে বলত না, আর এই মুন্নিও তার দেবরের জন্য আমার কথা বলত না।

 

মা’ও এবার ভীষন রেগে যায়, -‘তুই কি চাস বল তো? তুই কি আর বিয়ে করবি না? আর তুই বিয়ে করতে যদি নাও চাস, আমরাই বা তোর কথা শুনব কেন? আমাদের কি তোকে বিয়ে দেয়া দায়িত্ত্ব না? আর ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিতে গেলে এরকম কথাবার্তা বলতেই হয়। যোগাযোগ ছাড়া, কোন কথাবার্তা ছাড়া এমনি এমনি কারও বিয়ে হয়ে যায় না। তুই কোন ছোট বাচ্চা না যে তোকে এত বোঝাতে হবে।’

 

আমি বুঝতে পারছি মা আমার কথায় শুধু রাগই করেনি, আহতও হয়েছে। তাই একটু নরম সুরে এবার বলি, -‘কিন্তু মা, আবারও সেই একই ভূল করে কি লাভ?’

 

-‘বিদেশে থাকলেই সব ছেলে নষ্ট হয়ে যায় না। তাছাড়া এই ছেলের আত্ত্বীয় স্বজন আছে ওখানে, সবার মধ্যে থেকে আর কতটা খারাপ হতে পারে কেউ!’ মা’র গলাও এবার কিছুটা নরম শোনায়।

 

আমি আর কথা না বাড়িয়ে সেই ইটালী প্রবাসীর সাথে সুন্দর করে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাকে শান্ত করে ফোন রাখি। কিন্তু আমার মনটা আর শান্ত হয়না। পেছনদিকের অনেক কিছুই মনে পরতে থাকে। যতই জীবনের একটা দিককে ভূলে থাকতে চাই আমি জীবনই যেন তাকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। হঠাৎ মায়ের উপরে খুব অভিমান হয় আমার। এই যে মা-বাবা আমার বিয়ের জন্য এত ভাবছে, প্রায়ই এর তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়, কথা বলতে বলে, ছবি পাঠায়। একবারও কি তাদের মনে হয়না তাদের মেয়ের জন্য একটা বিয়ে বা একজন স্বামীই শুধু না নিজের স্বজনকেও প্রয়োজন? বরং তাদের মেয়ের মত অবস্থায় ওনাদের তো মেয়েকে নিজের কাছে রেখেই তার বিয়ের কথা ভাবা উচিৎ ছিল। তাকে এভাবে একলা রেখে বিয়ে দেয়ার কথা ভাবাই হয়ত তাদের জন্য ভূল । এভাবে শুধু বিয়ের চেষ্টা না করে একবারও কি ওনারা আমাকে বলতে পারেন না ‘‘বিদেশ বিভূই এ আর এভাবে একা একা থাকতে হবে না, তুই আমাদের কাছে চলে আয়।’’ কিম্বা ‘‘তুই আগে আয় তো, পরে তোর বিয়ে নিয়ে ভাবা যাবে। আমরা তো আছিই?’’ কিন্তু না, গত কয়েকটা বছরে এই কথাটা কেউ আমাকে একবারও বলেনি। এমনকি সারে তিনবছর আগে আমি যখন মাসখানেকের জন্য দেশে গিয়েছিলাম তখনও আমি এমন একটা কথা খুব আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম বাবা নাহয় মা, কেউ একজন অন্তত বলবেন ‘‘তোর আর ফিরে গিয়ে কাজ নেই, তুই আমাদের কাছেই থাক’’। কিন্তু কেউ বলেনি কথাটা। সবাই আমাকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করাটাকেই আমার প্রতি তাদের একমাত্র দায়িত্ত্ব মনে করে। কিন্তু দায়িত্ত্ব যে আরও গভীরের উপলব্ধি সেটা কেউই বোঝে না। আজ আমার মনটা আবারও ভীষন খারাপ হয়ে যায়। অনেকদিন পরে আমার চোখ দুটো জ্বালা করে ওঠে। রাত বাড়তে থাকে। আমি ঘরে আলো জ্বালি না। আজ আর আমার খাওয়াও হয় না। সব ভূলে কিম্বা সব মনে পরে আজ অনেকদিন পরে অন্ধকার ঘরে আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমার ভীষন একা লাগে। আমার এই জীবনে মা-বাবার অভাব, স্বজনের অভাব, নিজপরিবারের অভাব, নিজভূমির অভাব, নিজের মত বলতে পারার মত মানুষের অভাব মিলেমিশে বিশাল এক শুন্যতা হয়ে আমাকে যেন ঘিড়ে ধরে। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

 

 

 

 

অন্ধকার ঘরে ঘুমহীন আমি শুয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আজ আর ঘুম আসবে না সহজে। হঠাৎই মোবাইলটা বেজে ওঠে। আমি চম্‌কে উঠি। কারণ এত রাতে ফোন পেয়ে আমি অভ্যস্ত নই। আমাকে এত রাতে কখনোই কেউ ফোন করে না। অন্ধকারের মধ্যেই মোবাইলের আলোতে ক’টা বাজে দেখতে গিয়েই ভীষন অবাক হলাম! এখন রাত বারোটা বেজে সাইত্রিশ মিনিট অর্থাৎ প্রায় মাঝরাত। কোন নাম্বারও নেই, আইডি উইথেলড্‌। এতরাতে অজানা নাম্বার থেকে ফোনকল, আমার কি রিসিভ করা উচিৎ! বুঝতে পারছি না। ভাবতে ভাবতেই লাইনটা কেটে গেল। যাক্‌ বাঁচা গেছে! মোবাইলটা বালিশের পাশে রাখতে যাব, আবারও হাতের মুঠোর মধ্যে বেঁজে উঠল। এবার আর দেরী করিনা, রিসিভ করি। আমারও তো জানা উচিত এতরাতে কে আমাকে বারবার কল দিচ্ছে।

 

-হ্যালো!

 

-‘হ্যালো! কে? আমি অনেকক্ষন থেইকা ফোন করতাছি, কেউ ধরতাছে না বইলা নম্বর ভূল মনে কইরা ফোন রাইখা দিমু মনে করছিলাম, আর অমনেই আপনে ধরলেন।’ ওপ্রান্ত থেকে অপরিচিত কন্ঠ।

 

আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা। এটা কে? এরকম ভাষায় কথা বলে এমন কারও সাথে তো আমার কোন পরিচয় নেই, অন্তত আমার মোবাইল নাম্বার জানার মত খুব কাছের কোন মানুষ এমনভাবে কথা বলে না। তাও আবার এতরাতে কল দেয়ার মত! নিজেকে আমার কেমন বোকা বোকা লাগে। তবুও বলি, -‘সরি! আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছিনা। আপনি কি আমাকেই চাইছেন, নাকি ভূল করে আমার নাম্বারে কল হয়ে গেছে?’

 

-‘ভূল হইব ক্যালা? আপনারেই চাইতাছি। আপনের মায়ের কাছে থেইকাই তো নম্বরখান আইজই লইছি। ফোন ধরছেনও আপনেই, তাইলে আর ভূল হওনের সুযোগ কোনহানে? আপনের মায় নিশ্চয়ই আমার কথা আপনের কাছে কইছে।’ লোকটি খুব গর্বিত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে।

 

এবার আমার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। এই তাহলে লাভলী খালার ভাগ্নীর দুসম্পর্কের দেবর, যার সাথে তার পরিবার তার বিয়ের কথা ভাবছে বলে তার ফোন নাম্বার তাকে না জানিয়েই দিয়ে দিয়েছে! এই লোকের সাথে তার বাবা-মা তার বিয়ের কথা ভাবছে? যে কিনা ঠিক মত কথা বলতেই জানে না, একজন ভদ্রমহিলাকে কখন ফোন করতে হয় সেটা জানে না, সে কিনা হবে আমার লাইফ পার্টনার? আমার বাবা-মায়ের উপরেই প্রচন্ড রাগ হয়! পরক্ষনেই এটাও মনে হয় বাবা-মা কি করে জানবে এই লোক কেমন, তারা তো আর এনার সাথে সরাসরি কথা বলেননি। কিন্তু এই লোক আমাকে যখন ফোন করেই ফেলেছে তখন তো ভদ্রতা করে হলেও কথা বলতে হয়।

 

-‘জ্বি! বলুন, এতরাতে কি মনে করে আমাকে ফোন করেছেন?’ আমি নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করি।

 

-অ অনেক রাইত হইছে? আপনে কি ঘুমায়া পরছিলেন? আমার কাছে তো এইডা কোন রাইতই না, তাই ভাবছিলাম আপনের লগে কথা সাইরা ফালাই।

 

এবার আর আমার নিজেকে সংযত করা কঠিন হয়ে পরে। আমি একটু গম্ভীর ভাবেই বলি, -‘রাত প্রায় একটা, এটা ফোন করার জন্য অবশ্যই অনেক রাত। তাছাড়া আমাকে অনেক সকালে উঠে কাজে যেতে হয়, তাই এতরাতে আমি কখনও জেগে থাকিনা।’ একবার মনে হল বলি, আপনি বরং কাল দিনে ফোন করবেন। কিন্তু এই লোকের সাথে আমার আর দ্বিতীয়বার কথা বলার কোনই ইচ্ছে নেই, তাই সেটা আর না বলে আমি চুপ করে থাকি।

 

-‘ও আইচ্ছা! তাইলে আপনের লগে কথা কয়টা কইয়াই ফালাই। আপনে নিশ্চয়ই শুনছেন আমার লগে আপনের বিয়ের কথা চলতাছে। ভাবীর কাছে আপনের ফটুক দেখছি আমি, খারাপ লাগে নাই। অহন আমার কয়টা বিষয় জানোনের আছে। আপনি কি ভাবতেছেন, বিয়ে অইলে আপনে এখানে আইয়া পরবেন, নাকি আমারেই আপনের ওখানে যাওন লাগব?’ আমি যে বিরক্ত হয়েছি সেদিকে লোকটির কোন ভ্রুক্ষেপই নেই, সে নির্বিকার ভাবে নিজের কথাগুলো বলে যায়।

 

কি আশ্চর্য্য! এ কেমন মানুষের পাল্লায় পরলাম আমি! কথা বলার কোন নিয়ম মানে না, কোন কথাটা কিভাবে বলতে হবে কিছুই জানে না। আমি ধৈর্য্যের শেষসীমায় পৌঁছে গেছি এবার। এবার আর কোন ভদ্রতা না করেই সরাসরি বলি, -‘আপনি সম্ভবতঃ ভূল শুনেছেন, আমার বিয়ে করারই কোন ইচ্ছে নেই। তাই আমার সাথে আপনার বিয়ের পরবর্তী জীবনের পরিকল্পনা করে কোনই লাভ নেই।’

 

আমার কথা শেষ না হতেই লোকটি কথা বলে ওঠে, -‘কিন্তু আপনের মায় যে কইছিল আপনে বিয়ে করতে রাজী আছেন? ভাবী তো সবকিছু জাইন্যা শুইন্যাই আমারে আপনের কথা কইছে!’

 

-আসলে আমার মা মনে করেছিলেন আমি এখন বিয়ে করব, তাই উনি আমাকে কিছু না জানিয়েই আপনার ভাবীর সাথে কথা বলেন। কিন্তু আমি আপাততঃ বিয়ের কথা ভাবছিনা। আপনি কাইন্ডলী কিছু মনে করবেন না।

 

মা-বাবা যখন বিষয়টা জানবেন তখনকার কথা ভেবে আমার সত্যিই কিছুটা খারাপ লাগে। কিন্তু আমারই বা কি করার আছে!

 

-‘অ তাইলে আর কি, আপনারে দেখতাছি আজাইর‌্যা ফোন করলাম।’ কথাটা বলেই লোকটি ফোন লাইন কেটে দিল। কোন বিদায় সম্ভাষন না, ভদ্রতা না। আমি যারপর নাই অবাক! এ কি! এ কেমন মানুষের সাথে আমার ফ্যামিলি আমার বিয়ের কথা ভাবছিল?

 

 

 

ঐ রাতের পরে সকালে উঠেই মাকে ফোনে বিস্তারিত জানিয়েছিলাম আমি। সব শুনে মা নিজেই বুঝেছিলেন ওখানে সম্বন্ধ করা সম্ভব না। পরে মা’ই লাভলী খালা আর তার ভাগ্নীকে সামলেছিলেন। ঐ ঘটনার পরে প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে আমাকে আর বিয়ে নিয়ে কিছুই বলেনি মা বা বাবা। আমিও আমার বৈচিত্রহীন জীবন কাটিয়ে যাচ্ছি। রোজ সকালে কাজে যাই, আবার বিকেলে কাজ থেকে ফিরে একার ঘরকন্যা করি। আর অবসরে ইÏটার্নেটে দেশের টিভি প্রোগ্রাম দেখি। আসলে এসব আমাকে করতে হয় বলেই করি আমি। এসব কোন কাজেই আমার কোন প্রাণ থাকে না। ইন্‌ফ্যাক্ট আমার এই জীবনটাকেই তো আমার নিজের বলে মনে হয় না। মনে হয় অন্যের জীবন যাপন করে যাচ্ছি যেন আমি। এ যেন আমার জন্য নির্বাসন।

 

সেদিন কাজের এত প্রেসার ছিল যে লাঞ্চের সময়টুকুতেও টান পরেছিল। কোনরকমে হালকা কিছু দিয়ে লাঞ্চ সারতে হয়েছিল আমাকে। ফলে বিকেল হতে না হতেই আমার প্রচন্ড ক্ষিধে পেয়ে যায়। অথচ আজ আমার ফ্রিজে তেমন কোন খাবারও নেই যে ঘরে ফিরেই আগে কিছু খেয়ে নিতে পারি। কিছু খেতে হলে আমাকে সেটা রেঁধেই খেতে হবে, আর এখন এটা ভাবতেও নিজের জন্য কষ্ট লাগছে আমার। এত ক্ষুধা নিয়ে রাঁধতে বসা যে কত কষ্ট সেটা শুধু সেই বুঝবে যার এই অভিজ্ঞতা আছে। শেষ পর্যন্ত এটাই ঠিক করলাম, আজ আমার বাসার কাছের শপিংমল থেকে কিছু একটা খেয়ে তবেই বাসায় যাব। যদিও একা একা কোন রেষ্টুরেÏেট খেতে আমার মোটেও ভাল লাগে না। তবে এটা ভাবাটাও আমার জন্য ন্যাকামি! আমি নির্ভেজাল একা মানুষ, দোকা পাব কোথায়? তাছাড়া এরকম ভয়ংকর ক্ষিধের মুখে অতশত ভাবারও কোন অবকাশ নেই। আমি আমার ষ্টেশনে নেমে সোজা গিয়ে ম্যাক্‌ডোনালড্‌সে ঢুকলাম। ম্যাক্‌ডোনালড্‌সের খাবার আমার বেশ ভালই লাগে খেতে। কিন্তু প্রচুর ফ্যাট বলে খুব একটা খেতে চাই না আমি। তবে ক্ষুধার তাড়নায় আজ আমি সব ভাবনা, সব সচেতনতার উর্ধ্বে। এখন আমার কাছে সেই খাবারটাই সবচাইতে বেশি গ্রহনযোগ্য যেটা সবচাইতে কম সময়ে আমি খাবার সুযোগ পাব। সেই হিসেবে ম্যাক্‌ডোনালড্‌স ইজ দা বেষ্ট প্লেস। তবে যদি ভীড় থাকে তো সেখানেও অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু আমার ভাগ্যটা ভালই দেখা যাচ্ছে, আজ তেমন একটা ভীড় নেই। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমার টার্ন চলে এল। আজ আর অল্পতে হবে না ভেবে বিগ্‌ম্যাক্‌ এর বড় একটা মেন্যু অর্ডার করলাম। সাথে এ্যাপেল পাই। আজ এটাই আমার ডিনার। ভাবতেই ভাল লাগছে, বাসায় ফিরে আজ আর আমাকে রান্নার ঝামেলায় যেতে হবে না। খাবার পরে যাবার আগে নাহয় একটা লার্জ কফি খেয়ে একদম রিফ্রেশ হয়েই ঘরে ফিরব। যেন ফিরে গিয়ে বাকী সময়টুকু আমি স্রেফ রিল্যাক্স করতে পারি। আহ্‌! কি শান্িত আজ আমাকে রাঁধতে হবে না! ভীষন দক্ষতা আর দ্রুততায় ম্যাক্‌ডোনালড্‌সের অর্ডার ডেলিভ্যারী দিতে ব্যস্ত টিন্‌ ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘আজ তোমরাই আমার জন্য রাঁধো, আমি আরাম করি।’

 

আমার খাবার এসে গেছে। খাবারের ট্রেটা হাতে নিয়ে বসার জন্য নিরিবিলি কোন জায়গা খুঁজতে খুঁজতে দোতলায় চলে এলাম। কারণ নীচের সবগুলো বসার জায়গাই প্রায় ভরা। আর অপরিচিত কারও সাথে টেবিল শেয়ার করতে ভাল লাগে না আমার। উপরে এসে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কয়েকটা টেবিলই নিরিবিলি পরে আছে। যেদিকে অপেক্ষাকৃত কম মানুষ বসেছে আমি সেদিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। আহ্‌! এখন এই নিরিবিলিতে বেশ অনেকটা সময় রিল্যাক্স করে বসা যাবে। আমি আর দেরী না করে খাবারের প্রতি মনোযোগ দিলাম। সত্যি আজ ভীষন ক্ষিধে পেয়েছে আমার। আমি কোনদিকে না তাকিয়ে খেতে থাকি। হঠাৎ বাংলা কথা শুনে চম্‌কে উঠলাম আমি! বাঙ্গালী কেউ কি আমাকে কিছু বললো? আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম না। কাউকে বাঙ্গালীও মনে হল না। তাহলে বাংলায় কে কথা বলছে এখানে! কিন্তু আর কোন কথা শুনতে পেলাম না বলে আমার মনের ভূল মনে করে আবারও খাওয়াতে মনোযোগ দিতে যাব, অমনি আবারও বাংলা কথা শুনতে পেলাম। বিদেশে এই এক মুস্কিল! আশেপাশে একই ভাষাভাষি কেউ যত মৃদু স্বরেই কথা বলুক না কেন ঠিকই স্পষ্টভাবে কানে চলে আসে। আমি এবার বুঝতে পারলাম কে কথা বলছে। আমার টেবিলের কোনাকুনি দ্বিতীয় টেবিলে একজন ভদ্রলোক মোবাইলে কথা বলছেন। আমার দিকে পিছন ফিরে বসে আছেন বলে ওনার চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছিনা, ফলে উনি যে বাঙ্গালী একজন সেটাও বুঝিনি আমি। যাইহোক অন্যের কথা আড়ি পেতে শোনা গর্হিত কাজ জেনেও এখন আমাকে বাধ্য হয়েই ওনার কথাগুলো শুনতে হচ্ছে। কারণ উনি আমার শ্রবনযোগ্য দূরত্ত্বে বসেছেন। তবে আমার কাজটা নিশ্চয়ই গর্হিত কোন কাজ হচ্ছেনা, কারণ আমি আড়ি না পেতেই ওনার কথা শুনছি এবং অনিচ্ছাতেই। অবশ্য ভদ্রলোকের কথার বিষয়বস্তু মোটেও আপত্তিজনক কিছু না, যা অন্যে শুনে ফেললে খারাপ কোন ব্যাপার হবে। উনি ওনার মায়ের সাথে কথা বলছেন। আমার বরং ভালই লাগছে ওনার ফোনালাপ শুনতে। একা একা খাচ্ছিলাম, এখন বরং ভদ্রলোকের মায়ের সাথে গল্প ইন্ডাইরেক্টলী আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে। আমি আমার খাবার এবং ভদ্রলোকের কথা, দুটোতেই একসাথে মনোযোগী হই।

 

-‘তোমার ছেলে আজ কতদিন ভাত খায়নি, তোমার রান্না খাবার খায়নি, তারপরেও তুমি তাকে ভাল থাকতে বলছ মা?’

 

ভদ্রলোকের কন্ঠে একটু যেন অভিমান। আহারে আহçাদি ছেলে, এই বয়সেও মায়ের কাছে তার কি ভীষন অভিমান! কি জন্য? না, তিনি বিদেশে এসে কয়েকদিন মায়ের হাতের রান্না আর ভাত খাননি বলে! আমার হাসি পেয়ে যায়। পরতো আমার অবস্থায় তবে বুঝত এত আহçাদিপনা কোথায় দেখাত!

 

-‘আরে, আমি কি আর বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজতে বাকী রেখেছি! অনেক খোঁজ করেছি। কিন্তু এর আগের ক’টাদিন নর্থের যে এলাকায় ছিলাম, ওখানে এরকম কোন রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে পাইনি। একে তাকে জিগ্যেস করেও কারও কাছে থেকেই বাংলাদেশি কোন রেষ্ট্রুরেÏেটর হদিস পাইনি আমি। আর এখানে তো গতপরশু এসেই কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পরলাম যে এখনও দেশি রেষ্ট্রুরেÏট খোঁজার সুযোগই পেলাম না। কালকেও খুব ব্যস্ত থাকব। কিন্তু পরশুদিন আমাকে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে বের করতেই হবে, নইলে আমি মরেই যাব। ভাত না খেয়ে আমি আর সত্যি থাকতে পারছি না মা।’

 

 

ভদ্রলোকের কথা শুনে আমি মনে মনে বলি, -‘তুমি বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজতেই থাক বাবাজীবন, কিন্তু কখনোই তোমাকে এই দেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজে পেতে হচ্ছে না। তুমি তো আর জানোনা বাংলাদেশিদের আত্মবিশ্বাস কতটা দূর্বল! ইউরোপ, আমেরিকায় বাংলাদেশিরা চুটিয়ে রেষ্ট্রুরেন্ট ব্যবসা করছে। কিন্তু ঐ আত্মবিশ্বাসের অভাবে তারা কেউই নিজেদের সেই রেষ্ট্রুরেÏেটর নামকরন বাংলাদেশি কোন নামে বা বাংলা কোন শব্দ দিয়ে করে না। তারা বাংলাদেশি হয়েও তাদের রেষ্ট্রুরেÏেটর ইন্ডিয়ান নাম রাখে। তারা মনে করে ইন্ডিয়া মানচিত্রের বিশাল জায়গা দখল করে থাকা অতি প্রাচীন একটা দেশ, যাকে সবাই চেনে। তাই ইন্ডিয়ান নাম হলে তাদের রেষ্ট্রুরেÏট চলবে ভাল। আর বাংলাদেশ যেহেতু মানচিত্রের মাইক্রোস্কোপিক জায়গা নিয়ে থাকা বয়সে অনেক নবীন একটা দেশ, সেহেতু তাকে কেউ চেনেও না, বাংলাদেশের নামে রেষ্ট্রুরেÏট হলে সেই রেষ্ট্রুরেÏট চলবেও না। এসব দেশের ইন্ডিয়ান রেষ্ট্রুরেÏট নামে প্রচলিত ম্যাক্সিমাম রেষ্ট্রুরেন্টই আসলে বাংলাদেশি। কিন্তু বাবাজীবন তুমি যদি সেটা না জানো তবে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হওয়া ছাড়া তোমার ভাগ্যে তো আর কিছুই জুটবে না।’ আমি খেতে খেতে হালকা মুডে মনে মনে ভাবি। আবারও কানে কিছু কথা এসে যায়-

 

-‘কি আর খাব! সেই ‘‘ফাষ্টফুড’’ নামে খ্যাত সারাবিশ্বের মাথা কিনে নেয়া তুলতুলে দুটো ময়দার গোলাকার কুশনের মধ্যে জুতার শুকতলির মত শুকনো এক টুকরো মাংশখন্ড আর কিছু সালাড দেয়া বার্গার! সাথে আলু ভাজা, যার এদেশীয় পোশাকী নাম ‘‘ফ্রেঞ্চ ফ্রাই’’! ক’দিন ধরে এই তো খাচ্ছি। খাচ্ছি আর সেই সাথে ম্যাক সাহেবেরও মুন্ডু চিবাচ্ছি!’ ভদ্রলোক মহাবিরক্তি নিয়ে বলে।

 

আমি এবার হেসেই ফেললাম বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে ভদ্রলোকের স্বরচিত বর্ণনা শুনে! বেশ মজার মানুষ তো! এখন আমার ওনার চেহারাটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। একজন ভেতোবাংগালী, তার উপরে আবার মায়ের আহçাদী ছেলে, সর্বোপরি ফাষ্টফুড নিয়ে যার এমন অভিনব বর্ণনা তাকে দেখার এমন নির্দোষ কৌতুহল আমার তো হতেই পারে। আমি ভাবতে না ভাবতেই দেখি ভদ্রলোক তার মাকে ‘বাই’ বলে তার উচ্ছিষ্ট খাবারের ট্রে নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। এখন ওনাকে বেরিয়ে যেতে হলে আমার পাশে দিয়েই যেতে হবে। আমি তখন তাকে দেখতে পাব। বাহ্‌! আমার সব ইচ্ছেই যদি এমনি করে ভাবতে না ভাবতেই বাস্তবায়িত হয়ে যেত! কিন্তু হায়, তা তো আর হয় না! ভদ্রলোক এদিকেই আসছেন দেখে আমি সুবোধ চেহাড়া করে আমার খাবারের দিকে পৃথিবীর সব মনোযোগ ঢেলে দেই। তারপর উনি ঠিক আমার কাছাকাছি আসতেই যেন হঠাৎই মুখ তুলে তাকিয়েছি এভাবে ওনার দিকে একবার তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। আমি মূহুর্তেই চোখ নামিয়ে নিলাম। মায়ের আহçাদী ছেলে দেখতে ভালই। বয়সে আমার চেয়ে খুব বেশি বড় হবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু একি উনি দাঁড়িয়ে পরলেন কেন! আমি না তাকিয়েই বুঝলাম ভদ্রলোক আমার টেবিলের পাশেই দাঁড়িয়েছেন।

 

-‘একস্কিউজ মি! আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’ ভদ্রলোক আমাকেই প্রশ্নটা করলেন।

 

-‘জ্বি! আপনার ধারণা ঠিক, আমি বাংলাদেশি।’ আমি এবার সরাসরি ওনার দিকে তাকিয়ে জবাব দেই।

 

-আপনি কি এখানেই থাকেন? মানে আমি বলতে চাইছি আপনিও কি আমার মত মাত্র ক’দিনের জন্য এখানে এসেছেন, নাকি এখানেই থাকেন?

 

-আমি এখানে বেশ কয়েক বছর ধরেই আছি যখন তখন আপাততঃ এখানেই থাকি বলা যায়।

 

-‘ওহ গড! ফাইন্যালী!’ ভদ্রলোকের বলার ঢঙ্গে মনে হল তিনি প্রায় বিশ্ব জয় করে ফেলেছেন।

 

আমি চোখে প্রশ্ন নিয়ে ওনার দিকে তাকাতেই উনি নিজেই বললেন, -‘আসলে হয়েছে কি, আমি কয়েকদিন ধরে এদেশে আছি।’ এটুকু বলেই ভদ্রলোক হঠাৎই যেন মনে পরেছে এমন ভাবে বলে ওঠেন, -‘আচ্ছা আমি কি আপনার এখানে বসে কথা বলতে পারি? অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে!’

 

আমি ব্যস্ত হয়েই বলি, -‘সরি আমারই হয়ত আপনাকে আগেই বসতে বলা উচিত ছিল। প্লিজ্‌!’

 

ভদ্রলোক হাতের ট্রেটা পাশের একটা খালি টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলেন, -‘না না, সরি হবার কিছু নেই। ইউরোপে থাকুন আর দেশেই থাকুন, বাঙ্গালী মেয়েরা তো বাঙ্গালীই থাকে। তারা চট্‌ করে কোন অচেনা পুরুষকে তার সাথে বসতে বলতে পারে না।’ তারপরেই বলেন, -‘হ্যা! যা বলছিলাম। বাই দা ওয়ে, আগে আমার পরিচয়টা দিয়ে নেই। আমি আজওয়াদ আরীজ!’ বলতে বলতে ভদ্রলোক আবারও উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশ্যাক করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। আমি একটু অস্বস্তিতে পরি। দেশের বাইরে আসার পরে হ্যান্ডশ্যাক তো হরহামেশাই করতে হয় আমাকে, কিন্তু তারপরেও কোন দেশি মানুষের সাথে এটা করতে আমার যেন কেমন লাগে। তার উপরে এখন আবার আমার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া হাত! আমি চট্‌ করেই একটু হেসে ওনাকে বলি, -‘একটু আগে আপনি নিজেই বললেন পৃথিবীর যেকোন দেশেই যাক না কেন, বাঙ্গালী মেয়ে বাঙ্গালীই থাকে। আর এখন কিনা আপনি নিজেই সেই বাঙ্গালী মেয়ের সাথে ইউরোপীয় কায়দায় পরিচিত হতে চাইছেন?’ ভদ্রলোক একটু যেন থম্‌কে যান। তারপরেই হা হা করে হেসে উঠে বলেন, -‘আপনি সুযোগের বেশ সদ্ব্যাবহার করতে পারেন দেখছি!’

 

-‘আজকাল জীবন যা হয়েছে আমাদের, কোন রকমের সুযোগ কি আর মেলে চট্‌ করে যে তাকে পেলে হেলায় হারাব? আজকাল তো সুযোগ পেতেও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হয়।’ আমিও হালকা মেজাজে বলি।

 

-‘বাহ্‌! বেশ বললেন তো!’

 

ভদ্রলোক আবারও বসেছেন। এবার উনি ওনার কথাগুলো গুছিয়ে বলতে চাইলেন, -‘আমি আজওয়াদ আরীজ। দেশে একটা মালটিন্যাশনাল কোম্পানীতে আছি। অফিসের থ্রুতেই আমার এই ইউরোপে আসা। আপনার এই দেশে আর আশেপাশের আরও কয়েকটা দেশ মিলে প্রায় দু’মাসের প্রোগ্রাম। আমাকে ছুটোছুটির উপরেই এই কয়েকটাদিন থাকতে হচ্ছে, হবে। কিন্তু তাতে কোনই সমস্যা নেই আমার। আমি ষ্ট্র্রেস্‌ নিতে পারি। কিন্তু আমি যা পারিনা তা হলো, এক নাগারে অনেকগুলোদিন ভাত না খেয়ে থাকা। আমি জানি আপনার কাছে বিষয়টা খুব ফানি মনে হচ্ছে। কিন্তু সত্যি বলছি আক্ষরিক অর্থেই আমি একজন ভেতোবাঙ্গালী। গত তেরোটাদিন আমি ভাত খাওয়া তো দূরের কথা, ভাত চোখেও দেখিনি। বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্ট খুঁজে বের করতে প্রাণান্ত করেছি! ইন্টার্নেটেও সার্চ করেছি, কিন্তু একটাও পাইনি। আপনি কাইন্ডলী আমাকে একটা বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্টের এ্যাড্রেস বলে দিন।’

 

ভদ্রলোক এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আমার মুখের দিকে এমন করে তাকিয়ে রইলেন যেন এখন ওনার একমাত্র আশা ভরষা সব আমার উপরে নির্ভর করছে। যেন আমি এখন কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর হদিস দিয়ে ওনাকে প্রাণে বাঁচাব, নইলে উনি বেঘোরে মারা যাবেন। আমার ভীষন হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু এখন হাসলে সেটা অশোভন দেখাবে। ভদ্রলোক মনে করবেন ওনার ভাত খেতে না পারার কষ্টটা আমি উপলব্ধিই করতে পারিনি, বরং পরিহাস করছি। আর ব্যাপারটা ওনাকে আহত করবে। আমি নিশ্চয়ই সেটা করতে পারিনা। আমার রোজ ভাত না খেলেও চলে বলে সবারই চলতে হবে এমন ভাবাটা নিশ্চয়ই আমার ঠিক না। আমি নিজেকে যথাসম্ভব গম্ভীর রেখেই বলি-

 

-‘আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। ইনফ্যাক্ট আপনি যখন আপনার মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলছিলেন তখনই আমি বুঝেছি আপনি ভাতের জন্য কতটা অস্থির হয়েছেন।’ ভদ্রলোক আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাতেই আমি একরাশ অস্বস্তি নিয়ে অপরাধী স্বরে বললাম, -‘ইয়ে, মানে আপনার কথাগুলো আমার এখান থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ইচ্ছে না থাকলেও শুনতে হয়েছে আমাকে।’

 

ভদ্রলোক এবার হা হা করে হেসে ওঠেন।

 

-‘আরে আপনি এভাবে বলছেন কেন? এমন করে বলছেন যেন আমার কথা শুনে ফেলে আপনি কোন ক্রাইম করে ফেলেছেন। আপনি শোনাতে বরং ভালই হয়েছে আমার। আপনাকে আমার আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না যে আমি ভাতের জন্য সত্যি কতটা কাঙ্গাল হয়েছি।’ ভদ্রলোক অসহায় মুখ করে বলেন।

 

আমি এবার ওনার কাছে এখানকার বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর নামগত রহস্য উন্মোচন করে বলি, -‘কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর নামই যেহেতু বাংলা বা বাংলাদেশি নয় তাই ইÏটার্নেটে হাজারও সার্চ করেও আপনি কোন দেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে পাবেন না। আর এদেশিরা নিজেরাও তো বাংলাদেশিদের ভিতরের কথা জানে না, তাই তারা ঐ রেষ্ট্রুরেÏটগুলোকে ইন্ডিয়ানই মনে করে। আর সেকারনেই আপনি যখনই ওদের কাছে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খোঁজ জানতে চাইবেন তখন ওরা একটা কথাই বলবে ‘এখানে কোন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট নেই।’

 

ভদ্রলোক যারপর নাই অবাক হয়ে বললেন, -‘কিন্তু কেন? কেন বাংলাদেশিরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করে পক্ষান্তরে ইন্ডিয়ার পাবলিসিটি করছে? ঠিক আছে শুরুতে এরা বাংলাদেশের সাথে পরিচিত ছিলনা বিধায় বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেট নয় একটু কমই যেত। কিন্তু কিছুদিন পরে তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর সাথে পরিচিত হয়ে যেত এবং বাংলাদেশিরা এভাবে হলেও কিছুটা তো অন্তত নিজেদের দেশকেও বিশ্বের দরবারে পরিচিত করতে পারত। আমার মাথায় সত্যি ঢুকছে না কেন আমাদের দেশের মানুষের আত্মবিশ্বাসের এত অভাব!’

 

আমার কাছেও এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। আমিও ঠিক এভাবেই অবাক হয়েছিলাম যখন প্রথম দেশ থেকে আসি। আসলে বাংলাদেশি ব্যবসায়িরা তাদের ব্যক্তিগত লাভটাকেই বড় করে দেখতে চান, দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে ভাবাটা ওনাদের কাছে হয়ত অপ্রয়োজনীয়। আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়াই না। ওনাকে সেÏট্রালের খুব প্রমিনেÏট একটা লোকেশনের বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেন্টে যাবার সহজ ওয়ে বুঝিয়ে দেই।

 

ভদ্রলোক কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, -‘আজ আপনি একজন প্রকৃত বন্ধুর মত আমার উপকার করলেন। থ্যাঙ্কস্‌ আ লট!’

 

-এত সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য এমন ঝাঁপি ভরা ধন্যবাদ দেবেন না প্লিজ্‌। আমি না হয়ে অন্য যে কোন বাংলাদেশিকে জিগ্যেস করলে তারাও আপনাকে এই সাহায্যটুকু করত।

 

-হয়ত করত। তবে আপনার মত করে এতদিন আমার বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে না পাবার কারণ বুঝিয়ে বলত না। সেক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট খুঁজে না পাবার সমস্যায় বারবার পরতাম। কিন্তু আপনার কল্যানে এখন তো আমার আর সেই ভয় রইল না। আমি এখন ইÏটার্নেটে ‘‘ইন্ডিয়ান রেষ্ট্রুরেÏট’’ সার্চ করলেই এক ডজন বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏট পেয়ে যাব, তাইনা?

 

-তা ঠিক!

 

-‘আচ্ছা দেখুন আমি কতটা অভদ্র, শুরু থেকে শুধু নিজের সমস্যা নিয়েই কথা বলে যাচ্ছি, আপনার সম্পর্কে কিছুই শোনা হল না!’ ভদ্রলোক অপরাধী ভঙ্গিতে বলেন।

 

-এটা খুব স্বাভাবিক! আমরা তো প্ল্যান করে গল্প করতে বসিনি যে একে অন্যের পরিচয় জেনে তবেই কথা বলব। আপনি একটা সমস্যায় পরেই না আমাকে দেশি মানুষ পেয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। আপনার কাছে তখন আমার বাংলাদেশি পরিচয়টাই একমাত্র জরুরী ছিল, আর আপনি সেটা শুরুতেই জেনে নিয়েছেন। কাজেই আমার সম্পর্কে আপনি একেবারে যে কিছুই জানেন না তা তো নয়! বরং আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়টাই আপনি জানেন, জানেন আমি একজন বাংলাদেশি! এর বাইরে ব্যক্তি আমি এমন বিশাল কিছু নই যা না শুনলেই নয়।

 

-‘আপনি এমন গুছিয়ে কথা বলেন যে তার কোন ফাঁক থাকে না, যেখান দিয়ে ঢুকে পরা যায়।’ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলেন। পরক্ষনেই আবার বলেন, -‘অন্তত নামটা তো জানাই উচিত, নয় কি?’

 

-‘হ্যা! সেটা আপনি এখনও জানতে পারেন। আমি অপরাজিতা। এই দেশে পাঁচ বছরেরও বেশি হল আছি। একটা ছোটখাট চাকরী করি। এই তো আমার সম্পর্কে বলার মত এটুকুই আছে আমার! কথাগুলো বলে আমি এবার আমার খাবারের ট্রে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমার খাওয়া শেষ। এবার উঠতে হবে। কফি খাব ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন আর খেতে ইচ্ছে করছে না। ঘরে ফিরেই খাব।

 

ভদ্রলোক বোধহয় বুঝতে পারলেন আমি এবার যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনিও উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, -‘আমি বোধহয় আপনার অনেক দেরী করিয়ে দিয়েছি। এনিওয়ে আপনার সময় এবং সাহায্যের জন্য আবারও অনেক ধন্যবাদ।’ কথাগুলো বলে ভদ্রলোক একটু থামেন কিছু যেন বলতে চান, কিন্তু বলবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। তারপর একটু যেন ইতস্ততঃ করে বলেন, -‘আপনার কÏটাক্ট নাম্বার চাওয়াটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা! আসলে এখনও তো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে, আবার কখনও কোন প্রয়োজনে আপনার পরামর্শ নেয়া যেত।’ ভদ্রলোক আবারও খানিক থামেন। কিন্তু মূহুর্তকাল মাত্র। আবারও বলেন, -‘না থাক! একটু আলাপেই কোন মহিলার কÏটাক্ট নাম্বার চাওয়া মোটেও শোভন কাজ নয়। আর আপনার জন্যও সদ্যচেনা কাউকে কÏটাক্ট নাম্বার দিয়ে দেয়াটাও বিবেচকের কাজ হবে না নিশ্চয়ই। আপনি বরং আমার নাম্বারটা রাখুন। ইচ্ছে হলে কল করবেন, ইচ্ছে না হলে করবেন না। তবে করলে খুশি হব। আর আপনার আজকের উপকারটুকু মনে থাকবে আমার।’

 

আমি তখনও বসেই ছিলাম। নিজের সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ওনার কথাগুলো শুনছিলাম। উনি যা বলেছেন খুব সত্যি কথা। তবে এতকিছুর পরেও মানুষ কখনও কখনও মানুষকে ক্ষণিক দেখেও খানিকটা হলেও বোঝে। অন্তত এই লোক যে কোন খারাপ মানুষ নয় সেটুকু বলা যায়। তাছাড়া কাউকে নিজের মোবাইল নাম্বার দিলে আমি অকুল পাথারে পরে যাব, এমনটাও ভাবিনা আমি। মোবাইল নাম্বার নিজের জন্মপরিচয় তো নয় যে চাইলেও পালটে ফেলা যাবে না। আমি আমার ব্যাগ থেকে কাগজ, কলম বের করতে গিয়ে নাম্বারটা লিখে দেয়ার মত কোন কাগজ খুঁজে পাইনা বলে একটা টিস্যু পেপারেই আমার মোবাইল নাম্বারটা লিখে ওনার দিকে বারিয়ে দেই। ওনাকে বেশ আনন্দিত দেখায়।

 

-‘বাহ্‌! দিয়ে দিলেন? ভয় হল না? বাঙ্গালী মেয়েদের তো নিজের কÏটাক্ট নাম্বার দিতে নার্ভাস লাগে বলে শুনেছি।’ ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন।

 

-‘আপনাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে আমার। আর ভদ্রলোকের সাথে মানুষ ভদ্রতাই করে। আমিও করলাম।’ আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলি।

 

-আপনার ভদ্রতার জয় হোক!

 

শপিংমল থেকে বেরিয়ে এসে আমি আমার বাসার পথ ধরার আগে বললাম, -‘আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভাল লাগল। ভাল থাকবেন।’

 

-আপনি বুঝি কাছেই থাকেন? আমিও এখানে একটা রেষ্টহাউসে উঠেছি। কখনও হয়ত আবারও এখানে দেখা হয়ে যেতে পারে আমাদের। তবে দেখা হোক বা না হোক যাবার আগে একবার হলেও ফোনে নিশ্চয়ই কথা হবে। আপনিও ভাল থাকবেন।

 

আমরা যে যার পথ ধরি।

 

 

 

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে বিকেলে আবারও ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি যেন ঘোড়দৌড়ের মধ্যে থাকি। তাই এই সময়টুকুতে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার তেমন কোন অবকাশ হয়না আমার। তবে আজ যখন লাঞ্চব্রেকে লাঞ্চ নিয়ে বসেছিলাম। তখন হঠাৎ করেই ভদ্রলোকের কথা মনে পরে গেল। কি যেন নাম বলেছিলেন! খুব খটমট একটা নাম! আজির না কি যেন? নাহ্‌, কিছুতেই মনে এল না। আসলে এই সময়ে ওনার কথা মনে পরার একটাই কারণ, আমি ভাবছি, ভদ্রলোক কি আজকের লাঞ্চে ভাত খেতে পারছেন? ভাতের জন্য অনেক বাঙ্গালীই অস্থির হয় শুনেছি, কিন্তু নিজের চোখে এই প্রথম দেখলাম। আচ্ছা আমি কেন ভাতের জন্য এমন অস্থির হইনা? আমি কি তবে খাঁটী বাঙ্গালী নই? ধুর্‌, কি যে সব ভাবছি! শুধু ভাতের জন্য পাগল হলেই বুঝি বাঙ্গালী হওয়া হয়! তাহলে বাংলাদেশ ছাড়াও যে দেশগুলোতে ‘‘ভাত’’ ই প্রধান খাদ্য তারাও তাহলে বাঙ্গালী হয়ে যেত। আমি নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দেই।

 

 

 

 

কাজ শেষে আজ আর আমি শপিংমলে ঢুকিনা। আজ আমার কোন কেনাকাটা নেই। ষ্টেশন থেকে সোজা বাসায় চলে আসি। তারপর রান্না, খাওয়া সেরে সবে এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে বসেছি অমনি মোবাইল বেজে উঠল। হাতে নিয়ে অপরিচিত নাম্বার দেখে কে হতে পারে ভাবতে ভাবতেই রিসিভ করি।

 

-‘ওহ্‌! আপনি রিসিভ করলেন তাহলে?’ ওপ্রান্েত সেই ভদ্রলোক।

 

-‘আমি রিসিভ করব না এমনটা মনে হল কেন আপনার? রিসিভই যদি না করার প্ল্যানই থাকত আমার তবে আপনাকে আমি নিজের নাম্বারটা দিলাম কেন?’ ওনার কথায় আমি খানিক অবাক হই।

 

-আপনাকে ফোন করতে পারব কিনা জানতে চেয়ে প্রায় ঘÏটা খানেক আগে এস এম এস করেছিলাম আমি। কিন্তু এতটা সময় অপেক্ষা করেও আপনার কাছে থেকে কোন রিপ্লাই না পেয়ে ভয়ে ভয়ে এখন কল করেছিলাম। ভাবছিলাম আপনি রিসিভ করবেন কি করবেন না!

 

-আপনি এস এম এস করেছেন? সরি! আমি নোটিশ করিনি। আসলে কাজ থেকে ফিরে এসময়টুকু আমি খুব ব্যস্ত থাকি, তাই মোবাইলের দিকে আর মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়না। যাইহোক, কেমন আছেন?

 

-আরে সেটা বলতেই তো আপনাকে ফোন করা।

 

-‘মানে?’ আমি বেশ অবাক হই!

 

-বলছি, আজ সারাদিনের কাজ সেরে আমি ভাবলাম আপনার দেয়া ঠিকানা মিলিয়ে সেই রেষ্ট্রুরেÏেট গিয়ে মন ভরে ভাত খেয়ে আসি। গেলামও। কিন্তু গিয়ে যা খেলাম তাতে পেটটাই ভরল শুধু, মন একটুও ভরল না।

 

-কেন বলুন তো? খাবারের টেষ্ট বুঝি ভাল লাগেনি?

 

-না তা নয়। যা খেয়েছি সেগুলোর টেষ্ট বা গুনাগুন ব্যাখ্যায় যাব না আমি। আমি কেবল এটুকুই বলব, যা খেয়েছি তা মোটেও কোন বাঙ্গালী খাবার নয়। আর যে ভাত খেয়েছি সেটাও ভাত না।’

 

-‘মানে? ভাত না হলে সেটা কি?’ আমি ওনার কথার কিছুই বুঝিনা।

 

-‘সেটা রাইস।’ উনি বেশ গম্ভীর ভাবে বলেন।

 

ওনার কথায় আমার এমন ভাবে হাসি এসে গেল যে শত চেষ্টাতেও আমি সেটা গোপন করতে পারলাম না। আমি হাসতে হাসতেই বললাম, -‘রাইস আর ভাতে পার্থক্য কি?’ রাইস কি ভাত না?’

 

-‘পার্থক্য নেই মানে? কি বলছেন আপনি? রাইস শব্দের বাংলা করলে ভাত হয়, এটা সত্যি। কিন্তু আপনাদের এখানকার রাইসের সম্ভবত কোন বাংলা নেই। এখানে রাইস রাইসই থেকে গেছে, বাঙ্গালী ভাত হয়নি। রেষ্ট্রুরেÏেট যা খাওয়ানো হচ্ছে সেটা খেয়ে আমার কাছে মোটেও মনে হয়নি আমাদের ভাত খাচ্ছি। তাছাড়া ছুরি, চাকু দিয়ে খেলে সেটা ভাত হয় নাকি!’ ভদ্রলোক ভীষন সিরিয়াসলী বলেন।

 

আচ্ছা এক ভাতপাগলের পাল্লায় পরা গেছে যাহোক! কিন্তু কি আর করা, কিছু তো বলতেই হয়, কিন্তু কি বলব সেটাই ভাবছিলাম, এর মধ্যে উনিই আবার কথা বলে ওঠেন।

 

-তাছাড়া অন্যান্য যা খেলাম সেসবও ইউরোপীয় কায়দায় রান্না, যা খেয়ে আমার মত ভেতোবাঙ্গালীর মন ভরার প্রশ্নই ওঠে না।

 

-‘আসলে ব্যাপারটা কি জানেন, এখানে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏটগুলো ইউরোপীয়দের জন্যই, তাই তারা যেভাবে খেতে পছন্দ করবে সেটা মাথায় রেখেই সবকিছু রাধার ষ্টাইল নির্ধারিত হয়। আমরা যারা বাঙ্গালী তারা কে আর আমাদের দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট খেতে যাই বলুন? আমরা কখনও রেষ্ট্রুরেÏেট খেতে চাইলে মুখ বদলাতে অন্য দেশের খাবারই খেতে চাইব নিশ্চয়ই। যেমনটা ইউরোপীয়রা মুখ বদলাতেই এশিয়ান খাবার খায়।’ আমি ওনাকে বোঝাবার চেষ্টা করি।

 

-হ্যা! আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে আমার এত রিয়্যাক্ট না করে এভাবে ভেবে দেখা উচিত ছিল।

 

-‘আপনি আর কিভাবে ভেবে দেখবেন বলুন, আপনার তো ভাত খেতে গিয়ে রাইস খেয়ে মেজাজ সপ্তমে উঠে গেছে!’ আমি একটু ফান করি।

 

-এই তো আরেকটা সুযোগ পেয়ে সেটাও আর হাত ছাড়া করলেন না! আপনার সাথে দেখছি পলিটিশিয়ানদের মত করে কথা বলতে হবে।

 

-কেন? পলিটিশিয়ানদের মত কেন?

 

-ওনারা খুব হিসেব করে কথা বলেন কিনা, যেন বিপক্ষ তাদের কথার কোন ফাঁক গলে তাদেরকে কুপোকাত করতে না পারে।

 

কিন্তু এত হিসেব করেও কি কোন লাভ করতে পারেন তাঁরা? বিপক্ষ তো তারপরেও তাঁদের সারাক্ষনই ছাই হাতে ধরছে। আসলে ধরা যাদের স্বভাব তারা প্রতিপক্ষ সুযোগ দিলেও ধরবে, না দিলেও ধরবে।

 

-হুম্‌, ঠিকই বলেছেন! তবে আপনার আবার ওরকম স্বভাব নয় তো?

 

আমি হেসে ফেলি। বলি, -‘না, নির্ভয়ে থাকুন। সুযোগবিহীন ধরাতে কোন আনন্দ পাই না আমি। তাছাড়া পলিটিক্স এবং পলিটিশিয়ান, এ দুটো থেকে শত হস্ত দূরে থাকতেই পছন্দ করি আমি।’

 

-জেনে আশ্বস্ত হলাম।

 

এরপরে দুজনেই কিছুক্ষন চুপ করে থাকি। আজ আসলে আমি বেশ ক্লান্ত বোধ করছি। কালরাতে একটু দেরী করেই ঘুম এসেছিল। আজ ভেবেছিলাম একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পরব। সেজন্য কাজ থেকে ফিরেই ঘরের কাজগুলোও দ্রুত সেরে ফেলেছি। কিন্তু এখন হঠাৎ করে ফোনটা রাখি কি করে বুঝে পাচ্ছিনা। এভাবে চুপ করে থাকাটাও দৃষ্টকটু। আমি কিছু একটা বলতে হয় বলেই বললাম,

 

-আপনি হঠাৎ এস এম এস করে ফোন করার পারমিশন নেবার কথা ভাবলেন কেন?

 

-আপনি জব নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, ঘরে ফিরেও হয়ত কাজ থাকে। তাই আমি চাইনি হঠাৎ করে ফোন দিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে। সেজন্যই এস এম এস করেছিলাম।

 

-কাজ তো সারাক্ষনই থাকে। এই যে আজকের মত এখন শেষ করেছি কিন্তু সকালে উঠেই আবার কাজ।

 

-সকালে আর কি এমন কাজ থাকে। কাজ তো আপনার সন্ধ্যার পরে।

 

আমি প্রথমটায় ওনার কথা বুঝিনা। কিন্তু সে মুহূর্তকাল মাত্র। ব্যাপারটা আমি বুঝে যাই। বুঝেই বলি, -‘আপনি আসলে বোঝেননি। কাজ বলতে আমি আমার জবের কথা বলেছি। আসলে এখানে সবাই যে যার জবকেই কাজ বলে। এখানে ‘কাজে যাচ্ছি’ বা ‘কাজ আছে’ বলে, আমাদের দেশের মত ‘অফিসে যাচ্ছি’ বা ‘অফিস আছে’ বলে না।

 

-তাই নাকি?

 

-হ্যা!

 

-আসলে উন্নত দেশে কোন কাজকেই ছোট করে দেখা হয়না বলেই হয়ত এভাবে এক কথায় ‘কাজ’ দিয়ে যেকোন জবকে বোঝানো হয়।

 

আমি বলি, -‘তাই হবে হয়ত!’

 

ভদ্রলোক এবার সহাস্যে বলেন, -‘আপনার তো সকালেই কাজে যেতে হবে!’

 

-‘হ্যা!’ আমিও হেসে বলি।

 

-তাহলে আর কি, ঘুমিয়ে পরুন। আমি আর বিরক্তের কারণ হইনা।

 

আমি হাসতে হাসতে বলি, -‘সকালে কিন্তু আপনারও কাজ আছে।’

 

-আরে তাইতো, আমারও তো কাজে যেতে হবে!

 

দুজনেই হেসে উঠি।

 

আমরা দুজন কাজের মানুষ আর বেশিক্ষন কথা বলি না। একে অন্যকে বিদায় জানাই।

 

 

 

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই কেন যেন বাবার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করল। কিন্তু আজ তো সবে বুধবার। আমি সাধারণত ছুটীর দু’দিন দেশে ফোন করি। আসলে আমার জন্য ওয়ার্কিং ডেগুলোতে দেশে ফোন করা বেশ কঠিন। আমার ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে কাজ থেকে ফিরে আসা অর্থাৎ বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত আমারই সুযোগ হয়না ফোন করার মত, এতই ব্যস্ত থাকি এই সময়টুকু। আর ওদিকে আমি যখন ফ্রী হই তখন দেশে অনেক রাত। কিন্তু আজ যে আমার বাবার সাথে ভীষন কথা বলতে ইচ্ছে করছে! কি করি? দেশে ফোন করার কার্ডটা সাথে নিয়ে নিলাম আমি, লাঞ্চব্রেকে খেতে খেতেই বাবার সাথে একটু কথা বলব।

 

আমার বাবা, ভীষন সিম্পল মাইন্ডেড একজন মানুষ। যিনি অকাতরে সবাইকে বিশ্বাস করেন, ভালবাসেন। যাঁর তেমন কোন বিষয়জ্ঞান নেই। জীবনকে খুব সাধারণভাবে দেখাটাই যাঁর অভ্যেস। আর সে কারণেই মা হয়ত একটু বেশিই হিসেবি, একটু বেশিই সচেতন আর সাবধানী। মোটকথা দু’জন সম্পূর্ণ দুই মেরুর বাসিন্দা যেন। কিন্তু তবুও ওনাদের মধ্যে কখনও কোন অশান্িত হতে দেখিনি আমরা। সেটা অবশ্য বাবার কারণেই। যে কোন ঝামেলা এড়িয়ে জীবন কাটানোই যেন বাবার জীবনের একমাত্র ব্রত। বাবার এই ধরনের মানষিকতার জন্যই ওনাকে আমি অসম্ভব ভালবাসি। মাকেও ভালবাসি, তবে বাবাকে মনে হয় একটু হলেও মায়ের চেয়ে বেশি ভালবাসি। মায়ের সবকিছু নিয়ে বেশি বেশি ভাবা আমাকে মাঝে মাঝে বিরক্তি দেয়। এই যেমন এখন আমার বিয়ে দেয়াটাই যেন ওনার একমাত্র ধ্যান জ্ঞ্যান হয়েছে, যা আমার একটুও ভাল লাগে না। এক জীবন নিয়ে আর কতবার জুয়া খেলা যায়!

 

আমি প্রায় রোজই লাঞ্চের জন্য খাবার নিয়ে আসি। যদিও আমাদের এখানে খাবার কিনে খাবার মত ব্যবস্থা আছে। এটা একটা বহুতল ভবন, যার বিভিন্ন ফেçার মিলিয়ে অনেকগুলো অফিস। আর সব অফিসের সমস্ত ষ্টাফের জন্য নীচতলার এই একমাত্র ক্যাফেটেরিয়া। নামে ক্যাফেটেরিয়া হলেও এখানে যেমন নানার রকমের ø্যাক্স, স্যান্ডুইচ, কেক, কোমল পানীয় থেকে শুরু করে নানাবিধ প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া যায়, তেমনই রেষ্ট্রুরেÏেটর মত লাঞ্চের ব্যবস্থাও আছে। এমনকি চাইলে বুফেও খাওয়া যায় লাঞ্চে। আমার এসব খাবারে কোন সমস্যা নেই। ভাল লাগা নিয়েই খেতে পারি। কিন্তু তবুও আমি সঙ্গে করে খাবার আনি। এর একটাই কারণ, আমি একটু হলেও আমার সময় বাঁচাতে চাই। লাঞ্চ টাইমে সবারই লাঞ্চ করার তাড়া থাকে, তাই ভীড়ও প্রচুর থাকে। খাবার অর্ডার করে সেটা ডেলিভেরী পেতে পেতে দশ থেকে পনেরো মিনিটও চলে যায় কখনও কখনও। বাকী যেটুকু সময় থাকে তাতে শুধু খাওয়াটাই হয়, রিল্যাক্স হয়না। তাই সাথে করে খাবার আনাটাই আমার কাছে বেষ্ট মনে হয়। লাঞ্চব্রেকে আমি আমার সাথে করে নিয়ে আসা খাবারটুকু ক্যাফেটেরিয়ার মাইক্রো ওভেনে গরম করে কফি মেশিন থেকে এক মগ কফি নিয়ে একদম নিরিবিলি একটা কর্নারে গিয়ে বসি। পাশের দেয়ালটা পুরোটাই কাঁচের। ওপাশে একটা পার্কের মত। মানুষজন যাচ্ছে, আসছে। চাইলে কেউ কেউ ঐ পার্কে বসে একটু জিড়িয়ে নিচ্ছে। আমি নানান দেশের, নানান জাতের, নানান বর্ণের সেইসব মানুষদের দেখতে দেখতে আরাম করে নিজের আনা খাবারটুকু খাই, তারপরে ততধিক আরাম করে গরম কফিতে চুমুক দেই। আমি আমার লাঞ্চব্রেকের সময়টুকুকে নিজের মত করে একা একা এন্‌জয় করি। আজ কফি নিয়ে এসে বসেই প্রথমে দেশে ফোন করলাম। ওদিকে রিং হতে হতে আমি খাবারের বক্স খুলে খাবার জন্য সব গুছিয়ে নেই। কি ব্যাপার কেউ রিসিভ করছে না কেন! বাসায় কি কেউ নেই নাকি? একসাথে সবাই গেল কোথায়? লাইনটা যখন প্রায় কেটে যাবে ঠিক তখন রিসিভড্‌ হল।

 

-হ্যালো! কে? মা?

 

-‘আপু? কি ব্যাপার তুমি আজ হঠাৎ এসময়ে? আজ তো শনি, রবিবার না!’ আমার ছোট ভাই রণ এক সাথে অনেকগূলো প্রশ্ন করে।

 

-‘কেনরে, শনি রবিবার ছাড়া আমার কি ফোন করা নিষেধ?’ আমি আমার ভীষন আদরের ভাইটার সাথে দুষ্টুমি করি।

 

-নিশ্চয়ই নিষেধ না। কিন্তু তুমি তো অন্যদিনগুলোতে নরমালী কর না, তাই একটু অবাক হয়েছি। ভাল আছ আপু?

 

-হ্যারে বাবা আমি ভাল আছি। বাবার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে বলে লাঞ্চব্রেকে ফোন দিলাম। শোন্‌, আমার পক্ষে তো এখন খুব বেশিক্ষন কথা বলা সম্ভব না, তোর সাথে শনিবারে আবার কথা বলব, ওকে ভাইয়া? তুই এখন তাড়াতাড়ি একটু বাবাকে দে।

 

ওপ্রান্েত ফোন হাতবদল হল। আমি এপ্রান্ত থেকে সেটা বুঝতে পেরে বললাম, -‘বাবা?’

 

-‘না বাবা না, আমি, মা।’ ওপ্রান্েত মায়ের গলা। -‘শোন তুই ফোন করে ভাল করেছিস, তোর সাথে জরুরী কথা আছে।’

 

মা তার জরুরী কথা শুরু করার আগেই আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, -‘মা এখন আমি কাজে। এখন তোমার জরুরী কথা কিভাবে শুনব আমি?’

 

-তাহলে এখন ফোন করেছিস কেন?

 

-বাবার সাথে সকাল থেকেই খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল বলে লাঞ্চব্রেকের সামান্য এই সময়টুকুর মধ্যেই খেতে খেতে ফোন করেছি।

 

-ওহ্‌! তাহলে আজ বাসায় গিয়ে আবার ফোন করিস।

 

-আজই করতে হবে?

 

-হ্যা! আজই করবি। বললাম না জরুরী কথা!

 

-ঠিক আছে এখন তুমি বাবাকে দাও।

 

মুহূর্তকালের বিরতি।

 

-‘কিরে অপু, তুই আজ এসময়ে যে? ভাল আছিস তো মা? শরীর ভাল তো?’ আমি অসময়ে ফোন করাতে বাবা যে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়েছেন সেটা ওনার কথাতেই বোঝা যায়।

 

-হ্যা বাবা আমি ভাল আছি। শরীরও ভাল। আজ ঘুম থেকে উঠেই তোমার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল, তাই লাঞ্চব্রেকে ফোন করলাম। তুমি ভাল আছ তো বাবা?

 

-‘আমি ভাল আছি। শোন্‌, আজ ক’দিন ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। সামনেই তো কোরবানি ঈদ, তুই এবার দেশে ঈদ কর না মা! খুব ইচ্ছে করছে এবারের ঈদটা তোকে নিয়ে করি। পারবি নারে মা আসতে?’ বাবার গলায় যেন øেহ, ভালোবাসা, আদর উপ্‌চে পরে!

 

বাবার কথার আদরের ছোঁয়ায় আমার দু’চোখ ভিজে ওঠে। আমি তাড়াতাড়ি চারপাশে একবার দেখি। আমাকে কেউ দেখলে নিশ্চয়ই সেটা খুব ফানি দেখাবে অন্যের চোখে। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ হই। বাবাকে বলি, -‘ঈদ তো সামনের মাসেই বাবা, এত অল্প সময়ে কি যাবার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে! টিকেট কত আগে থেকে বুকিং দিয়ে তবেই টিকিট পাই আমরা। কাজেও ছুটীর ব্যাপার আছে।’

 

-‘দেখ নারে মা চেষ্টা করে, পারিস কিনা আসতে। তাছাড়া একটা মোটে টিকেট তোর যে কোন সময়েই হয়ে যেতে পারে। তুই শুধু ছুটীর ব্যবস্থাটা কর।’ বাবা অবুঝ শিশুর মত করে বলেন।

 

আমার বাবার ইচ্ছে হয়েছে আমার সাথে এবারের ঈদটা করবেন, আমি এখন যদি বাবার এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে না পারি তবে আমারই যে বেশি কষ্ট হবে। কিন্তু এটাও জানি একটা টিকেটের ব্যবস্থা করা গেলেও এত অল্প সময়ে কোনভাবেই আমার পক্ষে ছুটী পাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু বাবাকে সেকথা কিভাবে বলি! আমি খুব চেষ্টা করব বলে  বাবাকে আপাতত শান্ত করি। এরপরে আমরা আরও কিছুক্ষন কথা বলি ঠিকই, কিন্তু আমার মাথার মধ্যে তখন কেবল বাবার একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘‘তুই এবার দেশে ঈদ কর না মা! খুব ইচ্ছে করছে এবারের ঈদটা তোকে নিয়ে করি। পারবি নারে মা আসতে?’’ বাবা হঠাৎ এভাবে কেন বললেন! আমার কেমন ভয় ভয় লাগে।

 

সারাদিন কাজের মধ্যে ঘুরেফিরেই বাবার কথাটা মনে হতে থাকে আমার। আজ আর সম্ভব না, দেখি আগামীকাল কাজে এসে সকালেই একবার নাহয় ছুটীর কথা বলে দেখব। জানি ফলাফল পজিটিভ হবার কোনই চানস্‌ নেই, তবুও ট্রাই করে দেখতে তো সমস্যা নেই।

 

 

 

 

কাজ থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়। প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। দিন এখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ঘরে ফিরে চেঞ্জ করা, ফ্রেশ হওয়া, একটু কিছু খাওয়া ইত্যাদি খুব জরুরী কাজটুকু সেরে বাড়ীতে ফোন করলাম। দেখি আমাকে বলার জন্য মায়ের কি এমন জরুরী কথা আছে! ফোনটা মা’ই রিসিভ করল।

 

-হ্যা! বলো, কি এমন জরুরী কথা তোমার।

 

-শোন, তোর জন্য তিতলির মা একটা সম্মন্ধ এনেছে।

 

-এই তিতলির মা’টা আবার কে?

 

-আরে তুই যেন চিনিস না! আমাদের পাশেরবাড়ীর উকিল সাহেবের স্ত্রী।

 

-‘মা, দশ বছর আগে আমাকে দেশ থেকে বিদায় করেছ, এসব তিতলির মা, বাবলির মাকে আমি কিভাবে চিনব?’ আমি বিরক্ত হয়ে বলি।

 

-আচ্ছা কাউকে তোর চিনতে হবে না, তুই আমার কথা শোন। তিতলির মা তার খালাতো বোনের ভাসুরের ছেলের সাথে তোর বিয়ের সম্মন্ধ নিয়ে এসেছে। ছেলেটা বি সি এস দিয়ে সরকারী চাকরী করছে। কিন্তু ছেলেটা জানিয়েছে তোর সাথে বিয়ে হলে সে তার চাকরী ছেড়ে দিয়ে তোর ওখানে চলে যাবে।

 

-‘মা, একটা ছেলে আমাকে বিয়ে করে ইউরোপে আসার জন্য তার সরকারী চাকরী পর্যন্ত ছেড়ে দেবার কথা ভাবতে পারে, আর তুমি ওরকম একটা লোভী ছেলের সাথে কিনা আমার বিয়ের কথা বলছ?’ আমার অসম্ভব মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।

 

-‘এর মধ্যে লোভের কি দেখলি তুই!’ মা অবাক হয়ে বলে।

 

-লোভ না তো কি? আমাদের দেশে বি সি এস দিয়ে একটা সরকারী চাকরী পাওয়াকে এখনও যে সম্মানের চোখে দেখা হয়, সৌভাগ্য মনে করা হয়, বিদেশে আসার জন্য সেই চাকরী ছেড়ে দিতেও যে লোকের একটুও দ্বিধা নেই সে লোভী নয় তো কি?

 

-কিসের সম্মান, কিসের সৌভাগ্য? আগের মত সরকারী চাকরী নিয়ে এখন আর মানুষের ঐ সেÏিটমেÏট নেই। সরকারী চাকরীর বেতনে সংসার চলে নাকি?

 

-তাহলে তো বোঝাই যাচ্ছে তোমার সেই সরকারী চাকুরে আমাকে বিয়ে করে ইউরোপে এসে বড়লোক হতে চায়। আর শুধুমাত্র এজন্যই সে আমাকে বিয়ে করতে চাইছে।

 

-তুই এত বেশি বুঝিস কেন? তাছাড়া সে যদি ইউরোপে যেতেই চায় তাতেই বা তার অপরাধ কোথায়? যে কেউই জীবনের নিরাপত্তা চায়। যেখানে জীবনের জন্য সুযোগ সুবিধা বেশি সেখানে মানুষ যেতে চাইবে না?

 

-ওহ! ঠিক আছে মা, তোমার মেয়ে তো তাহলে নিরাপদ দেশে ভীষন নিরাপত্তায় মহাসুরক্ষিতই আছে। তবে আর তার জন্য একটা বডিগার্ডের ব্যবস্থা করতে তুমি এত উঠে পরে লেগেছ কেন?

 

-অপু, এসব কি কথার ছিড়ি!

 

মায়ের কথা শুনে এবার সত্যি প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হয়ে যায় আমার। আমি আর নিজের বিরক্তিটাকে গোপন করতে পারিনা।

 

-আচ্ছা মা, আমার জন্য কি দেশে তুমি এমন একটা ছেলেকেও খুঁজে পাও না যে আমাকে বিয়ে করে আমার স্বামী হিসেবে আমার এখানে না এসে আমাকেই তার স্ত্রী হিসেবে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?

 

-তাহলে কি এমন তফাৎটা হত? তাহলেই কি সে তোর সত্যিকারের স্বামী হত, আর তোর ওখানে গেলে সে তোর স্বামী হবে না?

 

আমি ভীষন অবাক হই মায়ের কথা শুনে! মা এভাবে ভাবে? আমার হঠাৎ নিজের জন্য খুব কষ্ট হয়। আমি একটু ধরা গলাতেই বলি, -‘ওহ! আমার দেশে জীবন কাটানো আর দেশের বাইরে জীবন কাটানোর মধ্যে তোমার কাছে কোনই তফাৎ নেই?’

 

-দেখ্‌ অপু, তোকে তোর অবস্থাটা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে তুই আর অন্য দশটা অবিবাহিত মেয়ে এক না। আমরা যা বলি তোর ভালোর জন্যই বলি।

 

মায়ের কথায় আমার মনে কষ্টের বদলে আবারও রাগ, ক্ষোভ, বিরক্তি দানা বাঁধে।

 

আমি ফুঁসে উঠে বলি, -‘‘আমরা’’ বল না মা, বল ‘‘আমি’’। একমাত্র তুমিই আমাকে নিয়ে এভাবে ভাব। আমার মনে হয় না বাবা বা আমার ভাইবোন আমাকে নিয়ে তোমার মত করে ভাবে। আসলে কি জানো, তুমি আমাকে নিয়ে ভাব না বলেই এভাবে ভাব।

 

-অপু, তুমি কিন্তু দিনদিন বেয়াদবের মত কথা বলা শুরু করেছ!

 

-‘আদবের সাথে কথা বলে, তোমার বাধ্য মেয়ে হয়ে তোমার সব ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে চলে এতগুলো বছর তো অনেক দেখলাম মা, কি এমন প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে আমার জীবনে? আর কত? বয়স তো আমারও কম হল না মা! আমার এখন তেত্রিশ চলছে। আর কতকাল আমি বাধ্য মেয়ের মত যা আমার জন্য অসহনীয় তা মুখ বুজে সয়ে যাব?’ কথাগুলো বলতে বলতে আমার মনের মধ্যে রাগের বদলে আবারও কষ্টবোধ ফিরে আসে। আমার গলা ভারী হয়ে যায়। আমি রুদ্ধ গলাতেই আবার বলি, -‘আমি বাধ্য মেয়ে ছিলাম বলেই আজ দশটা বছর আমি এই কারাভোগ করছি। তোমার ইচ্ছেতেই আজ দশটা বছর ধরে একদম একা দেশের বাইরে আমি। ভেবে দেখো মা, বাবা কিন্তু আমার জন্য এই জীবন চায়নি। বাবা চায়নি তার আদরের মেয়েকে অজানায় ঠেলে দিতে। কিন্তু তুমি, তুমি তোমার জেদ দিয়ে তোমার মেয়ের জন্য এককভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে তখন। আর তখন আমি ছিলাম যেন কেবলই এক বলির পাঠা। একবারও কি ভেবে দেখেছ মা, আমার জীবনকে সো কলড্‌ নিরাপত্তা দিতে গিয়ে তুমি তখন আমাকে বরং ভয়ংকর এক জীবনেই ঠেলে দিয়েছিলে? দেশে থাকলে, তোমাদের কাছে থাকলে আমি কি খুব খারাপ থাকতাম, অনিরাপদ থাকতাম?’

 

আমার পুরনো ক্ষতের উপরে আজ এতদিন পরে আবারও যেন লবনের ছিটা দেয়া হয়েছে। আমি যন্ত্রণায় কুঁকরে যেতে থাকি। আমার আর মায়ের সাথে কথা বলতে একটুও ইচ্ছে করে না। আমি মাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ‘‘আমি রাখছি’’ বলে ফোনটা রেখে দেই।

 

 

 

কাজ শেষে ট্রেনে করে ফিরছিলাম। হঠাৎ মারিয়া’র সাথে দেখা হয়ে গেল। ও নিজেও বাড়ী ফিরছে। সাথে শুধু ছোট ছেলেটা। মারিয়াকে বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে! আমিই ওকে আগে দেখলাম। আমার সামনের দিকে কিছুটা দূরেই বসেছে। কিন্তু আমাদের দুজনের সিট কোনাকুনি বলে ওকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই সময়ে ট্রেনে খুব ভীড় হয়, কাজ থেকে প্রায় সবারই ফেরার সময় বলে। কিন্তু এখনও ট্রেনটা সেভাবে ভরে ওঠেনি। কারণ এদিক থেকে খুব বেশি মানুষ ওঠেনা। সামনের ষ্টপেজগুলো থেকে প্রচুর উঠবে। তখন আর তিল ধারণেরও জায়গা থাকবে না। হঠাৎ মারিয়ার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। ও হাতের ইশারায় আমাকে ওর ওখানে যেতে বলছে। ওর সামনেই একটা সিট এখনও ফাঁকাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ট্রেনটা থামলেই আরও মানুষ উঠবে তখন আর ফাঁকা থাকবে না। আমি আর দেরী না করে ট্রেন থামার আগেই ওর সামনে পৌঁছে গেলাম।

 

-‘হাই! কি খবর তোমার বলতো, অনেকদিন তোমার দেখা নেই যে?’ আমি বসতে বসতে বলি। বসে ওর বাচ্চাটাকে আদর করি।

 

-‘দেখবে কি করে, আমি এখানে ছিলাম নাকি এতদিন!’ মারিয়া’র বলার ঢঙ্গে স্পষ্ট বিরক্তি।

 

-ছিলে না? কোথায় গিয়েছিলে? সামার ভ্যাকেশন তো সেই কবেই শেষ, এখন তো কোন ছুটী নেই?

 

মারিয়া রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বলল, -‘আমি কি স্বাধ করে কোন ছুটী কাটাতে গিয়েছিলাম নাকি? বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল।’ মারিয়া একটু থেমে আবার বলে, -‘আর বোলনা, ছেলেদের নিয়ে কয়েক সপ্তাহ একটা কাউন্‌সিলিং সেÏটারে থেকে আসতে হল আমাকে।’

 

-‘তাই নাকি! কিন্তু কেন?’ আমি প্রচন্ড অবাক হই!

 

-‘তুমি তো জানো আমার চারটা ছেলের বাবা আলাদা, আলাদা কালচারের। ওরা যখন একদম ছোট ছিল, তখন কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন একটু বড় হয়ে আমার লাইফটাকে হেল্‌ বানিয়ে রেখেছে এরা। যত বড় হচ্ছে ততই ওদের মধ্যে ওদের নিজেদের বাবাদের স্বভাব, কালচার, প্রকট হচ্ছে। ফলে কারো সাথেই কারো মতের মিল হয়না বললেই চলে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। আমি তো প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজেই ব্যস্ত থাকি। ওদের খুব একটা সময় দিতে পারি না। ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরি তখন এদের কম্‌প্লেইন শুনতে শুনতে অস্থির হয়ে পরি। কতটুকু সময় এরা একসাথে থাকে বল? সেই সকালে উঠে স্কুলে চলে যায়, ফেরে তো সেই বিকেলে। আমি ফেরার আগে খুব বেশি হলে দুই/তিন ঘÏটা ওরা একসাথে থাকে। কিন্তু তাতেই এই অবস্থা! কিছুদিন আগে এরা চারজনে এমন অবস্থা করেছিল যে আমিও সেদিন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। আমিও ওদের সাথে চেঁচামেচি করে ফেলেছিলাম। আর এরই মধ্যে কখন যেন পাশের বাড়ীর বয়স্ক মহিলাটা পুলিশের কাছে ফোন করে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। পুলিশ তো সোজা আমার বাড়ীতে এসে হাজির। আমার তখনকার আবস্থাটা ভাবো একবার তুমি! আমি পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বাচ্চারা চিৎকার চেঁচামেচি করে খেলছিল শুধু, কোন সমস্যা হয়নি আমাদের মধ্যে। পুলিশ বলল, ‘‘না তোমার বাড়ীতে এরকম নাকি প্রায় রোজই হয়। তুমি আসলে বাচ্চাদের টেক্‌ কেয়ার করতে পার না।’’ আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তুমি তো জানো আমাদের সিষ্টেম, ব্যাপারটা তখন আর আমার হাতেই ছিল না। পুলিশ আমাদের বিষয়টা সোশালকে জানাল। সোশাল আমাদের সোজা কাউন্‌সিলিং সেÏটারে পাঠিয়ে দিল।’ মারিয়া এক নিঃশ্বাসে সমস্ত ঘটনাটা বলে।

 

আমি রুদ্ধশ্বাসে মারিয়ার কথাগুলো শুনি। খানিক্ষন চুপ করে থাকি। আসলে বুঝতে পারছিনা আমার এখন কি বলা উচিত। কারণ মারিয়া নিজেই নিজের জীবনের যে প্যাটার্ন দিয়েছে আমি সেটাকে সমর্থন করিনা। তাই তার এখনকার এই পরিস্থিতির জন্য আমি তাকেই দায়ী ভাবি। আমার কাছে মারিয়ার জীবন আর তার জীবনের এইসব ঘটনাগুলো অসম্ভব বলে মনে হয়! কিভাবে একটা মেয়ে চারজন পুরুষের সাথে সন্তান জন্ম দেয়? বাচ্চারা বড় হলে এরকম সমস্যা যে হতে পারে সেটাতো সহজেই অনুমেয়। ভদ্রতা করে কিছু একটা বলতে হয় বলেই এবার বলি আমি, -‘ওখানে গিয়ে কি তোমাদের কোন উপকার হয়েছে? এখন কি বাচ্চাদের মধ্যে সদ্ভাব এসেছে?’

 

-হুম্‌, ওখানে যাওয়াটা কিছুটা হেল্পফুল হয়েছে বলেই তো মনে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ওদের মধ্যে আগের মত এ্যাগ্রেসিভ ভাবটা দেখিনি। তাছাড়া প্রতিবেশীর কম্‌প্লেইন করে দেয়া, বাসায় পুলিশ আসা, এসবের ভয়ও তো ওদের মধ্যে ঢুকেছে এখন।

 

-যাক্‌, ওদের মধ্যে চেঞ্জ আসলে তো খুবই ভাল। তবে তোমাকেও খুব সাবধান হতে হবে। ওদেরকে আরেকটু বেশি সময় দিয়ে ওদের মধ্যে একটা ভাতৃত্ত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। ওরা যে আপন ভাই, পর নয়, এটা বোঝাতে হবে ওদের।

 

-‘আমি তো চেষ্টা করছি। তবে আমারও তো পারসোনাল একটা লাইফ আছে তাইনা? আমারও তো নিজের জন্য আলাদা করে একটু সময় প্রয়োজন।’ মারিয়া নিজের স্বপক্ষে বলে।

 

হঠাৎ আমার ষ্টপেজের নাম এ্যানাউনস্‌ড হতেই আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি। কথায় কথায় কখন যে আজ এতটা পথ চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। আমি মারিয়াকে উইস করে ওর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে নেমে পরি।

 

মারিয়া খাস এদেশি মেয়ে। ওর সাথে আমার এই ট্রেনেই আলাপ। মারিয়া আমার ঠিক দুটো ষ্টপেজ পরে থাকে। ওর আর আমার কাজের টাইম টেবল্‌ প্রায় এক। তাই প্রায় সময়ই কাজে যেতে বা আসতে ট্রেনেই আমাদের দেখা হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ত্বের মত সম্পর্ক হয়ে যাওয়াতে আমাদের দেখা হলে একসাথে বসেই সারাটা পথ গল্প করতে করতে আসি-যাই। তাই লাষ্ট দুই মাস মারিয়াকে না দেখতে পেয়ে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। আজ মারিয়ার বিধ্বস্ত চেহাড়া দেখে ওর জন্য আমার মায়াই লাগছিল। কিন্তু এটাও তো সত্যি এই ইউরোপ, আমেরিকার কালচারে এতো ‘খুললাম খুল্লা’ জীবন কাটানোর জন্যই অনেকের জীবনেই এরকম দূর্গতি নেমে আসে, যা পরে সামাল দিতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। অথচ পঞ্চাশ, ষাট বছর আগেও এই ইউরোপীয়ানরাও অনেকটাই রক্ষনশীল ছিল। দিনে দিনে এখন এই অবস্থা হয়েছে। যদিও এই কালচারের মধ্যেই যারা বুদ্ধিমান তারা জীবনের একটা সময় পর্যন্ত জীবনকে উপভোগ করলেও একটা পর্যায়ে এসে তারা সংযত এবং হিসেবি হয়। মারিয়ার মত সবাই তো নয় যে নির্বোধের মত এরকম ভিন্ন ভিন্ন বাবার ঔরসে চার সন্তান জন্ম দেবে! সত্যি এরকম কথা এর আগে আর কখনও শুনিনি আমি! মারিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে শপিংমলের মেইন গেটের কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করিনি। হঠাৎ কেউ কাউকে ‘‘হ্যালো’’ বলে ডেকে উঠতেই আমিও আমার ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলাম। ঠিক তখনই কাছাকাছি থেকে কেউ বলে উঠল, -‘বাব্বাহ্‌! কি এত মনোযোগ দিয়ে ভাবছেন বলুন তো যে আশেপাশের কাউকে খেয়ালই করেন না?’ পাশে ফিরে তাকাতেই দেখি সেই ভদ্রলোক হাসি মুখে দাঁড়িয়ে।

 

-‘ওহ্‌, সরি! আসলেই আমি একটা ভাবনার মধ্যে ঢুবে ছিলাম আজ। আপনাকে দেখতেই পাইনি’ আমি একটু লজ্জা পাই।

 

-আপনি কি প্রায়ই এরকম ভাবনায় ঢুবে পথ চলেন? এটা কিন্তু খুবই রিস্কি!

 

-না না। আজ হঠাৎ একজনের সাথে দেখা হয়ে গেল। সে তার কিছু সমস্যার কথা বলল। তাই তাকে নিয়েই ভাবছিলাম। সবসময় এভাবে ভাবিনা মোটেও।

 

-তাও ভাল! এখন কি বাসায় ফিরছেন, নাকি কিছু কেনাকাটা আছে?

 

-কেনাকাটা আছে। দুধ, রুটি, ফ্রেশ ফলমূল বা সব্জি এসব কিনতে দু’তিনদিন পরপর তো কাজ থেকে ফেরার পথে গ্রোসারীতে যেতেই হয়।

 

-আমি যদি আপনার সাথে যাই তবে কি আপনি কিছু মনে করবেন?

 

-‘না না সেকি? যেতে চাইলে যাবেন।’ আমি ব্যাস্ত ভাবে বলি।

 

-আসলে কি জানেন, আমি তো কাজ শেষে বেশ আর্লী ডিনার সেরে রেষ্টহাউসে ফিরে যাই। কিন্তু রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে আবারও ক্ষিধে পেয়ে যায়। তাই গতকাল রাতেই ভেবে রেখেছিলাম আজ ফেরার পথে কিছু হালকা খাবার কিনে ঘরে রাখব, যেন রাতে ক্ষিধে পেলে খাওয়া যায়। সেজন্যই এখানে এসেছিলাম। আর আসতেই ভাগ্যগুনে আপনাকে পেয়ে গেলাম।

 

-‘বেশ তো, এবার চলুন।’ ওনাকে সঙ্গে আসতে বলে আমিও পা বাড়াই।

 

আমাদের কেনাকাটা শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগল না। ভদ্রলোক বললেন, -‘চলুন একটু কফি খাওয়া যাক্‌। আমার সাথে কফি খেতে আপত্তি নেই তো?’

 

-আপত্তি থাকলে আপনি কি মনোক্ষুন্ন হবেন?

 

-তা তো কিছুটা হবই। মন বলে কথা! তবে রাগ করব না। প্রত্যেকেরই যার যার ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে এবং আমি সেটাকে অনার করি।

 

-‘তাহলে শুনুন, আপনার সাথে কফি খেতে আমার আপত্তি আছে। কিন্তু আমার সাথে আপনি কফি খেলে তাতে আমার আপত্তি নেই।’ আমি বেশ গম্ভীর মুখ করেই কথাটা বলি।

 

ভদ্রলোকও আমার কথার প্রথমটুকু শুনে কিছুটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কথার শেষটুকু শুনে হা হা করে হেসে ওঠেন। তারপর বলেন, -‘নাহ্‌ মানতেই হচ্ছে, আপনার সেন্স অফ হিউমার খুব ভাল!’

 

কফি খেতে খেতে আমি ওনার নামটা আরেকবার শুনতে চাইলাম। বিনয়ের সাথেই জানালাম ওনার নামটা খুবই আনকমন আর কঠিন, সেজন্যই আমার একবার শুনে নামটা মনে নেই। এটাও বললাম, ওনার নাম মনে না থাকার কারণে ওনাকে নিয়ে কিছু ভাবতে গেলেই আমি মনে মনে ‘‘সেই ভদ্রলোকটা’’ বলি, যেটা খুব বাজে ব্যাপার। উনি দেখলাম একটুও অবাক হলেন না আমার কথা শুনে। বরং হেসে হেসে বললেন, -‘সেটাই তো স্বাভাবিক! আমার নিজেরই কি নিজের নামটা সহজে মনে থাকত!’

 

-‘মানে?’ আমি ওনার কথায় অবাক হই!

 

-‘মানে আর কি! ছোটবেলায় আমার নামটা নাকি কিছুতেই আমার মনে থাকত না। মায়ের মুখে শুনেছি।’ ভদ্রলোক নির্লিপ্ত মুখে বলেন।

 

আমি ওনার কথায় হেসে ফেলি।

 

-‘সে তো সবারই ছোটবেলায় নিজের নাম মনে রাখতে কষ্ট হত। আপনি এমন করে বললেন যে মনে হল আপনি বুঝি বড়বেলার কথা বলছেন!’ আমি হাসতে হাসতে বলি। পরক্ষনেই বলি, -‘নামটা কিন্তু বললেন না এখনও?’

 

-‘‘আজওয়াদ আরীজ’’ এটাই এই অধমের নাম।

 

-আপনার নামটা শুনতে বেশ! অর্থ কি?

 

-উত্তম সুগন্ধ!

 

-বাহ্‌! কে রেখেছেন আপনার এই নাম?

 

-আমার মা রেখেছেন এই নামটা। তবে বাবা আমার নিক্‌নেম রেখেছেন। সেটা হয়ত আপনার কাছে অনেক সহজ মনে হবে। আমার পরিবার, পরিজন, আর বন্ধুুদের কাছে আমি ‘‘প্রত্যুষ’’। অনেক ভোরে হয়েছিলাম বলে বাবা আমার এই নাম রাখেন।

 

-হ্যা! বাচ্চার জন্মের সময় এবং তখনকার পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিল রেখেও তাদের নামকরন করা হয়। যেমন যে বাচ্চা রাতে হয় তার নাম হয় ‘‘রাত্রি’’, দিনে হলে ‘‘দিবা’’। আবার রোজার মাসে হলে ‘‘সিয়াম’’ বা ‘‘রোজা’’। বিকেলে হলে ‘‘গোধুলী’’, আবার আপনি ভোরে হয়েছেন বলে ‘‘প্রত্যুষ’’।

 

-‘সেক্ষেত্রে তো আমি বেশ ভাগ্যবান বলতে হবে!’ প্রত্যুষ বেশ গম্ভীর মুখে বলে।

 

আমি অবাক হই! বুঝিনা হঠাৎ একথার কি মানে! আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রত্যুষ নিজেই এবার তার ভাগ্যবান হবার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে। বলে, -‘আমি বৈশাখের এক তান্ডবের রাতে পৃথিবীতে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরেছিলাম। আমার মাকে জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। অথচ মেঘের গর্জন, বিদ্যুৎ চমকানী আর প্রবল ঝড়ে ঐ রাতে ঘর থেকে পথে নামার কথা স্বাভাবিক বুদ্ধিতে কেউ ভাব্বেও না। কিন্তু তবুও সেই বিভিষিকার মধ্যেই বহু ঝামেলা করে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর সেই ভোরেই আমি হয়েছিলাম। এখন তাহলে বলুন আমার নাম তো ‘‘প্রত্যুষ’’ না রেখে ‘‘বিভিষিকা’’ রাখা যেত। কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমি ‘‘বিভিষিকা’’ নামধারী হওয়ার বিভিষিকা থেকে মুক্তি পেয়েছি, তবে কি আমি ভাগ্যবান নই?’

 

প্রত্যুষের কথা শুনে আমি হাসব কি, উনি নিজেই নিজের রসিকতায় হা হা করে হেসে ওঠেন।

 

-‘সেন্স অফ হিউমার আপনারও তো কিছু কম দেখছি না।’ আমি হাসতে হাসতেই বলি।

 

এরপরে কিছুক্ষন কেউ কোন কথা বলি না।

 

প্রত্যুষই প্রথম কথা বলে, -‘আচ্ছা এদেশে রেসিষ্ট নেই? শুনেছি ইউরোপ, আমেরিকায় প্রচুর রেসিষ্ট আছে।’

 

-নিশ্চয়ই আছে। সবদেশেই থাকে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হল আমরা কখনও আমাদের মধ্যে রেসিজম্‌ দেখতে পাইনা। আমরা মনে করি আমাদের জন্যই শুধু রেসিষ্ট, কিন্তু আমরা কখনও রেসিষ্ট নই।

 

প্রত্যুষ আমার কথায় জিজ্ঞ্যাসু চোখে তাকাতেই আমি আবার বলি, -‘এরকম উন্নত দেশে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মত দেশেও যে কখনোই কেউ আশ্রয় প্রার্থনা করে না, তা কিন্তু নয়। আমাদের দেশে যখন বাইরের কেউ আশ্রয়প্রার্থী হয়  তখন তাদেরকে আমাদের সবাই কি সহজে মেনে নিতে পারে? কেউ কেউ কি এর বিরোধিতা করে না? সেইসব আশ্রয়প্রার্থীকে কি ‘‘উরে এসে জুড়ে বসা’’ মনে করে না? একবার রোহিঙ্গাদের কথা মনে করে দেখুন।

 

-‘তা ঠিক।’ প্রত্যুষ এবার সায় দেয়।

 

-কিন্তু তখন কি আমরা নিজেদের ঐ আচরণের জন্য নিজেদের রেসিষ্ট ভাবি?

 

প্রত্যুষ মাথা নাড়িয়ে বলে, -‘না ভাবিনা।’

 

-এজন্যই এসব দেশেও কিছু রেসিষ্ট থাকলে আমি তার জন্য এদের কোন দোষ দেইনা। সত্যি তো নিজের কোনকিছু যখন বাইরের কেউ এসে দখল করে বসে তবে সেটা মেনে নেয়া কারও কারও জন্য কষ্টকর। বিশেষত এসব দেশে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা এতবেশি এবং এসবদেশের বেশিভাগ ক্রাইমও কিন্তু এই ইমিগ্রেন্টরাই করছে। তাহলে এরা রেসিষ্ট হলে এদেরকে কি আর খুব একটা দোষ দেয়া যায়?

 

-‘ইউ আর রাইট।’ প্রত্যুষ আমার সাথে একমত হয়।

 

প্রত্যুষ হঠাৎ প্রশ্ন করে, -‘এই যে এতগুলো বছর ধরে এখানে আছেন, কেমন লাগে আপনার থাকতে?’

 

প্রত্যুষ না জেনেই আমার মনের খুব নরম একটা জায়গায় আঁচড় দিয়ে ফেলেছে। আমি খানিক চুপ করে থাকি। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রত্যুষই আবার জিগ্যেস করে, -‘ভাল লাগে?’

 

এবার আমি বলি, -‘ভাল লাগে কি লাগে না এত বুঝে থাকতে হলে কি আর এই দূরদেশে একা একা থাকা যায়?’

 

-‘আপনি একা থাকেন এখানে?’ প্রত্যুষ খুব অবাক হয়।

 

আমি নিজেও বুঝিনি কথার মাঝে নিজের এই একাকিত্ত্বের কথা বলে ফেলেছি আমি। আসলে সত্যিটাকে এত যত্ন করে আড়াল করে আর কতক্ষন কথা বলা যায়। তাতে কি আর কথা বলায় সাবলিল ভাবটা থাকে! আমি মাথা ঝাকিয়ে বলি, -‘হ্যা! আমি একাই থাকি এখানে। আমার পরিবারের সবাই দেশে।’

 

-‘ওহ্‌! গড! সবাইকে ছেড়ে একদম একা কিভাবে থাকেন আপনি? কষ্ট হয়না? আমি হলে তো দম বন্ধ হয়ে মরেই যাব।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রত্যুষ এমন একটা মুখোভঙ্গি করে যেন এটা ভাবতে গিয়ে এখনই তার দমবন্ধ অনূভুতি হচ্ছে।

 

-আমারও ঠিক এরকম দমবন্ধ অনুভূতিই হয়েছিল প্রথম যখন আসি।

 

-তারপর কিভাবে মানিয়ে নিলেন?

 

আমার এই কষ্টের দিক নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগছিল না। কারণ তখনকার আমার মানিয়ে নেয়ার কাহিনী বলতে হলে প্রত্যুষকে আরও পেছনের ঘটনাও বলতে হয়। নইলে তার পক্ষে আমার মানিয়ে নেয়ার দায়টা কিছুতেই বোধগম্য হবে না। আমি কথার মোড় ঘুরিতে নিতে বলি, -‘এদেশে এসে প্রথম কোন ব্যাপারটা আমার ভাল লেগেছিল জানেন?

 

-কি?

 

-এসেই যখন দেখলাম, ঘাম ঝরানো গরম নেই, যন্ত্রণাদায়ক মশা নেই আর কল খুললেই ডাইরেক্ট সাপ্লাই পানিই খাওয়া যায়, তাও আবার হিম হিম ঠান্ডা তখন খুব ভাল লেগেছিল। একটা শান্িত শান্িত ভাব! দেশের মত গরমে অস্থির হতে হয় না। মশার কামড়ে কষ্ট পেতে হয়না। খাবার পানিকে বিশুদ্ধ করতে ফুটিয়ে ফিলটার করে বোতলে বোতলে ভরে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে খেতে হয় না। শান্িত লাগবে না বলুন? ওহ! আরও একটা ব্যাপার আছে। রাত বিরেতেও এখানে বাইরে বেড়োতে পারি, যা দেশে কল্পনাও করা যায় না।

 

-তা ঠিক!

 

-তবে আমার কি মনে হয় জানেন?

 

প্রত্যুষ চোখ ভরা প্রশ্ন নিয়ে তাকায়, -‘কি?’

 

-আমাদের দেশে এই ক’টা যন্ত্রণা না থাকলে আরও বেশি শান্িততে বাস করা যেত। যেহেতু দেশে বাস করলে অন্য বেশকিছু দিকে এসব দেশের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। বিশেষত অর্থ থাকলে।

 

-রাইট!

 

কথায় কথায় আমাদের দুজনেরই বেশ আগেই কফি খাওয়া শেষ। আমি এবার উঠতে চাইলাম।

 

-এবার চলুন ওঠা যাক।

 

মল থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা পথ আমরা একসাথেই হাটলাম। সামার চলে গেছে, এখন ফল্‌। পথের দু’ধারে ম্যাপল্‌ ট্রির পাতারা সব হলুদ, কমলা হয়ে গেছে। একটু বাতাসেই পাতারা ঝরে ঝরে পরছে। ফলে পথ যেন এখন হলুদ কার্পেটে ঢাকা। অদ্ভূদ এক সৌন্দর্য্য! কিন্তু এই সৌন্দর্য্য মনকে বিষন্নও করে দেয়। বুঝিয়ে দেয় সামার বিদায় নিয়েছে, সামনেই ভয়াল শীত। এই দৃশ্যে মনের মধ্যে কেমন যেন বিদায়ি সুর বেঁজে ওঠে। জীবনের যে কোন ধরনের বিদায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। মন হু হু করে ওঠে।

 

আমার ভাবনার মধ্যে প্রত্যুষ হঠাৎ কথা বলে ওঠে।

 

-জীবনের সময়গুলোও এভাবেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। হেলাফেলা করে জীবনের অনেকটা সময় পার করে দিয়ে আমরা এখন জীবনের যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি তাতে আর কিছুদিন পরেই আমাদের জীবনও বোধহয় এরকম হলুদ বর্ণ হয়ে যাবে। তারপর একদিন এই হলুদ পাতাদের মত আমরাও টুপ করে জীবন থেকে বৃন্তচুত্ত হয়ে ঝরে পরব।

 

প্রত্যুষের কথায় আমাদের দুজনেরই মনটা ভারী হয়ে যায়। কারণ আমরা দুজনেই জানি কথাটা কতখানি সত্যি। আমার মাথার মধ্যে এখন প্রত্যুষের একটা কথা ঘুরপাক খায় ‘হেলাফেলা করে জীবনের অনেকটা সময় পার করে দিয়ে-।’ সত্যি তো জীবনের সুন্দর সময়ের  অনেকটাই আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। সত্যি তো হেলাফেলা করেই জীবনের অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেল। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় আমার। প্রত্যুষও চুপচাপ। কে জানে সেও ঠিক আমার মত করেই এখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবছে কিনা!

 

 

 

১০

শুক্রবারে সবসময়ই আমার মিশ্র একটা অনুভূতি হয়। পরের দুটোদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কাজে ছুটতে হবে না এটা ভেবে একদিকে যেমন ভাল লাগে, তেমনি ছুটীর দুটোদিন আমার আরও বেশি নিঃসঙ্গ লাগে বলে ভাল লাগে না। আজ কাজ থেকে ফেরার সময়ই ভেবে রেখেছিলাম আজ আর রান্নার ঝামেলায় যাব না। যাহোক একটা কিছু খেয়ে বেশ আয়েশ করে পুরোনদিনের বাংলা কোন মুভি দেখব। পরেরদিন শনিবার, তাই রাত জাগলেও কোন সমস্যা নেই আজ। আমি প্ল্যান করে ফেললাম আজ সন্ধ্যে আর রাতটা হবে আলসেমি করার রাত।

 

ঘরে ফিরেই এত ক্ষিধে পেয়ে যায় যে প্রথমেই একটা কিছু খেয়ে না নিলে মাথাটা যেন ঠিকমত কাজ করতেই চায় না। এই সময়টায় দেশের জীবনটাকে যে কি ভীষন মিস্‌ করি! দেশে থাকলে ক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরতাম তখন খাবারটা সামনে এগিয়ে দেবার মানুষ থাকত। এরকম রোজই নানান কাজের মাঝে নানান কারণে কত সহস্র্যবার যে দেশকে মিস্‌ করি আমি!

 

ডিপ্‌ফ্রিজে রেডিমেড্‌ পিৎজা আছে, সেটাকে ওভেনে ঢুকিয়ে দিয়ে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হতে হতেই পিৎজা প্রায় হয়ে গেল। কফি করে পিৎজাসহ লিভিংরুমে চলে এলাম। উত্তম কুমারের ‘‘সপ্তপদি’’ চালিয়ে দিয়ে আরাম করে বসি আমি। এখন শুধু উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, আমি, আর আমার পিৎজা। ভাবনাটা আমাকে বেশ আনন্দ দেয়। কিন্তু আমার সেই আনন্দকে খানখান করে দিয়ে মোবাইলটা বেজে উঠল। উহ্‌! এখন আমাদের মধ্যে কাবাব মে হাড্ডি হতে কে আবার ফোন করল? ধুর ছাই! মোবাইলটা আবার হাতের কাছেও নেই। মহাবিরক্ত হয়ে আমি উঠে গিয়ে কল রিসিভ করলাম।

 

-‘বিরক্ত করলাম না তো?’ প্রত্যুষের কন্ঠ।

 

-‘করলে তো করেই ফেলেছেন, এখন আর কি করবেন বলুন?’ আমি ফান করে বলার ভঙ্গিতে বললাম, যদিও সত্যি সত্যি আমি এখন বিরক্ত হয়েছি। কিন্তু সেটা তো আর বলা যায় না। ভদ্রতা বিষম দায়!

 

-তা ঠিক! আসলেই আপনাকে আমি অনেক জ্বালাচ্ছি। এখন অনুমতি দিলে আরেকটু জ্বালাতে চাই। অনুমতি মিলবে কি?

 

-আপনি তো বেশ মানুষ, অনুমতি নিয়ে জ্বালাতে চাইছেন! জ্বালানোর জন্য অনুমতির অপেক্ষা করলে এ জনমে আর আমাকে জ্বালাতে হচ্ছে না আপনার।

 

-বলছেন? আচ্ছা বেশ, তাহলে আর অনুমতির অপেক্ষা করছি না। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম আপনাকে আরেকটু জ্বালাব। কথাটা সরাসরিই বলে ফেলি।

 

আমি তো প্রত্যুষের বলার ঢঙ্গে ভয়ই পেয়ে গেলাম। কি রে বাবা, সরাসরি কি বলতে চায়?

 

প্রত্যুষ বলে, -‘আমি বরাবরই কেনাকাটায় যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ। যখনই দেশের বাইরে কোথাও আসি তখনই ফ্যামিলির সবার জন্য কিছু না কিছু কিনতে খুব ইচ্ছে করে। কিনিও। কিন্তু কখনোই কাউকে ঠিক খুশি করতে পারিনা। সব উলটা পালটা জিনিষ কিনে নিয়ে যাই। তাই মা এবার বারবার করে নিষেধ করে দিয়েছেন যেন কিছু না কিনি। কিন্তু এখন আপনাকে যখন পেয়েইছি তখন কৃপা করে আমাকে একটু কেনাকাটায় হেল্প করুন প্লিজ্‌! আমিও এই সুযোগে ফ্যামিলির সবার জন্য পছন্দের জিনিষ নিয়ে গিয়ে চম্‌কে দেই।’ কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে প্রত্যুষ খানিক থামে, যেন আমার কৃপা পাবে কিনা সেটা জানার অপেক্ষায় আছে।

 

আমি একটু ভাবি। একটু কি বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে? নাহ্‌, নিজেই এই ভাবনাটাকে পাত্তা দেই না। কিসের বেশি বেশি? একজনের নির্দোষ প্রয়োজনে আরেকজন সাহায্য করবে এটাই তো স্বাভাবিক জীবন! আমি তো অন্যায় বা অস্বাভাবিক কিছু করছি না। তবে আর এত ভাবনা কিসের! আমি এবার বলে দেই, -‘কৃপা মঞ্জুর করা হল। তবে সোম থেকে শুক্র কাজ করতে হয় বলে শনি বা রবিবার ছাড়া আমার এই কৃপা এ্যাক্টিভেট্‌ করতে পারবেন না।’

 

-সে জন্যই তো আজ এই মোক্ষম সময়ে আপনার দরবারে আমার আর্জি নিয়ে হাজির হয়েছি। সামনের দু’দিনই তো কৃপা এ্যাক্টিভেট করা যেতে পারে। কাল কি ব্যস্ত থাকবেন, বা পরশু?

 

 

 

 

 

-‘কাল?’ আমি চট্‌ করে ভেবে নেই, কাল আমার খুব জরুরী করণীয় কিছু আছে কিনা! নাহ্‌, রান্না ছাড়া অবশ্য করণীয় কিছু নেই। আর খাবারের জন্য অত চিন্তাই বা কিসের। সে যাহোক করে চালিয়ে নেয়া যাবে। আমি জানিয়ে দেই কাল আমার কোন সমস্যা নেই, সময় দেয়া যাবে। কথা হল আমরা সকাল এগারোটায় সেÏট্রালে যাব। আর যেহেতু একই এলাকা থেকেই যাব সেহেতু একসাথে যাওয়াই ভাল, সেক্ষেত্রে সেÏট্রালে গিয়ে একে অন্যকে খোঁজাখুঁজি করার আর ঝামেলা থাকে না। এগারোটা বাজার দশ মিনিট আগে সাবওয়ে ষ্টেশনে দেখা হবে জানিয়ে বিদায় নিয়ে আমি আবারও উত্তম সুচিত্রা আর আমার পিৎজার কাছে ফিরে এলাম।

 

সকালে পোনে এগারোটার দিকে আমি যখন সবে ফç্যাটের ডোর লক করে আমার বৈদ্যুতিক পালকীতে চড়েছি তখন প্রত্যুষের ফোন এল। রিসিভ করতেই বলল, -‘আপনি ডিরেক্ট প্ল্যাটফর্মে চলে আসুন। আমি এখানেই অপেক্ষা করছি।’ আমি বেশ অবাক হলাম! এই লোক এত আগে আগে চলে এসেছে কেন?

 

 

 

 

আড়াইটার মধ্যেই ওনার কাংখিত সবকিছু কেনা হয়ে গেল। আমি এবার নিজেই বললাম, -‘চলুন কোন দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট লাঞ্চ করি। যদিও আমি নিজে দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট যাওয়াটা পছন্দ করিনা। তবে আপনার অনারে আজ নয় গেলামই।’

 

কাছেই একটা দেশি রেষ্ট্রুরেÏট দেখে ওতেই ঢুকে পরলাম আমরা। এমনিতেই লাঞ্চের সময় প্রায় শেষ, তাই কাছেরটাই ভাল। আমি এসব রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবারের ব্যাপারে খুবই অজ্ঞ। কোনটা খেতে ভাল বা কোনটা নয় কিছুই জানিনা। তাই প্রত্যুষের পছন্দেই খাবারের অর্ডার দেয়া হল। আমরা গিয়ে একটা কর্নার টেবিলে বসলাম। এখানকার সবাই বাঙ্গালী, আর বাঙ্গালীদের কৌতুহলের তো সীমা নেই। কে জানে এরা বোধহয় আমাদের কাপল্‌ ভাবছে। ভাবলে ভাবুক, কি আর করা। খেতে এসেছি, খাওয়া হলে চলে যাব। ব্যাস!

 

এসব দেশে বাংলাদেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবারগুলো আসলে কিছুটা ইউরোপীয়ান টাচ্‌ এ এশিয়ান খাবার। ইউরোপীয়ানরা খুব বেশি ঝাল, মশলা খেতে পারে না বলে খাবারগুলো এভাবে রাঁধা হয়। আমার এই বাঙ্গালী, ইউরোপীয়, ইন্ডিয়ান ষ্টাইলের কক্টেল ‘ইউরোয়েশিয়ান’ খাবার পছন্দ না। প্রত্যুষেরও সেকারনেই দেশি রেষ্ট্রুরেÏেটর খাবার ভাল লাগছে না বুঝতেই পারছি আমি। তবুও খেতে খেতে জিগ্যেস করলাম,

 

-এখানে খেতে কেমন লাগছে?

 

-এ পর্যন্ত তো দুটো দেশি রেষ্ট্রুরেÏেট খেলাম, সবগুলোর খাবারের টেষ্ট অল্‌মোষ্ট একই।

 

-আমারও তাই মনে হয়।

 

-‘আসলে কি জানেন, বাঙ্গালির এই ছুরি চাকু দিয়ে খেয়ে পেট ভরলেও মন ভরে না।’ প্রত্যুষ খেতে খেতে বলে।

 

-‘হুম্‌, সত্যি তাই।’ আমিও একমত হই।

 

এরপরে বেশ কিছুক্ষন আমরা নিরবেই খেয়ে যাই। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখে আমি কথা বলি, -‘এই যে এখন আপনি যা কিছু কিনলেন, এসবই আর কিছুদিন পরে কিনলে আপনার অনেকগুলো টাকা বেচে যেত।’

 

-‘কেন?’ অবাক হয় প্রত্যুষ!

 

-সামনেই তো ক্রিস্‌মাাস, তাই সবকিছুর দাম কমত। জিনিষপত্রের উপরে নানান অফার থাকত।

 

-কি আশ্চর্য্য! তাই নাকি? কিন্তু কেন? আমাদের দেশে তো ঈদ, পূজো, এরকম যে কোন উৎসবের আগে সবকিছুর দাম আরও বেড়ে যায়!

 

-‘আমাদের জন্য সত্যিই অবাক হবার মতই ব্যাপার এটা। আসলে কি জানেন, স্বচ্ছলতা উদার হতে সাহায্য করে, অন্যের জন্য সুবিধে দিতে পারে।’ আমি বলি।

 

-‘তাই কি? কিন্তু আমি আপনার কথা সম্পূর্ণ মানতে পারছিনা। আমাদের দেশের ধনীদের কথা একবার ভেবে দেখুন, তারা কি উদার হতে পেরেছে? অন্যের সুবিধের কথা কি একবারও ভাবে তারা?’ প্রত্যুষ মাথা নাড়িয়ে আমার কথার বিরোধিতা করে।

 

আমি প্রসঙ্গ পালটাই।

 

-এসব ভারী ভারী কথা এখন থাক। তারচেয়ে বলুন আপনার এবারের শপিং আপনার ফ্যামিলি পছন্দ করবে বলে মনে হচ্ছে?

 

-নিশ্চয়ই!

 

-এত জোড় দিয়ে কিভাবে বলতে পারছেন?

 

-আমার নিজের পছন্দের উপরে আস্থা না থাকলেও আপনার পছন্দের উপরে আস্থা আছে।

 

-আমার পছন্দ আপনার ফ্যামিলির তো পছন্দ নাও হতে পারে!

 

-আপনার পছন্দ আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে, আর আমার পছন্দকে আমার ফ্যামিলিরও পছন্দ হবে।

 

-এর আগেও আপনি যা কিছু কিনেছেন ওনাদের জন্য সেগুলোও তো আপনার পছন্দেই কেনা ছিল।

 

-আরে ধুর্‌! অত পছন্দ করে কিনেছি নাকি। একা একা অত ঘুরে ঘুরে কিনবে কে, সামনে যা পেতাম তাই কিনে নিয়ে গেছি।

 

-‘ওহ! তাহলে তো আর আপনার ফ্যামিলিকে দোষ দেয়া যায় না।’ আমি এবার হালছাড়া সুরে বলি।

 

-আমার ছোটবোনটাকে তো চেনেন না আপনি, তাই একথা বলছেন। ওর কোনকিছুই মনমত হয় না।

 

-আদরের ছোট বোন, একটু তো এরকম হবেই।

 

-হুম্‌! ভীষন মুডি! মা বলেন, ‘তোর জন্য প্রত্যুষের বৌ টিকতে পারবে না।’

 

-আপনি বুঝি সেই ভয়েই বিয়ে করছেন না?

 

-আরে না না, সে জন্য হবে কেন? আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গিয়ে বিয়েটা আর করা হয়নি।

 

-ফ্যামিলিও বিয়ের জন্য প্রেসার দেয়নি?

 

-দেয়নি মানে? মা তো আমার কানের কাছে সারাক্ষন একটা ভাঙ্গা রেকর্ড চালিয়েই রেখেছে, আর তাতে একনাগারে বেজেই চলেছে  ‘‘বিয়ে কর’’  ‘‘বিয়ে কর’’  ‘‘বিয়ে কর’’।

 

প্রত্যুষের বলার ঢঙ্গে আমি হাসতে হাসতে বলি, -‘আর আপনি সেই রেকর্ডটা কিছুতেই থামাতে পারছেন না তাই তো?’

 

-‘থামাতে পারা তো দূরের কথা, থামাতে চেষ্টা করলেই সেই রেকর্ডের ভলিয়্যুম বরং আরও বেড়ে যায়।’ প্রত্যুষ চোখ বড় করে হতাশ ভঙ্গিতে বলে।

 

আমার আরও হাসি পায়। বলি, -‘তাহলে আর কি করবেন বলুন, বিয়েটা করেই ফেলুন বরং।’

 

-হুম্‌, আমিও ভাবছি মায়ের উপরে রাগ করে এবার বিয়েটা করেই ফেলব কিনা!

 

আমি বলি, -‘সেটাই উচিৎ হবে। বিয়ে যদি করতেই হয় তবে সেটা সময়মত করাই ভাল। শুধু শুধু বয়স বাড়িয়ে কি লাভ!’

 

-তাই যদি মনে হয় আপনার তবে নিজেও কেন আমার মতই বয়স বাড়াচ্ছেন? আপনিই বা বিয়ে করেননি কেন?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি থম্‌কে যাই। আমার মুখ থেকে যেন সমস্ত রক্ত সরে যায় মূহুর্তেই। আমি ভাবিনি বিয়ের প্রসঙ্গে আমাকে এরকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাহলে হয়ত এই বিষয়ে আমি কোন কথাই বলতাম না। আমার আপনা থেকেই হাত থেমে যায়, খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যুষ বোধহয় আমার হঠাৎ এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে। সে স্বসব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে,

 

-আমাকে ক্ষমা করবেন প্লিজ্‌! আমি আসলে খানিকটা ফান করেই কথাটা বলেছিলাম। প্লিজ্‌ অপরাজিতা, আপনি কাইন্ডলী কিছু মনে করবেন না!

 

আমি ততক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়েছি।

 

-ইট্‌স ওকে!

 

আমি বেশ খানিক্ষন আর কোন কথা বলতে পারিনা। মাথার মধ্যে এখন আমার ফç্যাশ ব্যাক হচ্ছে। মাথায় কেমন যেন একটা যন্ত্রণা অনুভব করি! আজ কতদিন পরে আবারও আমাকে সেই সময়ের মুখোমুখি হতে হল! নিজের ভেতরে কুরে কুরে খাওয়া যন্ত্রণাটা কখনোই কারও সাথে শেয়ার করতে পারিনি আমি। এদেশে একা থাকি বলে খুব বেশি মানুষের সাথে মেলামেশা করিনা আমি। বিশেষত বাঙ্গালীরা ভীষন কৌতুহলী বলে তাদের আমি বরং কিছুটা এড়িয়েই চলি। যদি দেশে থাকতাম তাহলে হয়ত বলার মত মানুষ পেতাম। কিন্তু সেই থেকেই তো এভাবেই সবার চোখের আড়ালে এতটা দূরে প্রায় আত্মগোপন করে আছি আমি। একটা মানুষও পাইনি যার সাথে যন্ত্রণাগুলো শেয়ার করে নিজেকে কিছুটা হালকা করব। হঠাৎ অনূভব করি, আমার কথাগুলো কাউকে বলাটা সত্যি জরুরী। কারো সাথে শেয়ার করলে এই যে এখন যে কষ্টটা হচ্ছে সেটা হয়ত অনেকটা কমে যেত। আমার কেন যেন মনে হয় প্রত্যুষকে বলা যায়। প্রত্যুষ তো আর এখানে থাকবে না, দেশে ফিরে যাবে। একসময় ভূলেও যাবে হঠাৎ পরিচয় হওয়া কোন এক মেয়ের কষ্টের কাহিনী। আমাকেও তো তার মুখোমুখি আর কখনও হতে হবে না। আমি আর একটু ভাবি, তারপরে বলি, -‘বয়স বাড়ার আগে সময়মতই আমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল।’

 

এবার প্রত্যুষের চম্‌কানোর পালা। আমাকে দেখে অবিবাহিতই ভাবার কথা তার, তাই হঠাৎ বিয়ে হয়েছে শুনলে চম্‌কাতেই পারে। কিন্তু সে মূহুর্ত মাত্র। প্রত্যুষ খুব সাবলিল ভাবেই এবার জানতে চায়, -‘দেয়া হয়েছিল মানে? আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে?’ প্রশ্নটা করে ফেলেই প্রত্যুষ আবারও স্বসংকোচে বলে ওঠে, -‘আই এ্যাম সরি এগেইন! এটা খুব পারসোনাল প্রশ্ন হয়ে গেছে। আপনাকে কিছু বলতে হবে না। আমরা বরং অন্য কোন প্রসঙ্গে কথা বলি।’

 

প্রত্যুষের ভদ্রতায় আমি এবার সামান্য হাসি। বলি, -‘আপনার এত সরি হবার কিছু নেই। আসলে অনেকদিন পরে আমার জীবনের অন্ধকার একটা অধ্যায় নিয়ে কারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে প্রথমেই একটু রিয়্যাক্ট করেছিলাম। কিন্তু এখন আমি ঠিক আছি। যে জীবন পেছনে ফেলে এসেছি সে তো এখন কেবলই পাষ্ট, সেটা নিয়ে আর রিয়্যাক্ট করাও উচিৎ না। আর পারসোনাল অনেক কিছু নিয়েই আমাদের কথা বলতে হয়, বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, এটাই জীবনের ধর্ম।’

 

আমি আবারও খানিক চুপ করে থাকি। তারপরে বলি, -‘দশ বছর আগে এক প্রবাসী ছেলের সাথে আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দেয়। আমি তখন মাত্র অনার্স করেছি। আমাদের এক আত্মিয়ই আমার বিয়ের জন্য এই প্রস্তাবটা নিয়ে আসে। ভদ্র পরিবার, অবস্থা ভাল। ছেলেও ইঞ্জিনিয়ার। ইউরোপে ছেলে নাকি বাড়ীও কিনেছে। যাইহোক দেশে ছেলেদের বাড়ী দেখে, যাবতীয় খোঁজ খবর নিয়ে ইত্যাদী সবকিছুতেই সন্তুষ্ট হবার মত। তবুও আমার বাবা রাজী হতে চাইলেন না। তিনি বললেন, -‘‘দেশের সবকিছু চোখে দেখে ভাল মনে হলেও ছেলে যেখানে কয়েক বছর ধরে আছে সেখানে সে কি করছে বা কেমন স্বভাবের সেটা তো আর আমরা চোখে দেখতে পাচ্ছিনা বা কোনভাবে খোঁজও নিতে পারছি না। আমি এভাবে কোন অজানায় তো আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একলা পাঠিয়ে দিতে পারিনা।’’ কিন্তু আমার মা বেঁকে বসলেন। তিনি এখানেই আমার বিয়ে দেবেন। ওনার একটাই কথা এমন অবস্থাসম্পন্ন শিক্ষিত পরিবারের ইউরোপে সেটেলড্‌ ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ের এমন সূবর্ণ সুযোগ তিনি কিছুতেই হারাতে পারবেন না। বাবা মাকে কত করে বোঝাতে চাইলেন, বিদেশে থাকা ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তাকে একলা পাঠিয়ে পরে প্রস্তাতেও হতে পারে। তার চেয়ে অনেক ভাল মেয়েকে দেশেই বিয়ে দিয়ে নিজেদের চোখের সামনে রাখা। কিন্তু মায়ের একটাই কথা, ‘‘এদেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। মেয়ে ইউরোপে থাকলে অনেক ভাল থাকবে, নিরাপদে থাকবে।’’ ফলে বাবার শত আপত্তিও ধোপে টিকল না। আমার ঐ ছেলের সাথেই বিয়ে হয়ে গেল। কয়েকমাসের মধ্যে আমি তার কাছে চলে গেলাম। আর সেখানে গিয়েই একের পরে এক ধাক্কায় আমি নির্বাক হয়ে যেতে লাগলাম। বিয়ের পরে আমি গিয়ে প্রথমেই জানলাম সে ইঞ্জিনিয়ার তো নয়ই, এমনকি পরাশোনাটাও শেষ করেনি। সে ওখানে সামান্য একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার। আমি ভীষন শক্‌ড হই! কিন্তু তবুও মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে আমি নয় একটু কম্প্রোমাইজ করলামই। কিন্তু তখনও যে আমার আরও অনেক কিছু জানতে বাকী সেটা বুঝিনি। এরপর কিছুদিন যেতে জানলাম সে ওখানে আমার আগেই ওদেশি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে এবং সেখানে তাদের একটা মেয়েও আছে।’

 

-ওহ গড্‌! দেন?

 

-আমি এটাও মেনে নিতে চাইলাম। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আমি তার জীবনে আসার আগে কি হয়েছে না হয়েছে সেসব নিয়ে না ভেবে আমার এখন এটাই দেখা উচিত সে আমাকে কতটুকু মূল্য দিচ্ছে, কতটুকু ভালোবাসছে। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলাম এটা ভেবে যে, এখন তো আমি ছাড়া তার জীবনে আর সেই মেয়ে নেই। কিন্তু আমার সেই ভাবনাটুকুও মিথ্যা প্রমানিত হতে খুব বেশিদিন লাগল না। আমি জানতে পারলাম সেই মেয়ের সাথে তার নাকি এখনও আগের মতই সম্পর্ক আছে। আমাকে যে প্রায়ই রাতে টেক্সি চালালে পয়সা বেশি বলে রাতে বাসায় ফিরত না, সে আসলে সেই মেয়ের সাথেই সেসব রাতে থাকত। সে খুব কৌশলে দু’জন মেয়ের সাথেই ডাবল্‌ রোল প্লে করে যাচ্ছিল।

 

আমি একটু থামতেই প্রত্যুষ জিগ্যেস করে, -‘এটা কি আপনি বিস্বস্ত সূত্র থেকে জেনেছিলেন?’

 

আমি প্রত্যুষের দিকে তাকাই, আমি বুঝতে পারি প্রত্যুষ আসলে কি ভাবছে।

 

-আমিও বিষয়টা প্রথম জানার পরে আপনার মতই ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম শুধু শোনাকথায় কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না।

 

-এক্সাক্টলী!

 

-আমি শোনাকথায় সিদ্ধান্ত নেইনি, নিয়েছি নিজের চোখে সবকিছু দেখে। সম্পূর্ণ বিষয়টা বুঝে এবং নিজের জীবনের শেষ পরিনতি সম্পর্কেও ধারণা পেয়েই আমি আমার সিদ্ধান্েত পৌঁছাই। ভূল সম্পর্কের শিকড় জীবনের মূলে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই তাকে স্বমূলে উপরে ফেলাই ভাল। তবে এটা কেউ পারে, কেউ পারে না। আমি পেরেছিলাম। আমি অন্য জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে তার বাসা ছেড়ে চলে আসি। তাকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে ওদেশে থাকার অনুমতি আমার ছিলই। কাজ জোগার করে নিতেও খুব বেশি কষ্ট হয়নি। কিন্তু কষ্ট হয়েছে কাজের পাশাপাশি যখন পড়াশোনা শুরু করলাম আবার। ইতিমধ্যে আমাদের ডিভোর্সের যাবতীয় ফর্ম্যালীটিও শেষ হয়ে যায়। এরপরে কাজ আর পড়াশোনা, এছাড়া আমার জীবনে আর কোনকিছুর অস্তিত্ত্ব ছিল না তখন। এভাবেই অমানষিক পরিশ্রমের তিনটা বছর পার হল। তার সাথে দু’বছরের সংসার আর এই তিন বছর মিলিয়ে পাঁচ বছর হতেই আমি পার্মানেÏট সিটিজেনশিপের জন্য আবেদন করি। সেটাও যখন হয়ে গেল, তখন তো আর ওদেশে থাকার আর কোন প্রয়োজনই রইল না আমার। আমি তো তখন ইউরোপের যে কোন দেশেই সেটল্‌ করতে পারি। আমি এদেশে চলে এলাম। তারপর তো এদেশেও পাঁচটা বছর কেটে গেল।

 

-ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি একদম ঠিক কাজটাই করেছিলেন। কিন্তু তারপরে অত কষ্ট আপনি করতে গেলেন কেন? দেশে ফিরে গেলেন না কেন?

 

-মা বাবার জন্যই দেশে ফিরে যেতে পারিনি আমি।

 

-‘মানে?’ প্রত্যুষের অবাক প্রশ্ন!

 

-একজন ডিভোর্সি মেয়ের বাবা মায়ের অনেক যন্ত্রণা, অনেক অসম্মান। তাই ওনাদের সেই অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের যন্ত্রণা নিয়ে আমিই দূরে দূরে আছি।

 

-কে বলেছে আপনাকে এমন কথা? আপনার এমন মানষিক অবস্থায় আপনার মা বাবার কাছে থাকাটাই বরং আরও বেশ জরুরী ছিল। ওনারাই পারতেন আপনার কষ্ট কমাতে।

 

-আপনি বুঝবেন না আসলে। আমি তো অনুমানের উপরে নির্ভর করে এমনটা বুঝিনি নিশ্চয়ই? আমার মায়ের কথাতেই আমি বুঝেছি, আমি দেশে ফিরে গেলে লোকে আমাকে নিয়ে নানান কৌতুহল দেখাবে, নানান মন্তব্য করবে। কেউ কেউ হয়ত উপযাচক হয়ে উপদেশ দিতে আসবে। আর এসবে আমার পরিবার প্রতিনিয়ত কষ্টের মধ্যে থাকবে, অসম্মানিতবোধ করবে। বরং ডিভোর্সের পরে আমি কখনোই দেশে থাকার জন্য যাইনি বলে অনেকেই এখনও জানে আমি ভাল আছি। সুখে সংসার করছি। ফলে দেশে যাবারও সময় হয়না আমার। গত দশ বছরে আমি একবারই দেশে গিয়েছি এবং সেটা সারে তিন বছর আগে। তখন অনেকেই ভেবেছে স্বামী ব্যস্ত তাই সাথে আসতে পারেনি।

 

-আপনি দূরে আছেন বলে এখন কি ওনারা আপনার জন্য কষ্ট পাচ্ছেন না?

 

-হয়ত পাচ্ছেন। কিন্তু আমি দূরে আছি বলে অন্তত অনেকের অনেক কথা শোনার হাত থেকে তো বেঁচে যাচ্ছেন। একটা কথাই তো আছে ‘‘চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল’’। আমিও আত্মিয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীর চোখের আড়ালে থেকে অনেকটাই তাদের মনের আড়ালেও থাকতে পারছি। তাই দূরে আছি বলে আমাকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনাও নিশ্চয়ই কম হবে। আর এতে আমার পরিবারও অপেক্ষাকৃত ভালো থাকবে।

 

কথাগুলো বলে আমার নিজের অজান্েতই দীর্ঘ্যশ্বাস পরে। প্রত্যুষও খানিক চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎই বলে,

 

-আর আপনি? আপনি কি সবাইকে ছেড়ে এই বনবাসে ভালো থাকতে পারছেন?

 

-পরিবারের কথা ভাবতে গেলে নিজের কথা আর ভাবা যায় না। তাছাড়া মায়ের উপরে আমার কিছুটা অভিমান তো আছেই। নিজের মা বলেই ওনার ভূলটাকে তো আর সঠিক বলা যাবে না। এটা তো সত্যি ওনার কারণেই আজ আমার জীবনের এই অবস্থা। মায়েরও সেটা বোঝা উচিৎ, স্বীকার করা উচিৎ। উচিৎ আমাকে ওনাদের কাছে ডাকা। কিন্তু মা সেটা না করে আবারও একই ভূল করার কথা ভাবছেন।

 

-মানে?

 

-মা চাইছেন আবারও দেশের বাইরের কোন ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিতে। কারণ আমি একে তো ডিভোর্সী, তার উপরে আবার দ্বিতীয় বিয়ে। লোকে আমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করবে। তাই আমাকে দেশের বাইরেই রাখার ব্যবস্থা করা যেন লোকে আমার সমালোচনা করার সুযোগ বেশি না পায়।

 

প্রত্যুষ অসম্ভব অবাক হয়ে শোনে। বলে, -‘আর আপনার বাবা? ওনারও কি একই মত?’

 

-না। তবে আমার বাবা শান্িতপ্রিয় মানুষ। তাই বিয়ের পর থেকে বরাবরই মায়ের মতকেই প্রাধান্য দিয়ে এসে আজ আর মা ওনার কোন মতের তোয়াক্কাই করেন না।

 

-হুম্‌! কোন কোন মহিলা এমন হন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলতে পারে! সারাজীবন তো নয় নিশ্চয়ই?

 

 

-‘জানিনা।’ আমি হালছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে বলি। নিজের অজান্েতই আমার দীর্ঘ্যশ্বাস পরে।

 

প্রত্যুষের কানে আমার দীর্ঘ্যশ্বাস যায় বোধহয়। সে খানিক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে নরম স্বরে বলে, -‘আপনার নাম অপরাজিতা, আর সেই আপনিই কিনা জীবনের কাছে এভাবে হেরে যাবেন?’

 

প্রত্যুষের কথায় আমি যেন একটা ধাক্কা খাই। আমি কখনও এভাবে ভেবে দেখিনি। জীবনের একটা একটা করে দিন দু’হাতে শুধু ঠেলে ঠেলে পার করেছি। নিজেকে নিয়ে এত ভেবে দেখার অবকাশই হয়নি কখনও। আমার হঠাৎ করেই সবকিছুর উপরে কেমন বিরক্তিভাব চলে আসে। এমন কি প্রত্যুষের সাথে কথা বলতেও আর একটুও ইচ্ছে করে না আমার। আমি বাসায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি।

 

 

 

১১

গত দু’টোদিন প্রত্যুষের সাথে আর কোন কথা হয়নি আমার। আমিও সোমবার থেকে যথারীতি কাজে যাচ্ছি, ঘরে ফিরছি। এর মধ্যে রবিবারে বাবার সাথে কথা বলে জানিয়ে দিয়েছি, এত অল্প সময়ে আমার পক্ষে ছুটী পাওয়া সম্ভব হয়নি। বাবা মন খারাপ করেছেন সেটা বুঝে আমারও খারাপ লেগেছে। কিন্তু কি বা করার আছে আমার! এখানে থাকতে হলে আমাকে রোজগার তো করতেই হবে। আর তার জন্য চাকরীটা ঠিক রাখা সবচেয়ে জরুরী। আমার আর এত ভাবতে সত্যি ভাল লাগে না। এমনিতেই আমার জীবন অনেক কঠিন, আর এই কঠিন জীবনের ভারও অনেক বেশি। এই ভারী জীবনের বোঝা টানতে টানতে আমি ভীষন ক্লান্ত। এর মধ্যে সবার মনের খবর রাখতে বা সবাইকে খুশি করতে আমি আর পারছি না।

 

মঙ্গলবার সকালে কাজে যাবার পথে প্রত্যুষের ফোন এল। জানাল আজ সে ইটালি যাচ্ছে, শনিবারে ফিরবে। এটাও জানাল ইটালি যাবার আগে এখানে কিছু কাজ গুছিয়ে না গেলেই চলত না বলে গত দু’দিন তাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আর সেজন্যই আমাকে ফোন করতে পারেনি। তাছাড়া আমাকে খুব বেশি জ্বালানো হয়ে গেছে মনে করেও নাকি রোজ রোজ ফোন করতে সংকোচ হয়। নইলে নাকি তার ফোন করতে ইচ্ছে ঠিকই হয়েছে। আমি জানাই এতে এত সংকোচ বোধ করার মত কিছুই হয়নি। আমাদের কথা আর বেশি এগোয় না। প্রত্যুষ জানায় ইটালি গিয়ে সে ফোন করবে। আমিও তাকে ‘গুড লাক’ জানিয়ে ফোন রাখি।

 

আমরা যারা প্রবাসী তারা কখনও দেশে যাবার কথা একটুখানি ভেবে ফেললেই মহাসর্বনাশ! এরপরে দেশে না যাওয়া পর্যন্ত কাজেকর্মে কিছুতেই আর মন বসে না। তখন যেন আমরা প্রাণহীন হয়ে যাই। শরীরটাই শুধু নিজের কাছে থাকে, মনটা চলে যায় দেশে। আমারও এখন সেই অবস্থা! বাবা যেদিন বললেন ‘এবারের ঈদটা তোর সাথে করতে ইচ্ছে করছে, তুই কি আসতে পারবি?’ সেদিন থেকে আমার মনও কেবলই যাই যাই করছে। আমিও যেন এখন এক প্রাণহীন ছায়াশরীর। দূর এভাবে কি ভালো লাগে কিছু? আমারও কিছুই ভালো লাগছে না। আমি ঠিক করি, ঈদের দিনটা যেভাবেই হোক ছুটী ম্যানেজ করে সারাদিনের জন্য আমি দূরপাল্লার কোন ট্রেনে চড়ে বসব। সারাদিন ধরে একাই ঘুরে বেড়িয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে রাতে ঘরে ফিরব। যেন ঈদে বাবার সাথে থাকতে না পারার কষ্টটা থেকে কিছুটা হলেও পালিয়ে থাকা যায়।

 

 

 

 

বুধবার একটু বেশি রাতেই প্রত্যুষের ফোন এল। বেশি রাত মানে তেমন বেশি নয়, দশটার একটু বেশি। কিন্তু এর আগে প্রত্যুষ কখনোই নয়টার পরে ফোন করেনি বলেই আজ রাত দশটাকেই বেশি রাত মনে হচ্ছে। আমি ফোন রিসিভ করতেই প্রত্যুষের সহাস্য প্রশ্ন, -‘রাত দশটা বাজিয়ে ফোন করলাম বলে অভদ্র ভাবছেন না তো?’

 

প্রত্যুষ যে ক’দিন আগেই আমার জীবনের অতীত জেনেছে, তার কথায় সেটার কোন ছাপই নেই। আমিও তাই স্বস্তি পাই। হেসে উঠে বলি, -‘মোটেও না। তা ভাববো কেন?

 

-না আপনাদের ইউরোপীয় কালচারে তো কাউকে রাত ন’টার পরে ফোন করাটাই অভদ্রতা, সেখানে তো এখন রাত দশটা বেজে গেছে।

 

-হ্যা! এখানকার কালচার অবশ্য এরকমই। কিন্তু আমি তো আর ইউরোপীয় নই!

 

-কি করে বুঝি বলুন, যেভাবে একলাই জীবনকে দাপিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তাতে কি এখনও আপনি অবলা বাঙ্গালী নারীই আছেন?

 

-অবজেকশন! বাঙ্গালী নারী মানেই অবলা এরকম ভাবেন কেন আপনারা, মানে পুরুষরা বলুন তো? আপনি নিজেও কিন্তু জানেন আজ বাঙ্গালী নারীরা কোথা থেকে কোথায় পৌঁছেছে, তারপরেও এরকম ভাবতে বা বলতে পারেন কি করে?

 

-‘রক্ষে করুন। মাফ চাই! আপনারা যে মোটেও অবলা নন সেটা এই মূহুর্তে আমার চেয়ে আর বেশি কে বুঝছে!’ প্রত্যুষের স্বরে ছদ্ম ভয়। তারপরেই বলে, -‘সারাদিন কি করলেন?’

 

-কি আর করব! আমার জীবন তো আর রবি ঠাকুরের সেই গৃহপালিত মহিলা সদস্যের মত নয় যে রাঁধার পরে খাওয়া, খাওয়ার পরে রাঁধা-এই নিয়ে মোর জীবনখানি বাঁধা থাকবে! আমাকে নিজের অন্ন, বস্ত্রের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। আর সেজন্য সকালে উঠে কাজে যেতে হয়। আবার কাজ থেকে ফিরেও আবদুর রহমানের মত জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সবই নিজেকেই করতে হয়। এক্ষেত্রে আবদুর রহমানের সাথে আমার তফাৎটা এটুকুই, সে মাসিক বেতন চুক্তিতে একটা পরিবারের সবার জন্য কাজগুলো করত আর আমি কেবল নিজের জন্যই কাজগুলো করি এবং অবৈতনিক!

 

-আপনি কথা এত গুছিয়ে বলেন কি করে?

 

-‘জীবনটাকে গোছাতে পারিনা তো, তাই কথাগুলোই গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করি।’ আমি হঠাৎ হালকা পরিবেশে ভারী কথা বলে ফেলি। তাই পরিবেশটাকে স্বাভাবিক রাখতে নিজেই তাড়াতাড়ি করে বলে উঠি, -‘আপনি কেমন আছেন বলুন? কাজকর্ম  ঠিকমত এগোচ্ছে তো?’

 

-‘না এগিয়ে উপায় আছে? তাছাড়া কোথাও যাবার আগে আমি যখন লাগেজ গোছাই তখন লাগেজের সাথে সাথে আমার মনটাকেও গুছিয়ে নেই। তাই সেই গোছানো সংক্ষিপ্ত মনের দাবী দাওয়া অনেক কম থাকে, প্রত্যাশাও তেমন বেশি থাকে না তার। সেজন্য কোথাও গেলে ভালই থাকি আমি। শুধু একনাগারে ভাত না খেয়ে থাকলেই একটু যা কষ্ট হয়।’ প্রত্যুষ শেষ কথাটুকু হাসতে হাসতে বলে।

 

-বাহ্‌! আপনার মন যখন এতই ফেçক্সিবল্‌ যে তাকে চাইলেই গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত করে ফেলা যায় তবে আপনি কখনও দেশ ছেড়ে থাকতে পারবেন না বলেন কেন? আপনার পক্ষে তো যে কোন জায়গাতেই ভাল থাকা সম্ভব।

 

-কি যে বলেন! মনকে কয়েকদিনের জন্য সাময়িক ভাবে গুছিয়ে সংক্ষিপ্ত করে রাখা যায়, কিন্তু তাই বলে কি বছরের পর বছর মনকে এভাবে আবদ্ধ রাখা সম্ভব? মন হাফিয়ে উঠবে না? মনের সাফোকেশন হবে না?

 

আমি প্রত্যুষের কথায় হেসে উঠি। বলি, -‘মনের সাফোকেশন?’

 

-হাসলেন কেন? মনের সাফোকেশন হয়না? মনের জন্য স্পেস প্রয়োজন হয় না? আপনি কি মনে করেন শুধু শরীরের জন্যই অক্সিজেন প্রয়োজন? শুনুন, মনেরও অক্সিজেন লাগে।

 

প্রত্যুষের কথায় আমি যেন স্বগোক্তির মত করে বলি, -‘মনের আবার অক্সিজেন!’

 

-‘নিশ্চয়ই! শরীরের জন্য আমাদের যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন তেমনি মনের জন্যও এক ধরনের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আপনাকে কোন ছোট্ট, বদ্ধ ঘরে আটকে রাখলে আপনার শরীরের যেমন অক্সিজেনের অভাব বোধ হবে, সাফোকেশন হবে, ঠিক তেমনি আপনার মনকেও তার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু থেকে বিযুক্ত রাখলে আপনার একটা বদ্ধ অনুভূতি হবে। এই অবস্থায় আপনার চারপাশের পরিসর যতই হোক না কেন, আপনার মনের জন্য স্পেস কিন্তু অনেক কম হবে। কারণ আপনি আপনার মত করে কিছুই পাচ্ছেন না। আপনার মনের তখন অস্থির লাগবে, সাফোকেশন হবে। আর মনের সাফোকেশন হলে শরীরের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনকেও আপনার আর যথেষ্ট মনে হবে না। তখন আপনার সত্যি দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইবে। আমার কাছে দেশ ছেড়ে থাকাটাও ঠিক তেমন। এখানে আমার শরীরের জন্য প্রচুর স্পেস, অক্সিজেনেরও কোন অভাব নেই ঠিকই, কিন্তু আমার মনের জন্য এখানে কতটুকু স্পেস আছে বলুন? আমার মন তো সারাক্ষন আমার পরিবার, আমার বন্ধু বান্ধব, আমার দেশ, আমাদের নানান কালচারাল উৎসব, এমন কি আমার দেশের আকাশ, বাতাস, মাটী, বসন্েত কোকিলের ডাকটা পর্যন্ত চাইবে, কিন্তু সেসব এই প্রবাসে আমি কোথায় পাব বলুন? মনকে আমি গুছিয়ে নাহয় কিছুদিনের জন্য মানিয়ে নেব। কিন্তু সেটাই বা কতদিন? তারপর? আমার মনের কি তখন দম বন্ধ হয়ে আসবে না এখানে?’ প্রত্যুষ এক নিঃশ্বাসে তার অনুভূতির কথা বলে যায়।

 

তারপরেই আবার বলে, -‘অনেকেই আমার সাথে একমত হবে না হয়ত। তারা হয়ত দেশ ছেড়ে দিব্যি যে কোন জায়গাতেই থাকতে পারে। কিন্তু যে পারে সে পারে, আমি পারি না।

 

আমি কানের সাথে আমার ছোট্ট মোবাইলটা ধরে রেখে প্রত্যুষের কথাগুলো শুনি। কথাগুলো মোবাইল গলে আমার কানে, তারপরে কান থেকে আমার বুকের মধ্যে গিয়ে ঢোকে, সেখান থেকে আমার মনে, আমার অনূভবে। আমি আমার চারপাশে তাকাই। এই তো ছাপ্পান্ন স্কোয়্যার মিটারের বাসা আমার, একার জন্য বেশ বড়! চতূর্দিকে বড় বড় কাঁচের জানালা। বাইরে তাকালেই অবারিত আকাশ। একটা ব্যালকনিও আছে, চাইলেই আমি সেখানে গিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি। দরজা খুলে বেড়িয়ে পরলেই তো বিশাল দেশটাই আমার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু তবুও এখন আমার এত দম বন্ধ হয়ে আসছে কেন? কেন আমার মনে হচ্ছে আমি একটা বদ্ধ ঘরে কতকাল বন্দি হয়ে আছি? আমি বুক ভরে শ্বাস নিতেও পারিনা যেন! প্রত্যুষের ‘হ্যালো, হ্যালো’ আমার কানে যেন আর ঢোকে না। আমি কোনরকমে ‘এখন রাখি’ বলে ছুটে ব্যালকনিতে যাই, বুক ভরে শ্বাস নেবার চেষ্টা করি। কিন্তু কই আমার বুকটা তো আর অক্সিজেনে ভরে যাচ্ছে না! আমার বাতাসে অক্সিজেন কমতে থাকে। আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।

 

 

 

১২

সেই রাতের পরে আমি আবারও জীবনের স্বাভাবিকতায় ফিরে এসেছি ঠিকই, কিন্তু অনেক কিছু নিয়েই এখন কিছুটা অন্যভাবে না ভেবেও পারছিনা আর। এতদিন আমি আমার পরিবার, আমার সমাজ-সংস্কার নিয়ে যতটা ভেবেছি ততটা নিজের জন্য ভাবিনি আমি। জেনেছি আমি সুখি নই, কিন্তু দুঃখটা ঘোচাবার কোন চেষ্টা করিনি কখনও। বুঝেছি আমি প্রতারিত, বঞ্চিত, কিন্তু নিজে থেকেও কোনকিছু নিতে চাইনি। অনেকের অনেক ভূল দেখেও সেই ভূল ভাঙ্গিয়ে দেবার চেষ্টা করিনি কখনও। বরং নিরবে নিজেকেই সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছি। আমি অভিমান করেছি যতখানি, সাহস করিনি ততটা। আমার বোধহয় একবার নিজের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

 

বৃহস্পতিবারে প্রত্যুষকে নিজেই ফোন করে রবিবারে আমার এখানে খেতে বললাম। এই বলাটা ঠিক হবে কিনা সেটা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়েছে আমাকে। বুঝতে পারছিলাম না আমার বাসায় একটা একলা পুরুষকে খেতে বলা ঠিক হবে কিনা। কিন্তু পরে নিজেই ভেবে দেখলাম, এটা এমন কিছু বিশাল ব্যাপার না, যা নিয়ে এত করে ভাবতে হবে আমাকে। একজন মানুষ খারাপ না ভাল সেটা অন্যের পক্ষে বোঝা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু তো নয়। এই কয়েকদিনে প্রত্যুষ যে খারাপ মানুষ নয় সেটুকু বোঝার মত বয়স এবং অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমার হয়েছে। তাছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে একটা মানুষের সাথে পরিচয় হল, তার সাথে বাইরেও গেলাম একদিন, ফোনে কথা বলছি প্রায়ই, এমন কি বন্ধুর মত নিজের জীবনের অতীত নিয়েও বলে ফেললাম। এখন তাকে যদি একবার নিজের বাসায় খেতে না বলি তবে সেটা অভদ্রতার চূড়ান্ত হয়ে যায় না? বিশেষ করে সে যদি একটুখানি মন ভরে ভাত খেতে না পারার কষ্টের কথা আমার কাছেই বলে? তাই আর এত সাতপাঁচ না ভেবে বলেই ফেললাম আজ। প্রত্যুষ শনিবার বিকেলের মধ্যেই ইটালি থেকে ফিরবে, রবিবার দুপুরে আমার এখানে আসবে।

 

শুক্রবার কাজ সেরে ফেরার পথে বাজারটা সেরে ফেললাম। এখন আর শনিবারে না বেড়োলেও চলবে আমার। ঘরদোর ক্লিনিং, গোছানো, রান্না, এসব শনিবারেই করে রাখতে হবে। রবিবার সকালে তাহলে আর কাজের কোন ষ্ট্রেস্‌ থাকবে না। প্রবাস জীবনে কাউকে ইনভাইট করার বড় যন্ত্রণা! একা হাতে সব করতে হয় বলে প্রতিটা মূহুর্ত হিসেব করে চলতে হয়। আমিও কখন কি করলে আমার সুবিধে হবে হিসেব করেই নিয়েছি। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে এসেই ঝামেলায় পরে গেলাম। প্রত্যুষ যে কি খায় আর কি না খায় সেটা তো জানিনা আমি! আমি ভেবেই রেখেছি রিচ্‌ফুড করব না। কারণ প্রত্যুষের এখন মন ভরে ভাত খেতেই ইচ্ছে করছে, পোলাও না। কিন্তু ভাতের সাথে করতে গেলেও তো কতশত পদ আছে, আর তার সবই যে প্রত্যুষ খায় বা পছন্দ করে তা নিশ্চয়ই নয়। একবার ভাবলাম ফোন করে জিগ্যেস করি। কিন্তু পরোক্ষনেই মনে হল, জিগ্যেস করে কোন লাভ নেই। ভদ্রতা করে কিছুই বলবে না। তারচেয়ে বেটার নিজের যা কিছু করতে ইচ্ছে হয় তাই করি আমি। প্রত্যুষ খেলে ভাল, না খেলেও কোন সমস্যা নেই। আমি বরং ক’দিনের জন্য রান্নার হাত থেকে বেঁচে যাব। খাবারগুলো ফ্রিজে রেখে বেশ কয়েকদিন আরাম করে খেতে পারব।

 

রবিবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রান্নার ফিনিশিংটা দিয়ে নিলাম আগে। এরপর ঘরদোর গুছিয়ে পরিপাটি করে নিজেও শাওয়ার নিয়ে বারোটার মধ্যেই তৈরী হয়ে নিলাম। প্রত্যুষকে আমার বাসার লোকেশন আগেই ফোনে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। তবুও বলে রেখেছিলাম, চিনতে অসুবিধা হলে আমাকে যেন ফোন দেয়, আমি ফোনে ডিরেকশন দিলে তার আর পথ চিনে আসতে কষ্ট হবে না। পোনে একটা পর্যন্ত মোবাইল বাজল না, বরং একটা বাজার ঠিক দশ মিনিট আগেই ডোরবেল বেজে উঠল। কোন ফোন না দিয়েই নিজেই পথ চিনে চলে এসেছে প্রত্যুষ। আমি হাসিমুখে দরজা খুলে দিয়ে অভ্যার্থনা জানালাম। প্রত্যুষের হাতে বিশাল এক ফçাওয়ার বুকে আর বড় এক প্যাকেট চকোলেট।

 

প্রত্যুষ বাসায় ঢোকার পরে আমি দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই আমার দিকে হাসি মুখে ফুল আর চকোলেট বারিয়ে দিল প্রত্যুষ।

 

আমি হেসে উঠে বললাম, -‘আপনি দেখছি খাস ইউরোপীয়ান কায়দায় দাওয়াতে এসেছেন! কিন্তু না আমি ইউরোপীয়ান, না আপনি।’

 

-‘হুম্‌, এখন তো তাই দেখছি।

 

-‘মানে? এটা বুঝি আপনি আগে জানতেন না? এতদিন কি আপনি ভেবেছেন ইউরোপে থেকে থেকে আমি ইউরোপীয়ান হয়ে গেছি?’ আমি অবাক হই!

 

-এই কয়েকটাদিন আপনাকে জিন্‌স, শার্ট, কিম্বা টপ্‌সেই দেখেছি তাই ওরকম একটু ভাবলে কি খুব ভূল ভাবা হবে বলুন?

 

-তো আজ সেই ভূল ভাঙ্গলো বলতে চাইছেন?

 

-‘যেরকম শাড়ীতে, চুড়িতে, আর টিপে সেজেছেন তাতে আজ আর ভূল না ভেঙ্গে কোন উপায় আছে?’ প্রত্যুষ আমার দিকে স্বসংকোচ দৃষ্টিতে একবার দেখে নিয়ে আবারও বলল, -‘আজ আপনাকে একশত ভাগ বিশুদ্ধ বঙ্গললনা মনে হচ্ছে।’

 

-আপনি এমন করে ‘একশত ভাগ বিশুদ্ধ’ বললেন, নিজেকে এখন আমার সরিষার তেল মনে হচ্ছে।

 

প্রত্যুষ ঘর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। আমিও প্রত্যুষের সাথে খানিক হাসি, হেসে ভেতরে এসে বসতে বলি। সোফায় বসতে বসতে প্রত্যুষ বলে, -‘এখন বুঝতে পারছি কেন সবাইকে ছেড়ে ছুরে এখানে বছরের পরে বছর থাকতে পারছেন আপনি!’

 

আমি অবাক হই! -‘কি বুঝলেন?’

 

-‘এই যে এত সুন্দর আবাস হলে মন কি আর না বসে পারে!’ প্রত্যুষ চোখ দিয়ে চারিদিক দেখিয়ে বলে। তারপরেই আবার বলে, -‘নাহ্‌, আপনি শুধু কথাই গুছিয়ে বলতে পারেন না, নিজগৃহও সুন্দর করে গোছাতে পারেন। আপনার আবাস সত্যিই সুন্দর! এটা কিন্তু সবাই পারে না। এটাও একটা শিল্প।’

 

-আপনি যেন সবাইকে খুব চেনেন, জানেন? অনেকেই পারে। ক’জনকে আর দেখেছেন আপনি।

 

-‘কোনকিছু বুঝতে সবটুকু দেখতে হয় না। যতটুকু দেখা হয়েছে তার মধ্যে থেকেই অনুমান করে নেয়া যায়। আমি তো এমনটা সচরাচর দেখিনি। তাই এটা বলতেই পারি আমি।’ প্রত্যুষ নিজের ধারণায় অবিচল।

 

আমি নিজের প্রশংসা শুনে আস্বস্তিবোধ করতে থাকি। প্রত্যুষকে থামাতেই বলে উঠি, -‘আমার কিন্তু সমস্তই রেডি। এখনই কি খাবার দিয়ে দেব, নাকি একটু পরে খাবেন?’

 

-সবে তো এলাম, একটু পরে খাই? নাকি আপনি আমাকে তাড়াতাড়ি করে খাইয়ে বিদায় করতে চাইছেন?

 

-কি যে বলেন না আপনি! আমি নিশ্চয়ই সেটা মিন করিনি! আমার ওভাবে বলার অর্থ হল, আপনার ক্ষিধে পেয়ে থাকলে আমি এখনই খাবার দিতে প্রস্তুত।

 

-না আমার এখনও অতটা ক্ষিধে পায়নি। আপনি বসুন তো, আপনার সাথে গল্প করি।

 

-আচ্ছা আপনাকে এখন তাহলে জুস্‌ দেই। ঘরে কমলা, আপেল, আর মিক্সড্‌ ফ্রুট্‌স জুস আছে, কোনটা দেব?

 

-এটা কি কোন জুস ফ্যাক্টরী! এত রকমের জুস কেন বাসায়?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি মনে মনে বলি, আপনি কি করে বুঝবেন এতরকমের জুস কেন বাসায়! আরে ভাই আমি কি জানি নাকি আপনি কি খান আর কি খান না? কিন্তু মুখে তো আর সেটা বলতে পারি না। তাই কোনরকমে বলি, -‘কখনও কখনও কেনা হয়ে যায়। এখন আপনি বলুন আপনার কোনটা পছন্দ?’

 

-আপনার তো জানার কথা না, আমি কিন্তু তেলাপোকা, অর্থাৎ সর্বভূক। যা খুশি দিতে পারেন আপনি। তবে আপনাদের এখানকার আপেল জুসটা বেশ ভাল লেগেছে আমার।

 

আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! মনে মনে বললাম, আপনি তেলাপোকা হওয়াতে আমি যারপর নাই খুশি। এখন আমি নিশ্চিন্েত আমার আইটেমগুলো সার্ভ করতে পারব। আমি আমাদের জন্য জুস নিয়ে ফিরে এসে দেখি প্রত্যুষ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার এগিয়ে দেয়া জুসের গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল, -‘আপনাদের প্রকৃতি সত্যিই সুন্দর! এই যে অক্টোবরের প্রকৃতি যেন আগুনঝরা! গাছে গাছে হলুদবর্ণ পাতাদের দেখলেই ‘‘ওরে ভাই আগুন লেগেছে বনে বনে’’ গানটা মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে।’

 

-আপনি একদম আমার মনের কথাটা বলেছেন। আমারও অক্টোবরের হলুদ প্রকৃতি দেখলেই ঐ গানটা মনে পরে যায়।

 

-‘এত হলুদ এর আগে আমি কখনও দেখিনি!’ প্রত্যুষ মু© দৃষ্টিতে বাইরে দেখতে দেখতে বলে।

 

-আসলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কাÏিট্রগুলোর সবকিছুই যেন একটু  বেশি বেশি, এক্‌ষ্টৃম!

 

-‘কেমন?’ প্রত্যুষ আমার দিকে ফিরে বলে।

 

-এই যেমন এখন গাছের পাতাদের হলুদ দেখছেন, সেটাও যেমন ভীষন একটা ব্যাপার! তেমনি সামারে যখন গাছে গাছে সবুজ পাতা থাকে তখন সেই সবুজও ভীষন! বাংলাদেশকে সবুজের দেশ বলা হয়, কিন্তু এদেশের সামার যতটা সবুজ তার পচিশভাগ সবুজও বাংলাদেশে নেই। সামারের প্রকৃতি পুষ্পে, পত্রে পল্লবিত হয়ে ভীষন জীবন্ত! অথচ শীতে শুধুমাত্র ক্রিস্‌মাস ট্রি আর পাইন গাছেই পাতা থাকে, এছাড়া অন্যসব গাছের সমস্ত পাতা ঝরে গাছগুলো যেন কংকালের মত দাঁড়িয়ে থাকে। তাই শীতের প্রকৃতি ভীষন মৃত! সামারে রঙ্গিন প্রকৃতি যেমন স্বর্গের মত সুন্দর, শীতের তুষারে ঢাকা শুভ্র প্রকৃতিও তেমনই ভয়ানক স্বর্গিয়! সামারে নাতিশীতোষ- আবহাওয়া যেমন ভীষন আরামদায়ক, শীতে হারকাঁপানো ঠান্ডা ততটাই ভয়ংকর! আবার শীতের দিনগুলো ভীষন ছোট, সকাল হয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার আগেই তিনটা বাজতে না বাজতেই রাত নেমে আসে। ওদিকে সামারের দিনগুলো ভীষন বড়! সূর্য্য প্রায় কখনোই ঢোবে না। ঘড়ি দেখে রাত কিনা বুঝে নিতে হয়। ঘড়ির হিসেবে যখন রাত এগারোটা তখন কেবল সন্ধ্যা নামে। আবার সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাত ঘন হবার আগেই একটার দিক থেকেই ভোরের আলো ফুটে ওঠে। সূর্য্য যেন যেতে গিয়েও মত পালটে আবারও পৃথীবির কাছে ফিরে আসে। সূর্য্য আর পৃথীবির এমন প্রেম দেখতে হলে আপনাকে ইউরোপের এদিকটায় আসতেই হবে।

 

-‘সত্যিই প্রকৃতি যেভাবে মানুষকে মু© করতে পারে সেভাবে আর কিছুই মানুষকে মু© করতে পারে না!’ প্রত্যুষ বাইরে থেকে চোখ না সরিয়েই বলে।

 

আমার ঘড়ির দিকে চোখ পরতেই দেখি দুটো বাজতে তেরো মিনিট বাকী। আমি আর কথা বাড়াই না। এবার আর প্রত্যুষের বলার অপেক্ষাও করিনা, নিজেই এবার খাবার দেবার কথা বলি। প্রত্যুষ আমাকে হেল্প করতে চায়। আমি তাকে জানিয়ে দেই, তাতেই বরং আমার আরও দেরী হয়ে যাবে। আমি আসলে নিজের মত করে গুছিয়ে কাজ করতেই পছন্দ করি। প্রত্যুষকে দেখার জন্য একটা মুভি চালিয়ে দিয়ে আমি কিচেনে আসি।

 

সমস্ত খাবার গরম করে টেবিল সাজিয়ে প্রত্যুষকে খেতে ডাকলাম। প্রত্যুষ টেবিলে খাবারের সমারোহ দেখে চোখ কপালে তুলে বলল, -‘আপনি এসব করেছেন কি! এত খাবার? একা আমার জন্য? আমি সর্বভূক হতে পারি, তাই বলে খাদক তো নই!’

 

-আপনি যে তেলাপোকার মত সর্বভূক সেটা তো আর আমার জানা ছিল না। কোনটা খান আর কোনটা খান না তার সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলনা বলেই যতটা পেরেছি করেছি। এই ভরষায় যে এতগুলোর মধ্যে অন্তত কয়েকটা নিশ্চয়ই আপনার পছন্দের সাথে মিলে যাবে। আর ভাত করেছি অনেকদিন আপনার ভাত না খেতে পারার দুঃখের কথা মাথায় রেখেই।

 

-‘অপরাজিতা, আমি সত্যি অভিভূত!’

 

প্রত্যুষের ক¥ শুনেই সেটা বুঝতে পারি আমি।

 

প্রত্যুষ এবার বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলে, -‘আপনি তো রাঁধেনও খুব ভাল!’

 

-আপনি না খেয়েই খুব বুঝে গেলেন আমি রাঁধি ভাল?

 

-আরে রং আর গন্ধেই খাবারের গুন বোঝা যায়। নিশ্চিত হওয়া যায় খাবারটা স্বাদ হয়েছে কিনা।

 

-তাই নাকি?

 

-নিশ্চয়ই! যেমন ধরুন একটা পাকা আমের রং আর গন্ধেই কিন্তু আপনি বুঝে যাবেন আমটা মিষ্টি হবে কিনা। ঠিক কিনা বলুন?

 

-হুম্‌, আমটার রং আর গন্ধে সেটা খেতে মিষ্টি হবে কিনা তা বোঝা যাবে ঠিকই, কিন্তু আমটার ভিতরে পোকা আছে কিনা সেটা কিন্তু বোঝা যাবে না, সেটা বোঝা যাবে খেতে গিয়েই। আমার রান্নার ক্ষেত্রেও আপনার ধারণা ভূল হয়ে যেতে পারে।

 

-আচ্ছা আপনার সমস্যাটা কি বলুন তো? আপনার কি প্রশংসায় এলার্জি?

 

-‘মানে?’ আমি অবাক হই!

 

-না, এসে থেকেই দেখছি আপনার প্রশংসা করলেই আপনি সেটাকে ভূল প্রমানিত করতে উঠে পরে লাগছেন। তাই জানতে চাইছি আপনার প্রশংসায় এলার্জি আছে কিনা?

 

প্রত্যুষের কথায় আমি হেসে ফেলি। বলি, -‘প্রশংসায় এলার্জি নেই, তবে সাইড এফেক্ট আছে।’

 

-‘মানে?’ এবার প্রত্যুসের অবাক প্রশ্ন।

 

-মানে কেউ এত প্রশংসা করলে খুব অস্বস্তি হয়, কিছুটা লজ্জাও লাগে। এটা তো প্রশংসার সাইড এফেক্টই তাইনা?

 

-‘হুম্‌! তবে এরকম সাইড এফেক্টে কিন্তু প্রশংসার মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।’

 

আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতেই বলে প্রত্যুষ। আমি অর্থটা বুঝিনা।

 

-মানে?

 

-মানে এরকম সাইড এফেক্টে মেয়েদের সৌন্দর্য্য আরও অনেক বেড়ে যায়। ফলে প্রশংসাও আরও বেড়ে যাবে, তাইনা?

 

আমি হেসে ফেলি।

 

-‘আপনি কিন্তু সাইড এফেক্ট বাড়াচ্ছেন।’ হাসতে হাসতে বলি আমি।

 

-তাহলে আর কি, প্রশংসাও বাড়তেই থাকবে।

 

কাঁধ ঝাকিয়ে এমন এক ভঙ্গিতে কথাটা বললো প্রত্যুষ যে এবার দুজনেই একসাথে হেসে উঠি।

 

-‘আচ্ছা আমার জন্য কি শুধু অর্ধভোজনই বরাদ্দ?’ প্রত্যুষ হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে বলে।

 

-‘তা হবে কেন?’ আমি আবাক হই!

 

-কিন্তু তাই তো মনে হচ্ছে। ঘ্রানে নাকি অর্ধভোজন হয়। সেই থেকে তো আমি কেবল খাবারগুলোর ঘ্রাণই পাচ্ছি, এখনও তো টেবিলেই বসতে বলা হল না আমাকে।

 

আমি ব্যস্ত হয়ে বলি, -‘ছি! ছি! তাই তো! আপনি বসুন প্লিজ!

 

 

 

 

খাবার শেষে লিভিংরুমে ফিরে আসার পরে প্রত্যুষ বলল, -‘সত্যি, দেশ থেকে আসার পরে এই এতদিনের মধ্যে আজ আমি সত্যিই মনভরে খেলাম। এতটাই মন ভরেছে যে গত কয়েকদিনের ভাত না খাবার কষ্ট সুদসমেত উশুল হয়ে গেছে। আজকের এই খাবারের তৃপ্তির কথা আমার মনে থাকবে।’

 

-জেনে ভাল লাগছে।

 

-‘আমার এখন কি ইচ্ছে করছে জানেন? ইচ্ছে করছে এখনই মাকে ফোন করে আজকের দিনটার কথা বলি।’ ছেলেমানুষের মত করে বলে প্রত্যুষ।

 

-কেন? বলার মত তো এমন কোন বিশেষত্ত্ব নেই আজকের দিনটায়?

 

-নিশ্চয়ই আছে।

 

-কেমন?

 

-আমার মা জানেন দেশের বাইরে এলে আমি ভাল থাকি না, ঠিকমত খেতে পারিনা। তাই আমি দেশের বাইরে এলে আমার মা’ও ভাল থাকেন না। কাজেই আজকের দিনটা আমি খুব ভাল কাটিয়েছি জানলে, মনভরে খেয়েছি জানলে আমার মা’র মনটাও আজ ভরে যাবে। আমার মা আমার বন্ধুর মত। আর সেজন্যই আমি যে কোন আনন্দ, ভাললাগাই মায়ের সাথে শেয়ার না করে থাকতে পারিনা।’ কথাগুলো বলে মুহূর্তকাল থেমেই প্রত্যুষ জিগ্যেস করল, -‘আপনি কি কিছু মনে করবেন আমি যদি আপনার এখান থেকেই মাকে ফোন করি?

 

-না না, কিছু মনে করব কেন? আপনি করুন প্লিজ্‌!

 

আমি উঠে গিয়ে কর্ডলেস ফোন আর দেশে কল করার কার্ড এনে দেই। ওগুলো আনতে দেখেই প্রত্যুষ বলে ওঠে, -‘ওসবের প্রয়োজন নেই। আমার কাছে দেশে কল করার কার্ড সবসময়ই থাকে। আমি মোবাইল থেকেই কার্ড ইউজ করে কল করি।’

 

মাকে ফোন করে প্রত্যুষ। কেউ তার কাছের মানুষকে ফোন করলে সেখানে থেকে তার কথা শোনাটা কোন শোভন কাজ নয়। আমি তাই প্রত্যুষকে কথা বলার প্রাইভেসি দিয়ে কিচেনে চলে আসি। দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে এই সময়টায় আমি ডিস্‌ ওয়াশের কাজটা এগিয়ে রাখি। মিনিট পনেরো পরে প্রত্যুষ হঠাৎ আমাকে ডেকে বলে, -‘আমার মা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান।’

 

কথাটা শুনে আমি যেমন অবাক হই, তেমনই অস্বস্তিতে পরি। ওনার মায়ের সাথে আমি তো পরিচিতই নই, কি কথা বলব হঠাৎ আমি? তাও আবার না দেখেই, ফোনে? কিন্তু এখন তো না বলারও কোন উপায় নেই। আমি তাড়াতাড়ি ভেজা হাত মুছে প্রত্যুষের হাত থেকে ফোনটা নেই।

 

-‘হ্যালো! অপরাজিতা মা, কেমন আছ তুমি?’ ওপ্রান্ত থেকে প্রত্যুষের মা’ই প্রথম কথা বলেন।

 

কোন অদেখা, অচেনা মানুষ যে এমন কাছের মানুষের মত, এত আপন করে কথা বলতে পারেন আমি এর আগে কখনোই জানতাম না। আমি বিষ্ময়ে এতটাই অভিভূত হয়ে যাই যে কিছু মূহুর্ত আমি কোন কথাই বলতে পারি না। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে ওনাকে সালাম জানাই। বলি,

 

-আমি ভালো আছি। আপনি ভালো তো খালাম্মা?

 

-ছেলেকে দেশের বাইরে নিজের কাছে থেকে এতদূরে পাঠিয়ে আমি আর ভাল থাকি কি করে মা! তাও আবার সামনে ঈদ, অথচ ছেলেটা আসবে ঈদের ঠিক আগেরদিন। এর আগে কিছুতেই নাকি টিকেট পাওয়া গেল না। ভাল লাগে বল?

 

-সে তো নিশ্চয়ই!

 

আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই উনি আবার বলে ওঠেন, -‘প্রত্যুষ তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রোজই ফোন করলে তোমার কথা কিছু না কিছু বলেই। তুমি মা আমার ছেলেটার জন্য অনেক করছ!’

 

আমি ভীষন লজ্জা পেয়ে যাই। বলি, -‘উনি আপনাকে শুধু শুধু বাড়িয়ে বলেন।’

 

-না মা, আমার ছেলে কোন কিছু বাড়িয়ে বলার ছেলে না। যেখানে বলার মত কিছু থাকে না সেখানে সে কিছু বলতেই পারেনা। আবার যেখানে বলার মত কিছু থাকে সেখানে না বলেও থাকতে পারে না। এজন্য অনেকেই অবশ্য ভূল বোঝে ওকে। কেউ ভাবে ও খুবই ভাল, আবার কেউ ভাবে ও অহংকারী।

 

-জ্বি! স্পষ্টভাসিদের সমালোচনার মুখে পরতে হয় সবসময়।

 

প্রত্যুষের মা প্রসঙ্গ পালটে বলেন, -‘তুমি মা ঐ দূরদেশে একা একা থাক,  দেশের জন্য, সবার জন্য মন কেমন করে না? ভাল লাগে ভিনদেশে, ভিনদেশিদের মধ্যে থাকতে?’

 

-দেশের জন্য মন তো খারাপ হয়ই। কিন্তু কি করব, খারাপ লাগলেও থাকতেই হয়।

 

-‘কেন মা, পরিবার পরিজন সবাইকে ছেড়ে মন খারাপ নিয়ে, কষ্ট নিয়ে নিজ দেশ থেকে অত দূরে থাকতে হবেই কেন? যেসব মেয়েদের স্বামী সংসার, ছেলেমেয়ে আছে তারা নয় কেউ স্বামীর ইচ্ছেতে বা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য বাধ্য হয়ে থাকে। কিন্তু তোমার তো কোন পিছুটান নেই, তুমি কেন শুধু শুধু মনের মধ্যে কষ্ট নিয়ে বিদেশে পরে থাকবে? একটাই তো মাত্র জীবন, আর সেই একমাত্র জীবনটা কিনা পরদেশে, পরের মধ্যে, পর পর অনুভূতি নিয়ে কাটাবে? দেশের সন্তান দেশে ফিরে পরিবার পরিজন নিয়ে বাবা মায়ের আদরে জীবনটা কাটাও। তবেই না জীবনের সব সুখ, সব আনন্দ।’ প্রত্যুষের মা এবার একটু থেমে ব্যস্ত হয়ে বলেন, -‘দেখ দেখি, তোমার সাথে আজ সবে পরিচয় হল আর আজই কিনা আমি তোমাকে কতগুলো উপদেশ দিয়ে দিলাম। তুমি কিছু মনে করনি তো মা?’

 

আমি কি করে বোঝাব ওনাকে এরকম কথা শোনার জন্য আমার দু’কান, আমার হূদয়, আমার আত্মা, আমার সমস্ত চেতনা কতকাল ধরে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আমার পরিবার পরিজন কেউ গত আটটা বছরে কখনোই আমাকে এভাবে বলেনি। আমার ভেতরটা তোলপাড় করে। আমি শুধু বলতে পারি, -‘না, না, আমি কিছু মনে করিনি।’

 

-আসলে কি জানো মা, মেয়েদের বয়স ষাটের ঘরে চলে এলেই তোমাদের মত সবাইকে নিজের সন্তান মনে হয়। তাই সুযোগ পেলেই মা’গিরি করে ফেলি। তুমি কিছু মনে কর না মা গো। তবে আমি তোমাকে যা বলেছি সেটা নিজের অন্তর থেকেই বলেছি। আমার কাছে যা সঠিক মনে হয়েছে তাই বলেছি। তুমি আমার মেয়ে হলে আমি কিছুতেই তোমাকে এভাবে অতদূরে, একা একা থাকতে দিতাম না।

 

এরপরে প্রত্যুষের মায়ের সাথে সামান্যই কথা হয়। প্রত্যুষ আরও অনেকটা সময় থাকে। বিকেলে আবার একপ্রস্থ চা নাস্তা খাওয়া হয়। রাত সারে আটটার দিকে প্রত্যুষ চলে যাবার সময় তাকে কিছু খাবার বক্সে করে দিয়ে দেই আমি। রেষ্টহাউসে তার রুমে মাইক্রো ওভেন আছে, রাতে গরম করে খেতে পারবে। প্রত্যুষকে বিদায় দেয়া পর্যন্ত আমি যন্ত্রচালিতের মত সবকিছু করে গেছি। প্রত্যুষের সাথে কথা বলেছি, হেসেছি, তাকে খাবার তুলে তুলে দিয়েছি। সবই করেছি আমি তার সাথে থেকে। কিন্তু তবুও আমি যেন তার সাথে ছিলাম না। আমার ভদ্রতা, কর্তব্যবোধ, দায়িত্ত্ব আমাকে দিয়ে এসব কাজ করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমার মন, আমার অনুভব জুড়ে তখন কেবল একটাই কথার অনুরণন ‘‘তুমি আমার মেয়ে হলে আমি কিছুতেই তোমাকে এভাবে অতদূরে, একা একা থাকতে দিতাম না।’’

 

 

 

 

প্রত্যুষ চলে গেছে অনেকক্ষন। সে চলে যেতে দরজা বন্ধ করে আমি এই সোফাটায় এসে বসেছিলাম। তারপর কখন, কিভাবে যে দু’টো ঘন্টা চলে গেছে আমি জানি না। আমার চারপাশ, জগৎ সংসার সব মিথ্যে হয়ে গেছে যেন! আমি স্থানুর মত বসেই থাকি। আমার ভাবনাও আর সুক্ষভাবে কাজ করে না এখন। মনের মধ্যে আমার কেবল ছোট্ট একটা জিজ্ঞ্যাসা, ‘আমার মা কেন প্রত্যুষের মায়ের মত হল না?’ আমার মা প্রত্যুষের মায়ের মত হলে তো আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে যেত না!

 

 

 

১৩

মানুষের ভাবনার আকাশে যখন ঝড় ওঠে তখন বাইরের মানুষ ততটাই শান্ত হয়ে যায়। আমিও গত দু’দিন ধরে ভীষন শান্ত, ভীষন ধীর, সমাহিত হয়ে আমার করণীয়গুলো করে যাচ্ছি। কাজে যাচ্ছি, সেখানে আমার যা কিছু দায়িত্ত্ব সেগুলো যথাসাধ্য করে যাচ্ছি। আবার ঘরে ফিরে নিজের জন্য রাধছি, খেতেও বসছি। কিন্তু আগে যে খাবার আমি পনেরো/বিষ মিনিটে খেয়ে উঠতাম, এখন ঘÏটা কাটিয়েও আমি সেই খাবার খেতে পারছি না। রাতেও আমার ভাবনারা এতটুকু ক্লান্ত হয়না, তারা অবিরাম আমার মনের মধ্যে চলতেই থাকে।

 

গত আটটা বছর ধরে যে আমি নানান কষ্ট, অপমান, হতাশা, দুঃখ আর একাকিত্ত্বকে অভিমানের আবরণে ঢেকে এই তুষারের দেশে থেকে থেকে আমার মনকেও তুষারখন্ডের মতই শীতল, শান্ত আর শক্ত করেছিলাম, প্রত্যুষের মায়ের সেদিনের কথাগুলো সেই আমার মনকেই আবারও অশান্ত করে দিয়েছে, ভীষন অশক্ত করে দিয়েছে। এখন আর আমি আগেরমত করে ভাবতেও পারছিনা। আগেও যে আমি নিজের কাছে খুব পরিষ্কার ছিলাম তাও নয়। কিন্তু তবুও এটুকু জানতাম আমার পরিবারের ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে যাব, সে নিজের যত কষ্টই হোক। বরং এই ভাবনাটাই আমাকে আমার নিজের জন্য ভাবতে দেয়নি কখনও। আমি কখনোই যেন ভেবে দেখিনি আমি নিজে কি চাই। কিম্বা বলা যায়, আমি যা চাই তেমন একটা জীবন পেতে আমার কি করণীয় বা আমার কোন করণীয় আছে কিনা সেটা নিয়ে আমি কখনোই নিজের সাথে কথা বলিনি। প্রত্যুষের মায়ের কথাগুলো শোনার পরে মনে হচ্ছে এতকাল আমি নিজের সাথে কথা কেন বলিনি? কেন একবারও নিজের মুখোমুখি হইনি? আমার জীবনের উপরে আমার বাবা, মা, পরিবারের অধিকার আছে সেটা যেমন সত্য, তার চেয়েও তো বড় সত্য আমার জীবনটা আমারই। আমার জীবনের দুঃখ বেদনায় বাবা মা’ও নিশ্চয়ই দু;খিত হবেন, কষ্ট পাবেন, কিন্তু আমার মত করে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবেন কি? এই যে তারা মনে করছেন আমাকে আবার একটা বিয়ে দিলেই আমার জীবনে যা কিছু ঘাটতি সব পূরন হয়ে যাবে। কিন্তু আমার জীবনে আসলেই যে কিসের কিসের ঘাটতি, কি পেলে আমার জীবনের সমস্ত ঘাটতি পূরন হয়ে যাবে সেটা তো আমার মত করে তারা জানেন না, বোঝেন না, বোঝার কথাও না। তবে আমি কেন নিজের জন্য এটুকু বুঝে দেখিনি এতকাল? কেন এভাবে নিজের সাথেই নিজে লুকোচুরি খেলেছি আমি? আমি তো কোন অন্যায় করিনি বা নিজ থেকে কোন ভূল! তবে কেন আমি এভাবে ফেরারী হয়ে বছরের পর বছর দ্বীপান্তরিত জীবন কাটাচ্ছি? কেন কাটাব আমি এই ফেরারী জীবন? কেন কিসের দায় আমার? কেন আমি আমার নিজের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না? কেন আমি থাকব এখানে? আমার তো কোন পিছুটান নেই, দায়বদ্ধতা নেই! একবারও আমি নিজেই কেন বলিনি আমি ফিরে আসতে চাই? এটা বলার এবং নিজদেশে ফিরে যাবার অধিকার তো আমার চিরকালের, তবে অযথা অভিমানে অন্যের বলার অপেক্ষায় থেকেছি কেন আমি?

 

গত আটটা বছর আমি নিজের জন্য কোন সিদ্ধান্তই নিতে চাইনি। কিন্তু আজ যখন আমি আমার মুখোমুখি হয়েছি, আজ যখন আমি নিজেই নিজের জন্য ভাবতে চাইছি, সিদ্ধান্ত নিতে চাইছি তবে আর অযথা সময় নেয়া কেন! আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

 

আজ রাতে অনেকদিন পরে সাধ্য সাধনা ছাড়াই আমার ঘুম চলে আসে।

 

 

 

 

 

সকালে কাজে যাই। গিয়ে অসুস্থতার কথা বলে তিনদিনের ছুটী নেই। আমার ডেস্কমেট এমা আমাকে ছুটীর আবেদন লিখতে দেখে ভুরু নাচিয়ে জিগ্যেস করে, -‘কি ব্যাপার, ছুটীর কারণ অসুস্থতা লিখছ, কিন্তু তোমাকে দেখে তো মোটেও অসুস্থ মনে হচ্ছে না?’

 

আমি লিখতে লিখতেই জবাব দেই, -‘সব অসুস্থতা কি বাইরে থেকে চোখে দেখা যায়?’

 

এমা এবার ঝুঁকে পরে আমার কাছাকাছি মুখ এনে উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে, -‘হেই! আর ইউ প্রেগ্‌ন্যাÏট?’

 

এমা’র প্রশ্ন শুনে আমার কলমই এবার চম্‌কে উঠে লেখা থামিয়ে দেয়। আমার অবস্থাও তথইবচ! আমি রাগী গলাতেই এমাকে বলি,

 

-তুমি জান না আমি সিঙ্গেল?

 

এমা চোখ কপালে তুলে বলল, -‘সিঙ্গেল হবার সাথে প্রেগ্‌ন্যাÏট না হবার সম্পর্ক কি?’

 

আমার আর এমা’র সাথে এই নিয়ে কথা বাড়াতে ভাল লাগে না। এদেশীয় কালচারে বড় হওয়া এমাকে সিঙ্গেল হবার সাথে প্রেগ্‌ন্যাÏট না হবার সম্পর্ক বোঝাতে গেলে আজ আর আমার ছুটী নিয়ে কোন লাভই হবে না। ওকে এটা বোঝাতে বোঝাতেই আমার সারাদিন কেটে যাবে, যে কাজের জন্য ছুটী নেয়া তার কিছুই হবে না। আমার লেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পেপারটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমি শুধু বললাম, -‘তোমার সাথে আমার যে সম্পর্ক!’

 

আমার কথার অর্থ না বোঝা এমা’র বোকা চেহাড়ায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের সামনে দিয়ে আমি চিফ্‌ এর ঘরে গিয়ে ঢুকি। ছুটী মঞ্জুর করিয়ে আমি আর দেরী করিনা সোজা চলে যাই এজাজ ভাইয়ের অফিসে। এজাজ ভাই একজন পাকিস্তানী। ওনার ট্রাভেল এজেন্‌সি থেকেই আমি গতবার দেশে যাবার সময় টিকেট নিয়েছিলাম। এছাড়াও ওনার স্ত্রীর সাথেও আমার আলাদা করে পরিচয় আছে। ইন্‌ফ্যাক্ট ওনার স্ত্রীর মাধ্যমেই বরং ওনাকে চেনা আমার। ওনাদের বাড়ীতেও কয়েকবার গিয়েছি আমি।

 

ঈদের আর মাত্র নয়দিন বাকী। এখন টিকেটের আশা করা মানে পাগলামি। কিন্তু এজাজ ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ত্বসুলভ সম্পর্কের ভরষাতেই আমি ওনার কাছে এসেছি। আমার ঈদের আগেই টিকেট লাগবে শুনে এজাজ ভাই তো প্রথমে এত দেরীতে আসার জন্য একটু অনুযোগ করলেন। কিন্তু আমি যখন তাকে বুঝিয়ে বললাম, এই যাবার সিদ্ধান্তটা বিশেষ প্রয়োজনে হঠাৎ করে নেয়া তখন তিনি বললেন, তাহলে তো ওনাকে একটা ব্যবস্থা করেই দিতে হয়। যদিও আজই উনি আমাকে ফাইন্যাল কিছু জানাতে পারলেন না। তবে যে কোন উপায়ে উনি আমার জন্য একটা টিকেটের ব্যবস্থা করে দেবেনই এমনটা আশ্বাস দিলেন। আমি একটু দুশ্চিন্তা নিয়েই বাসায় ফিরে এলাম। আমার এখন অনেক কাজ, কিন্তু টিকেটের ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তো সেসব শুরু করা যাচ্ছে না। কি করি এখন! কাজ থেকে ছুটী নিয়ে দেখছি কোন লাভই হল না!

 

সারাদিন কিছু না করেই কেটে গেল। বিকেলের দিকে ভাল লাগছিল না বলে শুয়েছিলাম। এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। নাম্বারটা ঠিক চিনতে পারলাম না। কিন্তু রিসিভ করতেই মনের মধ্যে কিছু একটা যেন লাফিয়ে উঠল। এজাজ ভাই ফোন করেছে। তার মানে টিকেটের ব্যবস্থা কি হয়ে গেছে!

 

এজাজ ভাই জানালেন সোমবার কাতার এয়ার্লাইনসে তিনি আমার জন্য টিকেটের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আমি তো আনন্দে প্রায় আত্মহারা। ডাবল সিটের দুটোই এ্যাভেইলেবল্‌, যে কোনটা নিতে পারি আমি। এজাজ ভাই জানতে চাইলেন আমি কোনটা চাই, জানালার ধারেরটা, নাকি প্যাসেজের পাশেরটা। সোমবার, মানে ঈদের তিনদিন আগেই দেশে পৌঁছে যাওয়া যাবে। হঠাৎ করেই আমার প্রত্যুষের কথা মনে পরে। প্রত্যুষও তো কাতারেই এসেছে! সে নাকি বাধ্য হয়েই ঈদের আগেরদিন ফিরছে, এর আগে নাকি কোনভাবেই সে ব্যবস্থা করতে পারেনি। সব নাকি বুক্‌ড ছিল। প্রত্যুষের সাথে কথা বলা দরকার। যদিও সে এখন এখানে নেই, পাশের আরেক দেশে গেছে। আমি এজাজ ভাইকে বলি ডাবল সিট্‌ দুটোই আমার জন্য রাখতে। আমি ওনাকে কিছুক্ষনের মধ্যেই ফোন করে সব ফাইন্যাল করছি।

 

এজাজ ভাইয়ের সাথে কথা শেষে ফোন রেখেই আমি প্রত্যুষকে ফোন করি। আমি দেশে যাচ্ছি শুনে প্রত্যুষ প্রথমে ভীষন অবাক! হঠাৎ কখন এই সিদ্ধান্ত নিলাম জানতে চাইল। কিন্তু আমার তো এখন এতসব বলার কোন সময় নেই। আমি তাকে জরুরী কথাটাই আগে বললাম। আমার কথা শুনে প্রত্যুষ তো যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল। তার কাজ নাকি এই শুক্রবারের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। শুধুমাত্র এর আগে টিকেট পায়নি বলেই পরের বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত শুধু শুধু তাকে থাকতে হত এখানে। এখন যদি আগেই টিকেট পাওয়া যায় তবে তো ভাবাভাবির প্রশ্নই ওঠেনা, একশভাগ নিশ্চিত সে আগের ফçাইটেই যাবে। যদি একস্‌ট্রা পে করেও যেতে হয় তবুও সে আগেই যেতে চায়। প্রত্যুষের সাথে কথা বলে আমি সাথে সাথেই এজাজ ভাইকে ফোন করি। ওনাকে প্রত্যুষের ব্যাপারটা খুলে বলি। উনি বললেন প্রত্যুষের টিকেট পালটে এগিয়ে আনা খুব একটা সহজ কাজ না। তবুও তিনি দেখছেন কতদূর কি করতে পারেন।

 

ঘÏটাখানেক পরেই এজাজ ভাই আবার ফোন করলেন। জানালেন প্রত্যুষের ব্যাপারটা উনি ঠিক করে ফেলেছেন। আমার যে এখন কি ভাল লাগছে! ভাল লাগছে এই জন্য যে প্রত্যুষ দু’দিন আগে গেলে তার মা ভীষন খুশি হবেন, কল্পনায় ওনার আনন্দে ভাসা অবয়বটার কথা ভেবেই আমারও ভাল লাগছে। তবে এটা কেবল এজাজ ভাই ছিলেন বলেই সম্ভব হল। কে জানে উনি কিভাবে ম্যানেজ করেছেন! আমি এজাজ ভাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। উনিও আমার জন্য কাজটা করে দিতে পেরে ভালবোধ করছেন। উদার হাসি হেসে আমাকে বললেন,

 

-বাজি, আব আপকো ফিকর কারণে কে লিয়ে কুছ নেহি রাহা। আপ বাস আপনা লাগেজ প্যাক কারণা সুরু কার দিজিয়ে।

 

শুক্রবারে আমি টিকেট আনার জন্য ওনার ওখানে যেতে চাইলে উনি বললেন সেটারও প্রয়োজন নেই। শনিবারে আমার এই এলাকাতেই নাকি ওনাদের দাওয়াত আছে। উনি সেই সময়ই আমার কাছে টিকেট হ্যান্ডওভার করবেন, টাকাটাও তখন দিয়ে দিলেই হবে।

 

আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল!

 

প্রত্যুষকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম সোমবার আমাদের যাওয়া ফাইন্যাল। আমি এবার আমার কাজগুলোতে মনোযোগ দিতে পারি। আমাকে এভাবে যেতে হলে কিছু অফিসিয়াল কাজ করে যেতে হবে। আজ তো আর সেসব হবে না, বিকেল গড়িয়ে গেছে। আজ বরং যতটা পারি ঘরের কাজ এগিয়ে নেই।

 

ঘরে এটা সেটা কাজ করতে করতে হঠাৎই মনে হল, আচ্ছা এই যে আমি আমার এতদিনের গোছানো একলার সংসার ফেলে চলে যাচ্ছি আমার কি একটুও কষ্ট হবে না? এই যে নিজে একটা একটা করে কিনে কিনে নিজের হাতে গোছানো সব, এর সব কি আর আমি নিয়ে যেতে পারব! আমার কি এসবের জন্য মায়া লাগবে না? মনের ভেতরে একটু যেন মুচ্‌রে ওঠে। আমার ছোট্ট আবাসটুকুর জন্য নিশ্চয়ই আমার কষ্ট হবে। এতগুলো বছর এখানে দিবারাত্রি কাটিয়েছি আমি। ক্লান্ত অবস্থায় এঘরই আমাকে প্রশান্িতর ছাঁয়া দিয়েছে, আরাম দিয়েছে। শীতে উষ-তা দিয়েছে। এই ঘরের কাছে আমি একটু হলেও তো ঋণী। অনেক আগে কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষ যেখানে একটা রাত্রিও যাপন করে সেখানকার জন্যই তার মায়া জন্মে যায়। আমি তো এই বাসায় মাত্র একটা রাত্রি না পাঁচ বছরেও বেশি সময় ধরে থেকেছি। আমার মায়া তো তাহলে আরও বেশিই হবার কথা!

 

শুক্রবার দুপুরের মধ্যে আমি অফিসিয়াল কাজগুলো সেরে ফেলি। কাজে গিয়ে জানিয়ে দেই আমি আর কাজটা করছি না। আমার এই ফç্যাটের জন্য আপাতত ছয় মাসের ভাড়া ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়েছি। এই ছয়মাসের মধ্যে একবার এসে আমার যা কিছু নেবার নিয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে গেলেই হবে। আপাতত ছয়মাসের জন্য তো নিশ্চিন্ত। আমার যাবতীয় জিনিষপত্র নিয়ে আমার নামে এই বাসা ছয়টা মাস নিরাপদেই থাকবে। এসব সেরে আমি বাবা, মা, ভাইবোনের জন্য কিছু কেনাকাটাও করে ফেললাম। আর হয়তো কখনও এদেশ থেকে তাদের জন্য কিছুই কেনা হবে না আমার!

 

এই ঘরদোর ফেলে যাব বলেই তাকে তো আর যেন তেন করে ফেলে যাওয়া যায় না। অনেকগুলো মাস এই ঘরদোর বন্ধ হয়ে পরে থাকবে বলেই আরও বেশি ভাল করে পরিষ্কার করে রেখে যাওয়া উচিত বলেই মনে করি আমি। শনিবার বিকেলের মধ্যে পুরো বাসাটা ঝকঝকে পরিষ্কার করে কোনটা কোথায় কিভাবে রেখে যাব সম্পূর্ণ গোছানো হয়ে গেল আমার। আমার বাসায় বেশ কিছু প্ল্যাÏটস্‌ আছে। এগুলো তো আর ছয়মাস পানি ছাড়া বাঁচবে না। তাই উপরের দশতলার ঐ সদাহাস্যময়ী ফুলপ্রেমী প্রতিবেশীনিকে প্ল্যাÏটগুলো দিয়ে দিলাম। সে তো ভয়ানক খুশি। সে তো জানেনা ওগুলো দিয়ে দিতে কতটা কষ্ট লাগছে আমার।

 

রাতে নিজের সাথে করে কি কি নিয়ে যাব সেসবও গুছিয়ে ফেললাম। এরই মধ্যে এক ফাকে এজাজ ভাইরা দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আমার বাসায় এসে টাকা নিয়ে টিকেট দিয়ে গেলেন। আমি প্রত্যুষকে জানিয়ে দিলাম, টিকেট আমার হাতে এসে গেছে।

 

আমার যা যা করণীয় সবই করলাম, কিন্তু দেশে ফোন করে আমার যাবার কথাটা কাউকে জানালাম না আমি। ইচ্ছে করেই। এই ইচ্ছেটা কেন হলো জানিনা আমি, তবে এই ইচ্ছেটাকেই সঠিক মনে হচ্ছে।

 

রোববার সকালে তেমন আর কোন কাজই করার মত বাকী রইল না আমার। হঠাৎ মনে হল এমার্জেন্‌সি কিছু ঔষধ সাথে করে নেয়া প্রয়োজন, কিন্তু ঘরে তেমন কোন ষ্টক নেই। চট্‌ করে বেড়িয়ে গিয়ে কাছেই দোকান থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে ফেরার পথে একবার ভাবলাম, নিজের জন্য কিছু কিনব কিনা! কিন্তু ভাবতে গিয়েই মনে হল, কি হবে আর এদেশি জিনিষ ব্যবহারের অভ্যেস বাড়িয়ে। আমাকে তো শুধু এদেশ, এদেশে আমার এতদিনের একলার সংসার ফেলেই যেতে হবে না, সেই সাথে এদেশের জীবন যাপনের যাবতীয় অভ্যেসও ফেলেই যেতে হবে। অভ্যেসটাকে সাথে করে নিয়ে গেলে আমি বরং দেশে গিয়ে কষ্টই পাব।

 

 

 

১৪

আমার আর প্রতুষের চেকিং হয়ে যেতেই ভীড় থেকে সরে গিয়ে দুটো মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম আমরা। এখন বেশ হালকা লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে সবকাজ শেষে এবার যেন ছুটী হয়েছে আমার। আমি একটু আরাম করে বসার চেষ্টা করি। হঠাৎ মনে হল এখন একটু কফি হলে বেশ হত। আমি এটা ভাবতে না ভাবতেই আমাকে ভীষন অবাক করে দিয়ে প্রত্যুষ বলে উঠল, -‘আপনি এখানে বসুন, আমি দেখি একটু কফি পাই কিনা।’

 

আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রত্যুষ সামনের একজন ষ্টাফের দিকে এগিয়ে গেল। ওদের মধ্যে কিছু কথা হতেই ষ্টাফ ভদ্রলোকটি হাত দিয়ে একটা দিক দেখিয়ে দিল। ওদিকেই মনে হয় কফি পাওয়া যাবে। আমি বসে বসে প্রত্যুষের যাওয়া দেখি। কিন্তু আমার মন চলে যায় আমার এখানকার ফেলে আসা বাসায়। কষ্ট লাগে আমার। কিন্তু শুধু বাসাটার জন্যই কষ্ট লাগে আমার! আর কোন কিছুর জন্য বা এই দেশ ছেড়ে যাচ্ছি বলে তেমন কোন কষ্ট হয়না আমার। আমি মনে মনে ভাবি, এটুকু কষ্ট তো লাগবেই। নিজের দেশের মধ্যেও মানুষ যখন একবাসা থেকে আরেক বাসায় শিফ্‌ট করে তখন কি তার পূরোন বাসাটার জন্য কষ্ট হয় না! আমারও সেরকম এই বাসা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আমার নিজের মনকেই বলি, এটা কোন ব্যাপার না, এটা খুবই স্বাভাবিক!

 

দু’হাতে দুটো পেপার কফি মগ নিয়ে প্রত্যুষকে আসতে দেখি। কাছে আসতেই আমার দিকে একটা মগ এগিয়ে দিতে দিতে বলল, -‘গরম থাকতে থাকতে খেয়ে ফেলুন।’

 

আমরা দু’জন কিছুক্ষন চুপচাপ কফি খাই। হঠাৎ প্রত্যুষই কথা বলে ওঠে।

 

-আপনার এবারের ঈদটা তাহলে আর একা কাটাতে হল না, দেশে সবার সাথেই করছেন!

 

-হুম্‌!

 

-আবার ফিরছেন কবে? ঈদের পরেও কয়েকটা দিন নিশ্চয়ই থাকবেন?

 

-‘হুম্‌, তা তো থাকতেই হবে।’ আমি কফিতে চুমুক দিয়ে খুব গম্ভীর হয়েই বলি।

 

-ডিসেম্বরটা থেকেই আসবেন তো? নাকি তারও পরে? নতুন বছরে?

 

-তারও পরে।

 

-‘জানুয়ারী?’ প্রত্যুষ যেন নির্দিষ্ট করে জানতে চায় আমি কতদিন দেশে থাকব।

 

-না জানুয়ারী হবে কি করে? নভেম্বরে ঈদ হয়ে অত তাড়াতাড়ি আবার কেন ঈদ হবে?

 

-‘মানে কি? আপনি এত হেয়ালি করে কথা বলছেন কেন বলুন তো? আপনি তো এই কোরবানী ঈদটা করতেই দেশে যাচ্ছেন। তাহলে আবার ঈদ মানে?’ প্রত্যুষের চোখে একরাশ প্রশ্ন।

 

আমি গম্ভীর মুখে বলি, -‘মানে কিছুই না। ভাবছি এখন থেকে আমার জীবনের সবগুলো ঈদ দেশেই করব। তাই কোন ঈদের কত পরে আবার এখানে আসব, বা আদৌ আসব কিনা সেটা এখুনি বলি করে বলুন?

 

প্রত্যুষের চেহাড়া এবার দেখার মত হয়! সে একদিকে যেমন ভীষন রকমের অবাক, আরেকদিকে তেমনি ভয়ানক আনন্দিত! কিছুক্ষন কোন কথাই বলতে পারে না সে। আমি প্রত্যুষের অবস্থা দেখে হেসে ফেলি।

 

-‘অপরাজিতা, ডোÏট সে দ্যাট ইউ আর কিডিং উইথ মি!’ প্রত্যুষ এবার খুব সিরিয়াস চেহাড়া করে বলে।

 

-উহু, আমি তা বলিওনি। আমি যা সত্যি তাই বলেছি।

 

-‘কিন্তু কখন আপনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন? আমাকে তো কিছুই বলেননি! এমন কি কিছু বুঝতেও দেননি যে আপনার এই যাওয়া শুধু যাওয়াই না, ফিরে যাওয়া!’ প্রত্যুষের বিষ্ময় যেন কাটেই না।

 

-নিজেই তো বুঝলাম এই এখন যে আমি সত্যি ফিরে যাচ্ছি, তবে আর আপনাকে বোঝাব কখন!

 

-‘এনিওয়ে, আই এ্যাম সো হ্যাপি!’ প্রত্যুষের চোখে মুখে আনন্দ যেন উপ্‌চে পরে।

 

-আপনার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে আপনার ফ্যামিলীর কেউ দেশে ফিরছে!

 

-‘আরে আপনি আমার ফ্যামিলী নন বলেই কি আপনার প্রত্যাবর্তনে আমি আনন্দিত হব না? আপনার সাথে আমার একটা বন্ধুত্ত্ব তো হয়েছেই। আপনি এখানে থাকলে আর হয়ত কখনও আমাদের দেখাও হত না। কিন্তু এখন আপনি দেশে যাচ্ছেন, এখন আমাদের প্রায়ই দেখা হতে পারে। কথা তো হবেই।’ প্রত্যুষ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু থামে, তারপরেই আবার বলে, -‘তাছাড়া দেশের মানুষ দেশে ফিরে আসছেন এটাই তো আনন্দের বিষয়।’

 

আমাদের ফçাইটের প্যাসেঞ্জারদের যেতে বলার নির্দেশ ঘোষিত হল। আমরা যে যার হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে উঠে পরি।

 

 

 

প্লেনে উঠে যাবতীয় ফরম্যালিটি শেষে যে যার সিটে এসে বসেছি আমরা। আমি জানালার ধারে বসেছি। বাইরে একবার যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখি আমি। এই দেশটাকে মনে মনে বলি, ‘তুমি ভাল থেক, আমিও এবার ভাল থাকব।’ এবার মাকে একটা এস এম এস করব বলে মোবাইলটা হাতব্যাগ থেকে বের করি। কি লিখব আমি মাকে? একটু ভাবি। তারপরে লিখতে শুরু করি-

 

‘‘মা, সেই ছোট্টবেলা থেকে আমার যখন যা কিছু প্রয়োজন হয়েছে তার সবকিছুই চাওয়ার আগেই তুমি এনে দিয়েছ আমাকে। ফলে চাওয়ার কোন অভ্যেসই গড়ে ওঠেনি আমার। ভেবে দেখ মা, কখনও কি কোনকিছু তোমার কাছে চেয়েছি আমি? কিন্তু সেই তুমিই কেন বুঝলে না আমি এখন কি চাই? কেন বুঝলে না তোমাদের ছেড়ে থাকতে আমার ভীষন কষ্ট হয়? কেন বুঝলে না আমার দেশটাকে ছেড়ে থাকতে ভীষন কষ্ট হয়! আমার কি কেবল একটা স্বামী আর নিরাপত্তাই চাই? আমার কি তোমাকে, বাবাকে, আমার পরিবারকে প্রয়োজন নেই? আমার কি তোমার কোলে মাথা রেখে চোখের সামনে নিজভূমির বিশাল আকাশের প্রয়োজন নেই, আর পায়ের নীচে চিরচেনা সেই মাটি? এত বিপদ গেল আমার একবারও কেন তোমার কাছে আমাকে ডাকলে না মা? তুমি কেন বুঝলে না সে সময়ে তোমাদেরকেই আমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল? তুমি কি জানো না তোমার অপু কত অভিমানী? তুমি কি জানো তুমি বুঝবে বলে সে কতকাল অপেক্ষায় ছিল? কিন্তু আর কোন অপেক্ষা না মা, তোমার অপু এবার বুঝেছে মায়ের কাছে যেতে সন্তানকে কারও কোন কথার অপেক্ষায় থাকতে হয়না-না জন্মদায়ীনি মায়ের কাছে যেতে, না স্বদেশমাতার কাছে যেতে। মা, আগামীকাল দুপুরের ভাতে আমার জন্য দু’মুঠো চাল বেশি নিও। আমি আসছি।’’

 

আমার কথাগুলো চারটা মেসেজে ভাগ হয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। আমি হাতের মুঠোর মধ্যে মোবাইলটা ধরে বাইরে তাকিয়ে থাকি। কিছুটা সময় যায় কি যায় না, হাতের মুঠোর মধ্যে মোবাইলটা কেঁপে ওঠে। মা রিপ্লাই করেছে! আমি তাড়াতাড়ি মেসেজটা পড়ি-

 

‘‘তোর জন্য সরষে ইলিশ করি? আর ঝাল করে শুটকি?’’

 

মুহূর্তে আমার অনেকদিনের হিমশীতল মনের মধ্যে উষ- বাতাস বয়ে যায়। আর সেই বাতাসে পাখির পালকের মত আমি ভেসে যেতে থাকি। ভাসতে ভাসতে আমি দশটা বছর আগের আমি হয়ে যাই। আমার আর মনেই হয়না আমার জীবনের দশটা বছর অনাবাদী জমির মত নষ্ট পরেছিল। আমার এই দশটা বছরের যত বঞ্চনা, যত দুঃখ, ক্ষোভ আর অভিমান সব অনেককালের চাপা পরে থাকা উষ-তায় গলে গলে যায়। মোবাইলটাকে মুঠো করে ধরে বুকের কাছে নিয়ে আসি আমি। এই হল মা! আমার পুরো অন্তর হেসে ওঠে। আমি হাসিমুখে চোখ বন্ধ করি। আমার বন্ধ দু’চোখের কোল বেয়ে উষ- অশ্রু গড়িয়ে পরে। আমার মনের মধ্যে দশটা বছরের জমে থাকা বরফ আজন্মলালিত উষ-তায় গলে গলে পরে। আমার একবারও খেয়াল হয়না পাশের সিটে বসে ভীষন অবাক হয়ে প্রত্যুষ আমার দিকেই তাকিয়ে দেখছে। দেখলে দেখুক, আনন্দের অশ্রু দেখার অধিকার সবারই আছে।

 

 

৮ই ডিসেম্বর’ ২০০৯

 

 

বাংলাদেশ...                                                            

বিনোদন...                                                              

প্রবাশ...                                                                  

বিশ্ব...                                                                     

কোরআন/ হাদিস বানী

সূরা বাকারা

এবং নিশ্চয় তুমি তাদেরকে অন্যান্য লোক এবং মুশরিকদের অপেক্ষাও অধিকতর আয়ু-আকাক্সক্ষী পাবে; তাদের মধ্যে প্রত্যেকে কামনা করে যেন তাকে হাজার বছর আয়ু দেয়া হয় এবং ঐরূপ আয়ু প্রাপ্তিও তাকে শাস্তি থেকে মুক্ত করতে পারবে না এবং তারা যা করছে আল্লাহ তা দেখেন।

White House Iftar

Tarique Rahman's Speech | York Hall, London | 29 September 2014